AkramNadwi

শিরোনাম : সুরা আল-ফজরের শুরুতে শপথসমূহের তাৎপর্য।

শিরোনাম : সুরা আল-ফজরের শুরুতে শপথসমূহের তাৎপর্য।
——————–

প্রশ্ন:

কিছু কোরআন গবেষণায় আগ্রহী গবেষক আমাকে জিজ্ঞেস করেছেন,
সুরা আল-ফজরের শুরুতে যে শপথগুলো করা হয়েছে, সেগুলোর আসল উদ্দেশ্য কী ?
তিনি বিভিন্ন তাফসিরের বই ও আলেমদের বক্তব্য পর্যালোচনা করেছেন, কিন্তু তার বিভ্রান্তি আরও বেড়েছে—স্পষ্ট হওয়ার বদলে বিষয়টি তার কাছে আরও জটিল, দুর্বোধ্য ও সমস্যাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

উত্তর:
আমি বললাম: তুমি যেমন বলেছ, আলেমদের বক্তব্য ও মুফাসসিরদের ব্যাখ্যা তুমি পড়েছ, তাই আমি তা পুনরাবৃত্তি করব না। বরং আমি এখানে শুধু আমার কাছে যে ব্যাখ্যা সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে, সেটি উপস্থাপন করব। বিষয়টি স্পষ্ট করার জন্য আমি আয়াতগুলোকে চারটি ভাগে বিভক্ত করেছি:

১. প্রথম অংশ:
“শপথ ফজরের, আর শপথ দশ রাতের, আর শপথ জোড় ও বেজোড়ের, আর শপথ রাতের, যখন তা অতিক্রম করে যায়” (আয়াত ১-৪)।

২. দ্বিতীয় অংশ:
“এতে কি শপথ রয়েছে বুদ্ধিমান মানুষের জন্য?” (আয়াত ৫)।

৩. তৃতীয় অংশ:
“তুমি কি দেখনি, তোমার প্রতিপালক আদ জাতির সঙ্গে কী করেছিলেন? ইরাম—যারা ছিল দণ্ডযুক্ত প্রাসাদের অধিকারী—যেমন কেউ কখনও দেশে তৈরি করেনি। আর সামুদ, যারা উপত্যকায় পাথর কেটে ঘর বানাতো। আর ফেরাউন, যে দণ্ড-স্তম্ভের অধিকারী। এরা সবাই দেশে সীমালঙ্ঘন করেছিল, ব্যাপকভাবে ফিতনা-ফ্যাসাদ ছড়িয়েছিল। তখন তোমার প্রতিপালক তাদের ওপর কঠিন শাস্তির চাবুক নাজিল করেছিলেন” (আয়াত ৬-১৩)।

৪. চতুর্থ অংশ:
“নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক সতর্ক প্রহরায় রয়েছেন” (আয়াত ১৪)।

প্রথম অংশে আছে শপথ ও শপথকৃত বিষয়সমূহ। শেষের অংশে—“নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক সতর্ক প্রহরায় রয়েছেন”—আছে শপথের মূল বক্তব্য। দ্বিতীয় অংশটি শপথের গুরুত্বের প্রতি সতর্ক দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। তৃতীয় অংশ দ্বিতীয় অংশের ব্যাখ্যা হিসেবে এসেছে।

কোরআনে শপথের অর্থ আসলে সাক্ষ্য ও প্রমাণ হাজির করা। এ বিষয়ে আমি বারবার জোর দিয়েছি এবং ইমাম হামিদুদ্দীন ফারাহি (রহ.)-এর মতকেই অনুসরণ করেছি। তিনি তার অনন্য বই “ইমআ’ন ফি আকসামিল কুরআন” (إمعان في أقسام القرآن) -এ বিষয়টি ব্যাখ্যা করেছেন। অর্থাৎ, কোরআন এখানে ফজর, দশ রাত, জোড় ও বেজোড়, এবং রাতের অগ্রসর হওয়ার ঘটনাগুলোকে সাক্ষ্য হিসেবে হাজির করেছে এই সত্যের পক্ষে যে, আমাদের প্রতিপালক সবকিছুর ওপর নজর রাখছেন, কাউকে তিনি ছাড় দেন না। “আল-মিরসাদ” অর্থ এমন স্থান যেখানে প্রহরা বসানো হয়—মানে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের পরীক্ষা করেন এবং তারা কেউ তাঁর ধরা এড়িয়ে যেতে পারে না।

তাহলে শপথকৃত বিষয়সমূহের সঙ্গে মূল বক্তব্যের কী সম্পর্ক?—এই সম্পর্ক কেবল তারাই বুঝতে পারে, যারা গভীরভাবে চিন্তা করে। এজন্যই বলা হয়েছে—“এতে কি শপথ রয়েছে বুদ্ধিমান মানুষের জন্য?” যখনই কোনো বক্তব্য চিন্তা-ভাবনা দাবি করে, তখন কোরআন সেখানে বিশেষভাবে মনোযোগ আকর্ষণ করে। যেমন, সুরা ওয়াকিয়ায় শপথের প্রসঙ্গে বলা হয়েছে:
“এটি এমন এক শপথ—যদি তোমরা জানো—এটি মহৎ শপথ” (৫৬:৭৬)।

আলেম ফারাহি এই জায়গার ব্যাখ্যায় বলেছেন:
“এ রকম উপসংহার কোরআনে বহুবার এসেছে। যেমন সুরা নাহলে বলা হয়েছে: ‘নিশ্চয়ই এতে নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য, যারা চিন্তা করে’ (১৬:১২)। আবার সুরা ত্বাহায়: ‘নিশ্চয়ই এতে নিদর্শন রয়েছে তাদের জন্য, যাদের প্রখর বুদ্ধি আছে’ (২০:৫৪, ১২৮)। আবার সুরা আলে ইমরানে: ‘নিশ্চয়ই এতে শিক্ষণীয় নিদর্শন রয়েছে দৃষ্টিশীলদের জন্য’ (৩:১৩)। সুতরাং এখানেও, শপথগুলো উল্লেখ করার পর বলা হলো—এগুলো আসলে বুদ্ধিমান মানুষের জন্য প্রমাণ ও নিদর্শন।” (তাফসিরে মন্তব্য, ২/৪৫২-৪৫৩)।

এভাবে শপথগুলোকে চিন্তা করার জন্য আহ্বান জানানো হলো, এরপর আল্লাহ বান্দাদের বোঝানোর জন্য তৃতীয় অংশে ব্যাখ্যা দিলেন: আদ, সামুদ ও ফেরাউনের কাহিনি।

তৃতীয় অংশে আল্লাহ বললেন—এমন সব জাতির কথা, যারা দেশে সীমালঙ্ঘন করেছিল, বিপুল ফাসাদ ছড়িয়েছিল, তাই আল্লাহ তাদের কঠিন শাস্তি দিয়েছেন। এর দ্বারা ইঙ্গিত করা হলো, শপথের উদ্দেশ্য আসলে আল্লাহর সেই দিনগুলো—যেদিন তিনি জালিম জাতিগুলোর ওপর শাস্তির চাবুক নাজিল করেছেন। আরবরা এই ইতিহাস ভালোভাবেই জানত, তাই সংক্ষিপ্ত ইঙ্গিতই যথেষ্ট ছিল।

এখন শপথগুলো বিস্তারিত দেখা যাক:

“শপথ ফজরের”—
এখানে ফজর বলতে বোঝানো হয়েছে লুত (আ.)-এর জাতির ধ্বংসের সময়। অন্যত্র কোরআনে এসেছে:
“তারা (মালাইকা) বললঃ হে লূত! আমরাতো আপনার রবের প্রেরিত বার্তাবাহক, তারা কখনও আপনার নিকট পৌঁছতে পারবেনা, অতএব আপনি রাতের কোন এক ভাগে নিজের পরিবারবর্গকে নিয়ে চলে যান, আপনাদের কেহ যেন পিছনের দিকে ফিরেও না চায়; কিন্তু হ্যাঁ, আপনার স্ত্রী যাবেনা, তার উপরও ঐ আপদ আসবে যা অন্যান্যদের প্রতি আসবে, তাদের (শাস্তির) অঙ্গীকার কৃত সময় হচ্ছে প্রাতঃকাল, প্রভাত কি নিকটবর্তী নয়?” (সুরা হুদ ৮১)।

“আর দশ রাতের শপথ”—
এখানে ইঙ্গিত করা হয়েছে আদ ও সামুদ জাতির ধ্বংসের দিকে। আদ ধ্বংস হয়েছিল সাত রাতের ঝড়-ঝঞ্ঝায়, আর সামুদকে শাস্তি দেওয়ার আগে তিন রাতের অবকাশ দেওয়া হয়েছিল। মিলিয়ে হলো দশ রাত।
কোরআনে অন্যত্র এসেছে:
“আর আদকে ধ্বংস করা হলো প্রচণ্ড ঝোড়ো বাতাসে। তিনি তা তাদের ওপর লাগাতার চালালেন সাত রাত আট দিন ধরে। তখন তুমি দেখতে, তারা লুটিয়ে পড়েছে, যেন তারা ভগ্ন খেজুরগাছ। তুমি কি তাদের মধ্যে কাউকে দেখতে পাও?” (সুরা হাক্কাহ ৬-৮)।
সামুদ সম্পর্কে বলা হয়েছে:
“তারা উষ্ট্রীটিকে জবাই করল। তখন তিনি বললেন: ‘তোমরা তিন দিন পর্যন্ত তোমাদের ঘরে ভোগ করো। এ প্রতিশ্রুতি মিথ্যা নয়।’ যখন আমার আদেশ এলো, আমি সালেহ ও তার সঙ্গে ঈমান আনা মানুষদেরকে উদ্ধার করলাম। আর যারা জুলুম করেছিল, তাদের ধরে ফেলল প্রচণ্ড শব্দ। ফলে তারা ঘরে লুটিয়ে পড়ল, যেন তারা কখনও সেখানে ছিল না।” (সুরা হুদ ৬৫-৬৮)।

“শপথ জোড় ও বেজোড়ের”—
অর্থাৎ সেসব দিনের শাস্তি, যেগুলো কখনও জোড়, কখনও বেজোড় ছিল। আদ-এর ধ্বংসে ছিল দুই দিক—সাত রাত (বেজোড়) এবং আট দিন (জোড়)। আর মূসা (আ.)-কে ফেরাউনের কাছে পাঠানো হয়েছিল নয়টি নিদর্শনসহ, এরপর দশম নিদর্শন হিসেবে ফেরাউনের ডুবে যাওয়া হলো তার চূড়ান্ত পরিণতি।

এভাবে দেখা গেল, সুরা আল-ফজরের শুরুতে যেসব শপথ এসেছে, তা আসলে আল্লাহর শাস্তির দিনগুলোর সাক্ষ্য। ইতিহাসের সে সব দিন, যেদিন আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদের কঠোর শাস্তি দিয়েছেন। এগুলো প্রমাণ করে দিচ্ছে—“নিশ্চয়ই তোমার প্রতিপালক সবসময় সতর্ক প্রহরায় রয়েছেন।”

——————–
ক্যাটাগরি : তাফসির, কোরআন।

✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ

🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇

https://t.me/DrAkramNadwi/7026

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *