AkramNadwi

শিরোনাম : সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যা।

|| প্রশ্ন:
মহোদয় হাফিজ মাহমুদ করিম সাহেবের পক্ষ থেকে নিম্নলিখিত প্রশ্ন এসেছে —
আসসালামু আলাইকুম,
“মাওলানা আকরাম সাহেবের সহীহ মুসলিমের ওপর যে কাজ চলছিল, তা এখন কোথায় পর্যন্ত পৌঁছেছে এবং সেই কাজের প্রকৃতি কী?”
—ইমরান সিদ্দীকী নাদভী

|| উত্তর:
আল্লাহ্ তাআলার অসীম কৃপা, তিনি আমাকে সহীহ মুসলিম-এর ওপর একটি বিস্তারিত ও সুবিশাল ব্যাখ্যা লেখার তাওফিক দিয়েছেন। এই কাজটি আমি বহু বছর আগে শুরু করেছিলাম, এবং আলহামদুলিল্লাহ্‌ দুই বছর আগে তা সম্পূর্ণ হয়েছে। বর্তমানে এই ব্যাখ্যা প্রায় পঁচিশ (২৫) খণ্ডে সম্পন্ন হয়েছে। এর পাণ্ডুলিপি এখন প্রকাশকের কাছে আছে। ইনশাআল্লাহ্ আশা করছি আগামী বছর এটি মুদ্রিত হয়ে আলেম ও ছাত্রসমাজের হাতে পৌঁছাবে।

আল্লাহ্ তাআলা আমাকে এই সৌভাগ্য সেই সময়ে দান করেন, যখন আমি অক্সফোর্ডে ব্রিটেনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচিত ছাত্রদের সহীহ মুসলিম পড়াতে শুরু করি। পাঠদানের সময় ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর গ্রন্থের এমনসব বৈশিষ্ট্য ও সূক্ষ্ম দিক আমার সামনে উদ্ভাসিত হয়, যা ছাত্রজীবনে আমার নজরে আসেনি। তখন উপলব্ধি করি—সহীহ মুসলিম শুধু হাদিসের একটি সংকলন নয়; এটি মুহাদ্দিসদের গবেষণার পদ্ধতি, বিন্যাস ও নির্মাণশৈলীর এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

যখন আমি সহীহ মুসলিম-এর ওপর রচিত সুপ্রসিদ্ধ ব্যাখ্যাগুলো অধ্যয়ন করলাম, দেখলাম—সেগুলোর বেশিরভাগই ফিকহি মতপন্থার প্রতিনিধিত্ব করে, কিন্তু ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর আসল উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে না। এমনকি ইমাম নববী (রহ.)-এর ব্যাখ্যাও, যদিও তা উপকারী ও গভীর আলোচনা-সমৃদ্ধ, মূলত টীকা ও মন্তব্য পর্যায়ে সীমাবদ্ধ। ইমাম মুসলিমের সুনিপুণ বিন্যাস ও সূক্ষ্ম পদ্ধতির সারবত্তা তুলে ধরার মতো কোনো পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত ব্যাখ্যা আমি পাইনি। এই অনুভবই আমার কাজের ভিত্তি হয়ে দাঁড়ায়।

আমার সহীহ মুসলিম-এর ব্যাখ্যায় আমি দুইটি মূল বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছি—
প্রথমত, এই মহান গ্রন্থের হাদিসগুলোর বিশুদ্ধতা দৃঢ় প্রমাণসহ উপস্থাপন করা;
দ্বিতীয়ত, ইমাম মুসলিম (রহ.) যেভাবে অসাধারণ প্রজ্ঞা ও নিখুঁত ক্রমে এসব হাদিস সাজিয়েছেন, তার অন্তর্নিহিত রহস্য উন্মোচন করা।

আমার গবেষণার সারমর্ম হলো—ইমাম বুখারী (রহ.) ও ইমাম মুসলিম (রহ.)—উভয়েই এই নীতিতে একমত ছিলেন যে, কোনো হাদিসে যদি তাদের নির্ধারিত শর্তসমূহ পূর্ণভাবে বিদ্যমান থাকে, তবে তা নিশ্চিতভাবে সহীহ। তবে এই শর্তগুলোর বাস্তব প্রয়োগ ও প্রয়োগের উদাহরণে তাদের মধ্যে কখনো পার্থক্য দেখা যায়।

এই পার্থক্যের পরও একটি বিষয় সম্পূর্ণ নিশ্চিত—দুজন ইমামই তাঁদের গ্রন্থে যেসব হাদিস অন্তর্ভুক্ত করেছেন, তা পূর্ণ জ্ঞানের আলোকে ও দৃঢ় বৈজ্ঞানিক ভিত্তির ওপর অন্তর্ভুক্ত করেছেন; আর যেগুলো বাদ দিয়েছেন, তা অবহেলায় নয়—বরং যথার্থ বৈজ্ঞানিক কারণে।

অতএব আমার ব্যাখ্যায় আমি এই দিকটি স্পষ্ট করেছি—যদি ইমাম মুসলিম (রহ.) কোনো হাদিস সংকলন করেন অথচ ইমাম বুখারী (রহ.) তা গ্রহণ না করেন, তাহলে কেন করেননি? আবার ইমাম বুখারী (রহ.) কোনো বর্ণনা গ্রহণ করলেন অথচ ইমাম মুসলিম (রহ.) তা অন্তর্ভুক্ত করেননি—এর পেছনে কী প্রজ্ঞা ছিল? এই তুলনামূলক বিশ্লেষণ পাঠকের সামনে উন্মোচন করে যে, দুই ইমামই নিজেদের নির্ধারিত নীতিমালার প্রতি কত দৃঢ়ভাবে অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন এবং তাঁদের বইয়ের কোনো অংশেই সেই নীতিমালা থেকে বিচ্যুতি ঘটেনি।

এছাড়া আমি সহীহ মুসলিম-এর ওপর যেসব সমালোচনা করা হয়েছে, বিশেষত ইমাম দারকুতনি (রহ.) এবং অন্যান্য মুহাদ্দিসদের করা কিছু আপত্তি, সেগুলোকেও বিস্তারিতভাবে আলোচনায় এনেছি। গভীর পর্যালোচনায় দেখা গেছে—এসব আপত্তির বেশিরভাগই ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর পদ্ধতি ঠিকমতো অনুধাবন না করায় বা তাতে পর্যাপ্ত মনোযোগ না দেওয়ার ফলে সৃষ্টি হয়েছে। কিছু সমালোচনা এমন হাদিস নিয়ে, যা ইমাম মুসলিম (রহ.) কেবল ‘মুতাবাআত’ (অর্থাৎ সহায়ক সূত্র হিসেবে) উল্লেখ করেছেন; আবার কিছু আপত্তি সেইসব বর্ণনার ওপর, যেগুলোকে তিনি নিজেই ‘মা’লূল’ (ত্রুটিযুক্ত) হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

আমার ব্যাখ্যায় আমি মূল ও মৌলিক হাদিসগুলোকে সহায়ক বর্ণনা থেকে পৃথকভাবে উপস্থাপন করেছি, যাতে পাঠক সহজেই বুঝতে পারেন কোনটি মূল ভিত্তি আর কোনটি পরিপূরক। একই সঙ্গে আমি তুলে ধরেছি, ইমাম মুসলিম (রহ.) কী সূক্ষ্মতা ও নিখুঁত শৃঙ্খলার সঙ্গে বিভিন্ন সূত্র ও সনদ একত্র করেছেন। তাঁর পদ্ধতি থেকে স্পষ্ট হয় যে, তিনি শুধু বর্ণনার জগতে শ্রেষ্ঠই ছিলেন না, বরং বিন্যাস ও সংগঠনেরও এক অনন্য শিক্ষক ছিলেন।

এই বিষয়টি বোঝাতে আমি প্রতিটি অধ্যায়কে অন্যটির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা আকারে সাজিয়েছি, যাতে পাঠক বুঝতে পারেন—প্রতিটি অধ্যায়ের সূচনা সর্বোচ্চ মানসম্পন্ন ও শক্তিশালী হাদিস দিয়ে করা হয়েছে, তারপর ক্রমান্বয়ে অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের বর্ণনাগুলো সংযোজিত হয়েছে।

পরবর্তী যুগে সহীহ মুসলিম-এর মুদ্রিত ও হস্তলিখিত সংস্করণে অনেকে নিজেরা শিরোনাম ও অধ্যায় যুক্ত করেছেন। তাঁরা এমন অনেক হাদিসের ওপরও আলাদা শিরোনাম বসিয়েছেন, যেগুলো ইমাম মুসলিম (রহ.) কেবল সহায়ক সূত্র হিসেবে এনেছিলেন, কিংবা বিভিন্ন বিষয়ের হাদিস একত্র করে একটি অধ্যায়ে রেখেছেন। এ ধরনের পদক্ষেপ বইটির মূল বিন্যাস ও উদ্দেশ্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং পাঠকের মনে ভুল ধারণা জন্ম দিয়েছে যেন গ্রন্থে বিন্যাসগত দুর্বলতা আছে।

কিন্তু বাস্তবতা সম্পূর্ণ উল্টো—ইমাম মুসলিম (রহ.) এমন শৃঙ্খলা ও সুবিন্যাস প্রদর্শন করেছেন, যার তুলনা হাদিস-সংগ্রহের ইতিহাসে খুঁজে পাওয়া কঠিন।

এই কারণেই আমি আমার ব্যাখ্যায় এমন একটি পদক্ষেপ নিয়েছি—বর্তমান সংস্করণগুলোর সব পূর্ববর্তী অধ্যায়-শিরোনাম (তরজমা) সম্পূর্ণভাবে বাদ দিয়ে দিয়েছি এবং নতুন অধ্যায় ও শিরোনাম স্থাপন করেছি, যা হুবহু মুহাদ্দিসদের পদ্ধতি ও নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আমি সচেষ্ট থেকেছি যেন প্রতিটি অধ্যায়ের শিরোনাম এমন হয়, যা সরাসরি হাদিসবিদদের নীতিমালা ও পদ্ধতির প্রতিফলন ঘটায়, পরবর্তীকালের ফকিহদের প্রভাবিত দৃষ্টিভঙ্গি নয়।

এর পাশাপাশি আমি প্রতিটি হাদিসের অর্থ স্পষ্ট করেছি, সেগুলো থেকে উদ্ভূত ফিকহি মাসায়েল উল্লেখ করেছি, এবং আলেম ও ফকিহদের মতভেদগুলোও গবেষণাধর্মী ও নিরপেক্ষভাবে তুলে ধরেছি। যদিও কিছু স্থানে সংক্ষিপ্ততা অবলম্বন করেছি, তবু এমন পরিমাণ পরিশ্রম ও গভীর অনুসন্ধানের প্রতি যত্ন নিয়েছি, যা সহীহ মুসলিমের মতো মহান গ্রন্থের প্রাপ্য ছিল।

অতঃপর আমি এই দিকেও গুরুত্ব দিয়েছি—প্রতিটি হাদিসকে কুরআনের সঙ্গে সংযুক্ত করা, যেন পাঠক অনুধাবন করতে পারেন যে সুন্নাহ আসলে আল্লাহর কিতাবের ব্যাখ্যা ও তার বাস্তব প্রয়োগ। এভাবে পাঠকের কাছে স্পষ্ট হয় যে কুরআন ও সুন্নাহ—দুটিই মিলে ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ও সামগ্রিক জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলে।

সারসংক্ষেপে বলা যায়—আমার এই দীর্ঘ পরিশ্রমের উদ্দেশ্য ছিল সহীহ মুসলিম-এর প্রকৃত মর্যাদা এবং ইমাম মুসলিম (রহ.)-এর মৌলিক পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গি বিশ্বসম্মুখে তুলে ধরা, যাতে উম্মাহ এই সত্য উপলব্ধি করে যে সহীহ মুসলিম শুধুমাত্র হাদিসসমূহের সংকলন নয়, বরং এমন এক কালজয়ী মহাকাব্য যেখানে মুহাদ্দিসদের গবেষণার নীতি, রীতি ও কৌশল পূর্ণ মহিমায় প্রতিফলিত হয়েছে।

—————–
ক্যাটাগরি : হাদিস।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7093

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *