AkramNadwi

শিরোনাম : নেকির আসল ভিত।

بسم الله الرحمن الرحيم.

কিছুদিন আগে আমি শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম—আমরা মাদরাসার শিক্ষার্থীরা স্নাতক হয়ে লুঙ্গি-পাঞ্জাবি, টুপি ও আমামা পরি, কথায় কথায় “সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, ইনশাআল্লাহ” ইত্যাদি বলি, আর নিজেদের খুব ধার্মিক ভেবে বসি। অথচ বাস্তবতা হলো, আমরা ঠিকমতো নামাজ পড়ি না, নির্জনতায় আল্লাহকে ভয় করি না, লেনদেনে হারাম থেকে বাঁচি না। আমরা মিথ্যা বলি, গিবত করি, চোগলখোরি করি, হিংসা করি, বিদ্বেষ পুষে রাখি। প্রতিবেশী, অন্যান্য মুসলিম ও সাধারণ মানুষদের আমরা কষ্ট দিয়ে থাকি। তাহলে এইসব দোষত্রুটি থাকা অবস্থায় কেউ কি প্রকৃত অর্থে নেক হতে পারে?

মনে হলো, আল্লাহর কিতাব ও তাঁর পবিত্র রাসুল ﷺ–এর সুন্নতের দিকে ফিরে তাকানো দরকার। সেগুলো নিয়ে চিন্তা করলে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, আমরা নেকির মূল ও শাখা উভয়েরই বহু দূরে অবস্থান করছি। আমাদের হাতে কেবল প্রদর্শনীর ধর্মনিষ্ঠা আছে; প্রকৃত ধার্মিকতা আমরা বুঝিইনি, গ্রহণ করার চেষ্টা করিনি। আমরা সত্তর বছর বয়স পর্যন্ত পৌঁছে যাই, কবরে পা ঝুলতে থাকে, তবু বড় বড় গুনাহ থেকে না তওবা করি, না সেগুলো ছাড়ার ইচ্ছে করি।

নেকির মূলনীতি ও শাখাগুলো বিশদ ব্যাখ্যার দাবি রাখে। তাই আমি আবারও চিন্তা শুরু করলাম, সেই নেকির উপর যা মৌলিক নেকি (أصول الأصول)। যেগুলো অর্জন করতে পারলে অন্য নেকি সহজে লাভ করা যায়। অধ্যয়ন শেষে পরিষ্কার হলো যে, মৌলিক নেকি চারটি—প্রথমে এই চারটি অর্জনের চেষ্টা করতে হবে এবং মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এগুলোর ওপর অটল থাকতে হবে। এগুলো থেকেই জন্ম নেবে অন্য সব ছোট-বড় নেকি। আর এই চারটি ছাড়া যে-ই হোক না কেন, সে নেক নয়—সে কেবল নেকির সাজসজ্জা করেছে।

এই চারটি মৌলিক নেকি হলো:

১. শোকর

আমরা যেন আল্লাহর দান ও মানুষের অনুগ্রহগুলোকে বোঝার চেষ্টা করি। যখনই কেউ আমাদের প্রতি সামান্যতম উপকার করবে, তার কদর করি, প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করি। আর প্রতিদান দিতে না পারলে অন্তত অন্তর ও জিহ্বা দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করি। আর অবশ্যই আমাদের সবচেয়ে বড় উপকারী হলেন আমাদের রব। তাঁর অসংখ্য নিয়ামত বারবার স্মরণ করা উচিত—জীবন, স্বাস্থ্য, ধন-সম্পদ, নিরাপত্তা, আত্মীয়তা ও সম্পর্ক, ঈমান, ইবাদত, জ্ঞান, কুরআন পাঠ ও বোঝার সুযোগ—এসব নিয়ামত নিয়ে চিন্তা করতে হবে। ভাবতে হবে, বিনা প্রাপ্যতায় তিনি কীভাবে এত নিয়ামত দান করেছেন। যদি আমরা একটি নিয়ামতকেও বিশ্লেষণ করতে চাই, তার সমস্ত দিক ও বিশদ গুনে শেষ করতে পারব না। আল্লাহ নিজেই বলেছেন:
“তোমরা যদি আল্লাহর নিয়ামত গুনতে চাও, গুনে শেষ করতে পারবে না।”

২. তাকওয়া

যিনি আমাদের নিয়ামত দিয়েছেন, তিনিই তা কেড়ে নিতে পারেন এবং অকৃতজ্ঞতার শাস্তি দিতে পারেন। তাই তাঁর ধ্যান করতে হবে, তাঁর ভয় অন্তরে স্থাপন করতে হবে। এই ভয়ই হৃদয়ের সুস্থতার নিশ্চয়তা। যখন এ ভয় জাগবে, তখন বান্দা আল্লাহর ইবাদত করবে, তাঁর আনুগত্য করবে এবং তাঁর অবাধ্যতা থেকে বিরত থাকবে।

তাকওয়ার ভেতর চারটি জিনিস অন্তর্ভুক্ত:
১. আল্লাহর প্রতি ধ্যান (মুরাকাবা),
২. তাঁর ভয়,
৩. আনুগত্য,
৪. গুনাহ থেকে বিরত থাকা।

এই চারটির সম্মিলিত রূপই তাকওয়া। আর তাকওয়ার আসল আসন হলো অন্তর—টুপি, লুঙ্গি, পাঞ্জাবি, হাতে তসবিহ, বক্তৃতা, লেখা, পাঠদান, ইফতার আয়োজন কিংবা কোনো পীরের হাতে বায়াত নেওয়া বা কোনো মুরশিদের সান্নিধ্যে প্রবেশ করা নয়।

৩. হুসনে সুলুক (সুন্দর আচরণ)

আল্লাহর শোকর ও তাকওয়ার অপরিহার্য দাবি হলো, মানুষ তাঁর বান্দাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে। বাবা-মা, সন্তান, স্বামী-স্ত্রী, আত্মীয়স্বজন, শিক্ষক-শিক্ষার্থী, বন্ধু-সঙ্গী—সবাইকে সুন্দর আচরণ করবে। তাদের সাহায্য করবে, তাদের ত্রুটি ঢেকে রাখবে, তাদের কষ্ট দেওয়া থেকে বাঁচবে। কারও সঙ্গে প্রতারণা করবে না, মিথ্যা বলবে না, গিবত করবে না, চোগলখোরি করবে না, হিংসা করবে না, কষ্ট দেবে না। বরং অগ্রসর হয়ে সবার সঙ্গে কল্যাণকামী আচরণ করবে।

এ সুন্দর আচরণ কোনো নির্দিষ্ট দল, মাশরব বা পরিবারে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তা সব মুসলিমকে অন্তর্ভুক্ত করে। সাধারণ পরিস্থিতিতে তা সব মানুষের প্রতিও প্রযোজ্য।

৪. সবর (ধৈর্য)

উপরের সবকিছুর ওপর দৃঢ়ভাবে স্থির থাকা—এটাই সবর। নিজের প্রাণ বা সম্পদের ক্ষতি হলেও অটল থাকা। যাদের সঙ্গে আমরা ভালো ব্যবহার করি, তাদের দিক থেকে যদি কোনো কষ্ট আসে, তাহলে তাদের ক্ষমা করে দেওয়া, তাদের গিবত না করা, প্রতিশোধ না নেওয়া। তবে যদি তাদের ক্ষতি অন্যদের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়ে, তাহলে কোনো আল্লাহভীরু আলেমের পরামর্শে সেই ক্ষতি ঠেকানোর চেষ্টা করা। কিন্তু নিছক আনন্দ নেওয়ার জন্য কারও জবাব দেওয়া নয়।

যখন আমরা এই চারটি মূলনীতিকে গ্রহণের চেষ্টা করব, তখন শয়তান আমাদের বারবার পরাজিত করার চেষ্টা করবে। তবু হতাশ হওয়া যাবে না। বারবার তওবা করতে হবে, আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে। ইনশাআল্লাহ, আমরা ধীরে ধীরে এই গুণগুলো অর্জন করতে পারব। আর এগুলোর মাধ্যমে অন্য নেকিগুলোও সহজ হয়ে যাবে।

যদি কখনো স্থিরতা ও পূর্ণ অটলতা লাভ না-ও হয়, তবে আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই। কারণ মূল বিষয় হলো—আন্তরিকতা ও সত্যনিষ্ঠ প্রচেষ্টা। আল্লাহ নিজেই বলেছেন:
“যারা আমাদের জন্য সংগ্রাম করে, অবশ্যই আমরা তাদেরকে আমাদের পথসমূহে পরিচালিত করব।”

উপসংহার
এই চারটি—শোকর, তাকওয়া, হুসনে সুলুক এবং সবর—হলো নেকির ভিত্তি। এগুলো অর্জন করতে পারলে বাকি সব নেকি সহজ হয়ে যাবে। আর এগুলো ছাড়া নেক হওয়ার কোনো অর্থ নেই, থাকবে কেবল নেকির অভিনয়।

আল্লাহ তা’আলা আমাদের সবার গুনাহ ক্ষমা করুন এবং আমাদের প্রকৃত নেক বানিয়ে দিন।
আমিন।

——————–
ক্যাটাগরি : তাজকিয়াহ, উপদেশ।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7195

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *