AkramNadwi

শিরোনাম : নারীরা পুরুষদের মালিকানায় নয়। ———-

শিরোনাম : নারীরা পুরুষদের মালিকানায় নয়।
———-

“মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী—তারা একে অপরের সহায়ক। তারা সৎকাজের নির্দেশ দেয়, অসৎকাজ থেকে বিরত রাখে, নামাজ কায়েম করে, যাকাত দেয় এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে। এরাই সেই লোক, যাদের প্রতি আল্লাহ দয়া করবেন। নিশ্চয়ই আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।” (সূরা আত-তাওবা: ৭১)

এই আয়াতে ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নারী-পুরুষ উভয়ের পরিপূরক দায়িত্বের দিকটি বর্ণিত হয়েছে। একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী বা শত্রু হয়ে নয়, বরং তারা পারস্পরিক সহযোগী ও সহায় হয়ে থাকে। সমাজে সৎকাজ প্রতিষ্ঠা ও অসৎকাজ দূর করার ক্ষেত্রে উভয়েরই ভূমিকা রয়েছে—তা শিক্ষা, দিকনির্দেশনা কিংবা সংস্কারমূলক অন্য কোনো কাজের মাধ্যমেই হোক না কেন।

এই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালনের জন্য পুরুষ ও নারী উভয়েরই নিজের দ্বীনের সঠিক জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। তাই আমাদের দায়িত্ব হলো নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার জন্য সমানভাবে জ্ঞানার্জনের সুযোগ নিশ্চিত করা, যাতে তারা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তা পৌঁছে দিতে পারে এবং সমাজের ধারাবাহিক উন্নয়নে অবদান রাখতে পারে।

সম্প্রতি এক খ্যাতিমান কুরআন শিক্ষকের বিরুদ্ধে নাবালিকা মেয়েদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ ওঠার পর মুসলিম নেতৃত্ব—নারী ও পুরুষ উভয়েই—ভীষণ আতঙ্ক, ক্ষোভ ও গভীর হতাশা প্রকাশ করেছেন। আমাদের সমাজে ঘটে চলা এ ধরনের ঘটনাগুলো এক ভয়াবহ বাস্তবতাকে সামনে আনে: অপরাধীরা প্রায়ই শাস্তি এড়িয়ে যায়, ন্যায়বিচার অধরাই থেকে যায়। অথচ এই ভয়াবহ অন্যায়ের পরও কেউ কেউ এখন নারীদের স্বাধীনতা সীমিত করার কথা বলছে—তাদের মসজিদ, শিক্ষাকেন্দ্র, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক অঙ্গনে প্রবেশাধিকার সংকুচিত করার প্রস্তাব দিচ্ছে।

এটি চরম অবিচার যে আবারও নারীরাই নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে, অথচ তারাই মূলত এসব অপরাধের শিকার। যদি স্বাধীনতা সীমিত করতেই হয়, তবে সেটি হওয়া উচিত পুরুষদের—যারা এই অপরাধগুলোর জন্য দায়ী। নারীর স্বাধীনতা সীমিত করার এ আহ্বান এক ভয়াবহ ভ্রান্ত ধারণার প্রতিফলন: যেন নারী পুরুষের মালিকানায়, এবং তাদের অধিকার ও স্বাধীনতা পুরুষের নিয়ন্ত্রণাধীন। আমাদের স্মরণ রাখতে হবে, নারী-পুরুষ উভয়েই শেষ পর্যন্ত কেবল তাঁদের স্রষ্টার কাছেই দায়বদ্ধ। কর্তব্য ও দায়িত্ব নির্ধারণের পূর্ণ অধিকার শুধু তাঁরই।

নারীরা যেমন, পুরুষরাও তেমনি সমাজে সমানভাবে অংশগ্রহণ ও অবস্থান করার অধিকার রাখে। উভয়েই তাদের স্রষ্টার সামনে জবাবদিহি করবে, আর কিয়ামতের দিন তিনি-ই একমাত্র বিচারক হবেন, কে তাঁর আনুগত্য করেছে আর কে করেনি। এই জীবন একটি পরীক্ষা, আর আল্লাহ নারী-পুরুষ উভয়কেই সমান সুযোগ দিয়েছেন নিজেদের দায়িত্ব পূরণের জন্য। তাই এসব সুযোগ সীমিত করার যেকোনো প্রয়াস সরাসরি তাঁর দিকনির্দেশনার বিরোধী।

অসদাচরণ ঘটলে তা মোকাবিলার ন্যায়সঙ্গত ও কার্যকর উপায় আছে, যাতে নারী-পুরুষ উভয়ই নিরাপদ ও স্বাধীনভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারে। কিন্তু এমন ঘটনার অজুহাতে নারীর অধিকার খর্ব করা এক বিভ্রান্ত অহংকার এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় ব্যর্থতা ছাড়া আর কিছুই নয়।

কুরআন জাহিলিয়াত যুগের (ইসলামের পূর্বেকার অজ্ঞতার যুগ) নারীবিরোধী মনোভাবকে কঠোরভাবে ভর্ৎসনা করেছে। কন্যা জন্মের সংবাদ পেলে তাদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কুরআন বলছে:

“যখন তাদের কারও কাছে কন্যা সন্তানের সংবাদ পৌঁছে, তখন তার মুখমণ্ডল কালো হয়ে যায়, আর সে ভেতরে ভেতরে ক্রোধ ও দুঃখে ভরে ওঠে। সে মানুষের কাছ থেকে আত্মগোপন করে, কারণ সে যে সংবাদ পেয়েছে তা তার কাছে অপমানজনক। সে কি তাকে লাঞ্ছিত অবস্থায় রাখবে, নাকি মাটির নিচে পুঁতে দেবে? আহা! কীই না মন্দ তাদের এই ফয়সালা!” (সূরা النحل ১৬:৫৮-৫৯)

সেই সময়ে কিছু (যদিও সব নয়) আরব গোত্রের মধ্যে কন্যাশিশুকে জীবন্ত কবর দেওয়ার ভয়াবহ প্রথা প্রচলিত ছিল। কুরআন এই কাজের তীব্র নিন্দা করেছে এবং কিয়ামতের দিনের কঠিন শাস্তির সতর্কতা দিয়েছে:

“আর যখন জীবন্ত কবর দেওয়া কন্যাকে জিজ্ঞাসা করা হবে, কোন অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল?” (সূরা التكوير ৮১:৮-৯)

যদিও আজ সেই প্রথা আর নেই, তবুও বিভিন্নভাবে নারীর অধিকার ও সুযোগ খর্ব করা হয়। নারীদেরকে দ্বীনের জ্ঞান অর্জন ও বোঝার সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা মানসিক ও আত্মিকভাবে তাদেরকে যেন জীবন্ত কবর দেওয়ার শামিল। প্রকৃত সম্মান ও ক্ষমতায়ন হলো তাদেরকে জ্ঞান ও আধ্যাত্মিক উন্নতির সমান সুযোগ দেওয়া—যা ইসলামের মৌলিক শিক্ষা দ্বারা স্বীকৃত অধিকার।

কুরআন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে মানবাধিকার ও দায়িত্ব দু’টি মূল নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত, যা নারী-পুরুষ উভয়ের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য। প্রথমত, সব মানুষই আল্লাহর সৃষ্টি এবং তাঁর দাস। দ্বিতীয়ত, সমগ্র মানবজাতি একক নফস (আত্মা) থেকে উদ্ভূত, যেমন কুরআনে বলা হয়েছে (সূরা النساء ৪:১):

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *