بسم الله الرحمن الرحيم.
হে নবীদের উত্তরাধিকারীগণ! আল্লাহর দৃষ্টি আপনাদের হেফাজত করুক, তাঁর হাত আপনাদের রক্ষা করুক, আর তাঁর তাকদীর আপনাদের সময়ের উত্থান-পতন ও দুনিয়ার ঝড়ঝাপটা থেকে পাহারা দিক। যদি আমার এই আহ্বান ও আপনাদের উদ্দেশ্যে করা বক্তব্যে কোনো ধরনের শিষ্টাচারবিরোধী শব্দ এসে যায়, সীমা অতিক্রম হয় বা আত্মপ্রদর্শনের আভাস থাকে, তবে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আল্লাহ ভালো করেই জানেন, আমার উদ্দেশ্য কেবল কল্যাণ। কল্যাণকামী উপদেশদাতার প্রতি ক্ষমাশীল হওয়া উচিত—যদি সে মূল বক্তব্য সঠিক ধরতে পারে, অথচ ভাষায় কোথাও ভুল হয়ে যায়। আপনারা নিশ্চিত থাকুন, আমি আপনাদের গভীর হৃদয় থেকে ভালোবাসি। আপনাদের প্রতি আমার টান আমার কাছে যেন সুরের মতো—হালকা হোক বা ভারী, দুটিই আমার কাছে প্রিয়; কিংবা সুস্বাদু খাবারের মতো—কম হোক বা বেশি, দুটিই আমার কাছে আকাঙ্ক্ষিত।
কেন আপনারা নিজেদের সমাজে যে ভূমিকায় থাকার কথা, সেই ভূমিকা তুচ্ছ করে রেখেছেন? কেন জীবনের প্রবাহ ও বাস্তবতার ঘটনাপ্রবাহ থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নিয়েছেন? কেন আপনাদেরকে মানসিক পশ্চাৎপদ, চিন্তায় জড় ও সময়ের দৌড়ে পিছিয়ে পড়া হিসেবে অভিযুক্ত করা হয়? আপনারা কি শোনেননি—প্রত্যেক আসরে, প্রত্যেক মঞ্চে একথা উচ্চারিত হচ্ছে—“আলেমরা তাদের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করেন না, দেশের উন্নয়ন তাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়, সমাজ গড়ার কাজে তাদের কোনো ভূমিকা নেই”? যদি আপনারা না-ও শুনে থাকেন, অন্যরা তো শুনেছে। সুতরাং নিজেদের পুনর্মূল্যায়ন করুন, শক্তি একত্র করুন, হারানো সুযোগগুলো ফিরে আনার চেষ্টা করুন, নতুন করে জীবনের ময়দানে নামুন, সংস্কারের প্রতিযোগিতায় এগিয়ে আসুন এবং একে অপরকে পরামর্শ দিন।
চারটি বিষয়ের সঙ্গে দৃঢ়ভাবে অটল থাকলে আপনাদের সাফল্য আসবে, দেশের নিরাপত্তা ও কল্যাণ নিশ্চিত হবে, আর জনগণ উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে অগ্রসর হবে।
প্রথমত: পদ-পদবি ও অর্থ-সম্পদের প্রতি অনাগ্রহী হোন, এগুলোর প্রতি নিরাসক্ত থাকুন। এগুলোই আপনাদের প্রকৃত দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। শাসকদের সঙ্গে ক্ষমতার প্রতিযোগিতায় নামবেন না, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করবেন না, প্রকাশ্যে আক্রমণাত্মক সমালোচনায় যাবেন না। বরং তাদের আন্তরিক পরামর্শদাতা হোন, তাদের জন্য দোয়া করুন, গোপনে সদুপদেশ দিন। যেন জনগণের হৃদয় থেকে তাদের মর্যাদা না কমে যায়, কিংবা দেশের নিরাপত্তা বিপদের মুখে না পড়ে। কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতি পক্ষপাত করবেন না, কোনো গোষ্ঠীর সঙ্গে একচেটিয়া যুক্ত হবেন না। আপনারা গোটা উম্মাহর আলেম—যাতে সব শ্রেণির মুসলিম আপনাদের ওপর আস্থা রাখে, আপনাদের থেকে উপকৃত হয়, আপনাদের কাছে আশ্রয় নেয়।
দ্বিতীয়ত: নিজেদের মধ্যে বৈরিতা করবেন না, অনুসারীদের মাজহাব ও পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভক্ত করবেন না। বরং সহযোগিতাপূর্ণ থাকুন। আপনারা যে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ, সেগুলো আসলে পরস্পরবিরোধী নয়, বরং পরিপূরক। মুহাদ্দিস, ফকিহ, মুফাসসির, মুতাকাল্লিম—প্রত্যেকে অপরের প্রয়োজনীয়। আপনাদের মধ্যে যারা সুফি আছেন, আর যারা নন—তাদের মধ্যেও কোনো দ্বন্দ্ব নেই, কোনো বিরোধ নেই। একে অপরের থেকে শিখুন, এবং একে অপরকে কল্যাণ ও উপকার দেওয়ার কাজে আগ্রহী হোন।
তৃতীয়ত: আপনাদের জনগণকে একতাবদ্ধ করুন, বিভক্ত করবেন না। মানুষকে ধর্মীয় বনাম ধর্মনিরপেক্ষ, কিংবা রক্ষণশীল বনাম উদারপন্থী এই বিভাজনে ভাগ করবেন না। বরং তাদের সবাইকে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে দক্ষ, বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত মানুষ হিসেবে দেখুন। তাদের মধ্যে রয়েছেন ব্যবসায়ী ও উদ্যোক্তা, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ক্রীড়াবিদ, কারিগর ও শ্রমিক। তাদেরকে একটি দেহের অংশ, একটি ভবনের স্তম্ভ, একটি সমাজের উপাদান হিসেবে বিবেচনা করুন। তাদের সঙ্গে মিশুন, তাদের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিন, তাদের কাছে আসুন, দূরত্ব কমান।
পুরুষ ও নারীদের মধ্যেও বিভাজন সৃষ্টি করবেন না। মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী—উভয়েই পরস্পরের অভিভাবক ও সহযোগী। তাদেরকে ভালোবাসা ও সম্মান বিনিময় শেখান, অবজ্ঞা ও অপমান থেকে বাঁচান। যদি আপনারা নারীদের থেকে বিমুখ হয়ে যান, তবে হিংস্র নেকড়ে তাদের ছিনিয়ে নেবে, আপনার ও আপনার দ্বীনের শত্রুরা তাদের টেনে নেবে, আর তারা এর জন্য ওঁৎ পেতে আছে। নারীরা যেন আপনাদেরকে তাদের অধিকার কেড়ে নেওয়া, তাদের মর্যাদা পদদলিত করা ব্যক্তি হিসেবে না দেখে; বরং যেন আপনাদেরকে অভিভাবক, রক্ষক ও তাদের দুঃখ-দুর্দশায় সহমর্মী হিসেবে দেখতে পারে।
চতুর্থত: আপনাদের সবচেয়ে বড় চিন্তা হওয়া উচিত মানুষকে আপনার রবের ইবাদতে ডাকা, নবীর সুন্নাহর অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করা, আখিরাতের প্রতি আগ্রহী করা, দুনিয়ার প্রতি নির্লিপ্ত করা, আর নিজেদের দেশ গড়ে তোলা, উন্নয়ন করা—অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ করা, এবং ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠা করা।
সংক্ষেপে বলছি: অভিশাপের পরিবর্তে বরং নিজের দেশকে সেবা দিন, জনগণের সঙ্গে সংহতি বজায় রাখুন। সময়ের দিকে তাকান—আপনারা সফলতা ও সুন্দর জীবনের কোনো পথ খুঁজে পাবেন না, যদি না নিজেকে সেবক হিসেবে গড়ে তোলেন, জনগণের সঙ্গে ঐক্যবদ্ধ হয়ে চলেন।
——————–
ক্যাটাগরি : উপদেশ, ইসলামি চিন্তাধারা, নৈতিকতা।
—
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7126