Skip to main content

AkramNadwi

স্ত্রীর গোপনীয়তার অধিকার এবং পিতামাতার যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব

স্ত্রীর গোপনীয়তার অধিকার এবং পিতামাতার যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব

| প্রশ্ন:

আমার ছাত্র আবু হানিফা দিলওয়ার আমাকে নিম্নলিখিত প্রশ্নটি করেছেন:

আস-সালামু ‘আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ, সম্মানিত শাইখ।

আপনার সেই প্রবন্ধের আলোকে যেখানে আপনি বলেছেন স্ত্রী আলাদা থাকার জায়গার অধিকারী, বাংলাভাষী ফেসবুক পেইজে এ নিয়ে অনেক প্রশ্ন এসেছে। আমি সেগুলোর সারসংক্ষেপ নিচে তুলে ধরছি।

বাংলাদেশে, বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায়, আর্থিক সংকটের কারণে অনেক সময় বড় পরিবার একসাথে বসবাস করে। পিতামাতা দৈনন্দিন যত্নের জন্য ছেলে ও পুত্রবধূদের ওপর নির্ভরশীল থাকেন। অনেকের ধারণা, প্রতিটি দম্পতিকে আলাদা থাকার পরামর্শ দেওয়া বাস্তবসম্মত নয় এবং কখনও কখনও এটি পিতামাতার প্রতি অসম্মানজনক মনে হতে পারে। আবার দম্পতিদেরও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও সীমারেখা প্রয়োজন। মুসলমানরা কীভাবে আলাদা থাকার বিষয়টিকে পিতামাতার অধিকার আদায়ের দায়িত্বের সঙ্গে সমন্বয় করবে এবং পারিবারিক সম্প্রীতি বজায় রাখবে?

| উত্তর:

ওয়া ‘আলাইকুম আস-সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

তোমার প্রশ্নটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উত্থাপন করেছে, যা অনেক মুসলিম পরিবার বিশেষত দক্ষিণ এশিয়ায় মুখোমুখি হয়। ইসলাম স্বামী-স্ত্রীর অধিকার, স্বামীর দায়িত্ব এবং পিতামাতার হক সম্পর্কিত সুস্পষ্ট নীতিমালা দিয়েছে। এসব দায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য রাখা জরুরি, যাতে ন্যায় ও সম্প্রীতি অটুট থাকে।

প্রথমত: ইসলামী শরিয়তের দৃষ্টিতে, স্ত্রীকে স্বাধীন ও ব্যক্তিগত আবাসন দেওয়া স্বামীর মৌলিক দায়িত্ব। আল-কুরআনে বলা হয়েছে: “তোমরা তাদের (স্ত্রীদের) বসবাসের ব্যবস্থা করো যেখানে তোমরা থাকো, তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী।” (সূরা আত-তালাক ৬৫:৬)

এ থেকে বোঝা যায়, স্ত্রী এমন একটি ব্যক্তিগত জায়গার অধিকার রাখেন যেখানে তিনি নিরাপদ, সম্মানিত এবং হস্তক্ষেপমুক্ত অনুভব করবেন। চার মাযহাবের ফকিহগণও একমত যে, যদি গোপনীয়তা ও স্বস্তি ব্যাহত হয় তবে স্ত্রীকে স্বামীর পিতামাতা, ভাইবোন বা অন্যান্য আত্মীয়দের সঙ্গে থাকতে বাধ্য করা যাবে না।

দ্বিতীয়ত: স্ত্রীকে শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা বা তাদের যত্ন নেওয়ার কোনো শরঈ দায়িত্ব দেওয়া হয়নি। এই দায়িত্ব পুরোপুরি তাদের ছেলে, অর্থাৎ স্ত্রীর স্বামীর ওপর বর্তায়। অবশ্যই স্ত্রী যদি স্বেচ্ছায় সদিচ্ছা থেকে তাদের সাহায্য করেন, তবে এটি প্রশংসনীয় এবং সওয়াবের কাজ হবে, কিন্তু এটি তাঁর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। স্ত্রীর প্রধান দায়িত্ব তাঁর স্বামী ও সন্তানদের প্রতিই সীমাবদ্ধ।

তৃতীয়ত: বিররুল ওয়ালিদাইন—অর্থাৎ পিতামাতার প্রতি সদাচরণ ও দায়িত্ব পালন—এটি সন্তানের নিজের ওপর ফরজ। কুরআন পিতামাতার প্রতি সদয় হওয়া, সম্মান দেখানো এবং যত্ন নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে

(সূরা আল-ইসরা ১৭:২৩)।

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, এই দায়িত্ব পুত্রবধূর কাঁধে চাপানো হবে। বরং ছেলেই নিজ উদ্যোগে তাঁর পিতামাতার খরচ বহন ও যত্ন নেওয়ার ব্যবস্থা করবে—নিজ হাতে, আর্থিক সহায়তার মাধ্যমে, বা উপযুক্ত সাহায্যের ব্যবস্থা করে।

একইসাথে, সেই সমাজে যেখানে প্রসারিত পরিবার একত্রে বসবাস করে, সেখানে প্রজ্ঞা ও সংবেদনশীলতা অপরিহার্য। হঠাৎ আলাদা হয়ে যাওয়া, কিন্তু পিতামাতার প্রতি যত্ন না দেখানো—এটি বিরূপ প্রতিক্রিয়া বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করতে পারে। তাই স্বামীর উচিত স্ত্রীকে তাঁর নিজস্ব গোপনীয়তা দেওয়ার ব্যবস্থা করা। এটি হতে পারে আলাদা বাড়ি, আর্থিক অসুবিধা থাকলে একই পরিবারের ভেতরে আলাদা অংশ। আর পাশাপাশি, স্বামীকে করুণা ও দায়িত্বশীলতার সাথে তাঁর পিতামাতার হক আদায় করতে হবে।

এই ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি স্ত্রীকে মর্যাদা দেয়, পিতামাতার অধিকার নিশ্চিত করে এবং পারিবারিক সম্প্রীতি বজায় রাখে।

————-

মূল : ড. মোহাম্মদ আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *