শিরোনাম : সফরে কসর নামাজের হিকমত।
——————–
|| প্রশ্ন:
ড. বদরুদ্দীন সাহেব নিম্নলিখিত প্রশ্ন করেছেন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ,
গতকাল আমি আমেরিকা থেকে ফিরে দিল্লি পৌঁছলাম। যখন ছেলের অ্যাপার্টমেন্টে গেলাম, তখন এশার সময় হয়ে গিয়েছিল। ছেলে আমাকে কসর নামাজ পড়ার কথা মনে করিয়ে দিল। তাই আমি কসর পড়লাম। কিন্তু আমার মনে প্রশ্ন জাগল—যখন কোনো ভয় নেই, কোনো অসুবিধাও নেই, তখনও কসর করার পেছনে কী হিকমত বা মসলেহত রয়েছে? আশা করি আপনি এ বিষয়ে আলোকপাত করবেন। আল্লাহ আপনাকে সুস্থ রাখুন।
|| উত্তর:
ওয়ালাইকুম সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়াবারাকাতুহ,
মহোদয় ও সম্মানিত জনাব!
আপনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন—যখন সফরে কোনো ভয় নেই, আবার সুবিধা-অসুবিধার ঘাটতিও নেই, তখনও কসর করার কী হিকমত থাকে?
এই প্রসঙ্গে বলা যায়, শরিয়তে নামাজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন পরিস্থিতির ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার জন্য সহজীকরণ দান করা হয়েছে। ভয়-ভীতির সময়কার কসর আলাদা প্রকৃতির। সেখানে শুধু রাকাত কমিয়ে দেওয়া হয় না, বরং নামাজের ধরন ও রূপেও পরিবর্তন আসে। এমনকি মুজাহিদদের অনুমতি দেওয়া হয়েছে প্রয়োজনে নামাজের ভেতরেও চলাফেরা করার।
কিন্তু আপনার প্রশ্ন যেটির সাথে সম্পর্কিত, সেটি হলো সফরের কসর, যার উল্লেখ বহু হাদিসে এসেছে।
সফরের কসরের আসল হিকমত কেবল ভয় বা দৃশ্যমান কষ্ট নয়; বরং এটি এক সূক্ষ্ম অবস্থা, যাকে আজকের ভাষায় “বিভ্রান্তি” (disorientation) বলা যায়। মানুষ যখন তার পরিচিত পরিবেশ ও জায়গা থেকে বেরিয়ে যায়, তখন তার উপর এক ধরনের অচেনাভাব ভর করে। অজুর জন্য উপযুক্ত জায়গা খুঁজতে গিয়েও সে অসুবিধা অনুভব করে, মসজিদ খুঁজে পেতে কষ্ট হয়, কারো বাসায় ইবাদতের সময়ও এক ধরনের সংকোচ অনুভব করে। এসব মিলিয়ে এক ধরনের অপরিচিত পরিবেশের চাপ ও হালকা কষ্ট তৈরি হয়, যদিও বাহ্যিক সব সুবিধা উপস্থিত থাকে।
শরিয়তের আইন প্রণয়নের নীতি হলো—তা ব্যক্তিগত ও বিশেষ অবস্থার ভিত্তিতে নয়, বরং সাধারণ ও সংখ্যাগরিষ্ঠ অবস্থার ভিত্তিতে তৈরি হয়। যেহেতু সাধারণত প্রত্যেক সফরেই এই অচেনাভাব ও disorientation বিদ্যমান থাকে, তাই শরিয়ত সব সফরকারীর জন্য সমানভাবে কসরের রুখসত দান করেছে। এজন্যই আপনি যেমন সুখকর ও নিরাপদ সফরকারী, আপনিও কসর করার শরিয়ত পেয়েছেন।
তারপর আরও বিষয় হলো—অনেক ইমামের মতে সফরকারীর জন্য সালাত জমা করারও (جمع بین الصلاتین) অনুমতি রয়েছে, যাতে ইবাদত কষ্টকর হয়ে না ওঠে, বরং সহজভাবে আদায় করা যায়।
এতে স্পষ্ট হলো—কসরের আসল হিকমত হলো সহজীকরণ, কষ্ট লাঘব এবং সফরের অচেনাভাব থেকে সৃষ্ট মানসিক অবস্থার ভার কমানো। দ্বীনে বাড়তি কষ্ট ও চাপ আরোপ করা হয়নি; বরং আল্লাহ তাঁর বান্দাদের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে সহজতার দরজা খুলে দিয়েছেন।
আল্লাহ আমাদেরকে এই রুখসত হিকমতের সাথে গ্রহণ করার, এবং আমাদের নামাজকে সত্যিকারের নূর ও তাঁর সান্নিধ্যের মাধ্যম বানানোর তাওফিক দান করুন।
——————–
ক্যাটাগরি : নামাজ, ফিকাহ, শিক্ষা, ইসলামি চিন্তাধারা।
—
✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/6766