AkramNadwi

শিরোনাম : তাওফীক (توفيق) , তালফীক (تلفيق) নয়।
—-

بسم الله الرحمن الرحيم

তারা বলল: আমাদের খারাপ লাগে, যখন আপনি ইমাম আবু হানিফার মত ছেড়ে কিছু বিষয়ে ইমাম মালেক, শাফেয়ী কিংবা আহমাদ ইবনে হাম্বলের মতামত নেন। এটাকেই বলে তালফীক (মিশ্রণ)।

আমি বললাম: যদি আমরা কূপের পানি অন্য কোনো পবিত্র পানির সঙ্গে মিশাই, তবে কি তা তার আসল পবিত্রতা হারায়? ঠিক তেমনই ইমাম আবু হানিফা, ইমাম মালেক, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল এবং অন্যান্য হিদায়াতের ইমামদের মতামত। আমি যদি কোনো বিষয়ে দুর্বল দলিল ছেড়ে শক্তিশালী দলিল গ্রহণ করি, বা কম উপযুক্ত মত ছেড়ে অধিক উপযুক্ত মত গ্রহণ করি—তাহলে তাতে আপনাদের আপত্তি কিসের? বরং এটিই আসলে তাওফীক (সমন্বয়), তালফীক নয়। কারণ, তালফীক হয় সত্য ও মিথ্যার মিশ্রণে, আর এখানে এক সত্যের সঙ্গে আরেক সত্যকে একত্র করা হচ্ছে।

তারা বলল: নাম যাই দিন, পরিভাষায় তো বিবাদ নেই, তবে আপনি আমাদের উদ্দেশ্য বুঝেছেন—এটা আপনার এবং আপনার মতোদের জন্য এক দোষ।

আমি বললাম: এতে দোষ কোথায়? এ কাজ তো সাহাবায়ে কিরাম, তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনও করেছেন।

তারা বলল: আমাদের সামনে সাহাবা, তাবে-তাবেঈনের উদাহরণ তুলবেন না।

আমি বললাম: তারা তো শ্রেষ্ঠ প্রজন্ম ছিলেন, তাই না?

তারা বলল: হ্যাঁ, তবে তাদের প্রসঙ্গ বাদ দিন। আমাদের সাথে কথা বলুন আমাদের আকাবির হানাফি উলামাদের কথা দিয়ে।

আমি বললাম: আবু হানিফা, আবু ইউসুফ, মুহাম্মদ, যুফর—এরা কি হানাফিদের সবার সর্দার নন?

তারা বলল: অবশ্যই, বরং তারাই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ এবং অনুসরণযোগ্য। তারাই আমাদের মাজহাবের ভিত্তি। সুতরাং তাদের যাচাই করা বক্তব্য আনুন।

আমি বললাম: আবু হানিফা অনেক বিষয়ে নিজ শহরের (কুফার) সাহাবিদের মত ছেড়ে অন্যদের মত গ্রহণ করেছেন। যেমন—ইবনে মাসঊদ মনে করতেন, যদি নামাজে ইমামের সঙ্গে দুইজন জামাতকারী থাকে, তবে একজন ইমামের ডানে, অন্যজন বামে দাঁড়াবে। কিন্তু উমর ইবনে খাত্তাব তাদের দুজনকেই পেছনে দাঁড় করাতেন। আবু হানিফা এখানে ইবনে মাসঊদের মত ছেড়ে উমরের মত গ্রহণ করেছেন।

আবার ইবরাহিম নাখাঈ বলতেন, কেউ অজুর পর নখ কেটে বা চুল ছাঁটলে পুনরায় তার উপর পানি বয়ে দিতে হবে। কিন্তু হাসান বসরী ও অন্যরা বলতেন, অজু তাতে ভঙ্গ হয় না। আবু হানিফা ইবরাহিমের মত ছেড়ে হাসান বসরীর মত গ্রহণ করেছেন।

আবু হানিফা বলতেন, মাটির গোত্রভুক্ত সবকিছু দিয়ে তায়াম্মুম করা যাবে। কিন্তু আবু ইউসুফ তার মত ছেড়ে নিলেন, বললেন: শুধু মাটি বা বালু দিয়ে তায়াম্মুম করা বৈধ।

মুহাম্মদ ইবনে হাসান আবু হানিফার সেই মত ছেড়ে দেন যেখানে বলা হয়েছিল, ভক্ষণযোগ্য প্রাণীর মূত্র নাপাক। তিনি হিজাজ ও বসরার আলেমদের মতোই বললেন, এটি পবিত্র।

আবার অসুস্থ মানুষ ইশারায় নামাজও পড়তে না পারলে কিছুই তার উপর বাধ্য নয়—এটি ছিল আবু হানিফার মত। কিন্তু যুফর তাঁর মত ছেড়ে দিলেন, বললেন: প্রথমে ভ্রু নেড়ে ইশারা করবে, তাও না পারলে চোখে, আর তাও না পারলে অন্তরে।

তারা বলল: এদের উদাহরণ বাদ দিন, পরে আসা হানাফি আলেমদের উদাহরণ দিন।

আমি বললাম: আবু হানিফা ও তাঁর শাগরিদরা বলতেন, দাড়ি বা মুখে চুল জন্মালে নিচের স্থান ধোয়া বাধ্যতামূলক নয়। কিন্তু আবদুল্লাহ আল-বালখি তাঁদের মত ছেড়ে দিলেন, বললেন: নিচে ধোয়া অব্যাহতি পায় না।

ইমাম তাহাবী আবু হানিফার মত ছেড়ে দিলেন ফজরের সময় নির্ধারণে। তিনি বললেন: যদি দীর্ঘ কেরাত পড়ার নিয়ত থাকে, তবে অন্ধকারে শুরু করে আলো ফোটার সময় শেষ করা উত্তম।

মুহাম্মদ ইবনে শুজা’ আস-সালজি বললেন: মুসাফির যদি যোহরের আগে বের হয়, তবে নামাজ কসর করবে, আর যদি যোহরের পর বের হয়, তবে চার রাকাত সম্পূর্ণ করবে। এভাবে তিনি আবু হানিফার মত ছেড়ে দিলেন।

তারা বলল: এদের কথাও বাদ দিন, এখনকার হানাফি আলেমদের উদাহরণ দিন।

আমি বললাম: আমাদের এবং আপনাদের শাইখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ মুসাফিরের জন্য দুই নামাজ একসাথে পড়ার ফতোয়া দিয়েছেন।

তারা বলল: আরব হানাফিদের কথা ছাড়ুন। তারা অন্যদের সঙ্গে মিশে গিয়েছেন, প্রভাবিত হয়েছেন, তাই কিছুটা শৈথিল্য এসেছে। আমাদের দেওবন্দি আলেমদের কথা আনুন।

আমি বললাম: আপনাদের কিছু দেওবন্দি আলেম ইসলামি অর্থনীতি ও ব্যাংকিং বিষয়ে শুধু হানাফি নয়, অন্য মাজহাব এমনকি অপ্রচলিত মতামত থেকেও তালফীক করেছেন।

তারা বলল: তাদের থেকে আমরা এবং আমাদের বড়রা নিজেদেরকে মুক্ত রেখেছি। আমাদের বিশ্বস্ত দেওবন্দি আলেমদের মতামত আনুন।

আমি বললাম: হাকীমুল উম্মাহ মাওলানা আশরাফ আলী থানভী সম্পর্কে কী বলবেন?

তারা বলল: তিনি সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ও পরহেজগার।

আমি বললাম: আবু হানিফা বলেছিলেন, নিখোঁজ স্বামী ফিরে না আসলে স্ত্রীকে ৯০/১০০/১২০ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। কিন্তু ইমাম মালেক বলেছিলেন, চার বছর অপেক্ষাই যথেষ্ট। হাকীমুল উম্মাহ মালেকের মতেই ফতোয়া দিয়েছেন।

তারা বলল: কোনো আলেম এক-দুই বিষয়ে ভিন্ন মত দিলে তাকে শাজ বা ব্যতিক্রম বলা হয়। আমাদের কাছে এমন কোনো বিষয় আনুন, যেখানে সবাই একমত হয়েছেন।

আমি বললাম: আবু হানিফা ও তাঁর শাগরিদরা কোরআন বা দ্বীনি ইলম শেখানোর বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ নয় বলেছেন। কিন্তু ইমাম শাফেয়ী এটিকে বৈধ বলেছেন। আর দেওবন্দের সব আলেমই শাফেয়ীর মতেই ফতোয়া দিয়েছেন।

তারা বলল: এ উদাহরণ দিয়ে তো আপনি আমাদের সারা দিন লজ্জায় ফেললেন! আমরা চাইতাম আপনি অন্য কোনো উদাহরণ দিতেন।

——————–

ক্যাটাগরি : ফিকাহ, ফাতাওয়া, ইসলামি আলোচনা, উপদেশ।
—-
✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ
—-
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/6877

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *