ফেরেশতাদের এমনভাবে সৃষ্টি করা হয়েছে যে তারা কেবল আনুগত্যই করতে পারে এবং অবিরত আল্লাহর নৈকট্যে উন্নীত হতে থাকে। তারা অবাধ্য হয় না এবং বিদ্রোহের উপযোগীও নয়। কারণ তাদের দায়িত্ব হলো স্রষ্টা ও সৃষ্টির মধ্যে মধ্যস্থতাকারীর কাজ করা। অবশ্যই আল্লাহর কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন নেই; তিনি সরাসরি কার্য সম্পাদনে সম্পূর্ণ সক্ষম। কিন্তু তাঁর চিরন্তন প্রজ্ঞার সিদ্ধান্ত হলো—তাঁর প্রত্যক্ষ কার্য-প্রকাশ ও সৃষ্টি-জগতের মাঝে একটি পর্দা থাকা উচিত, কারণ সৃষ্টি সরাসরি তাঁর ইচ্ছার প্রকাশ সহ্য করতে পারত না।
অন্যদিকে জিন ও মানুষকে দেওয়া হয়েছে দুই সম্ভাবনা—তারা চূড়ান্ত উচ্চতায় উঠতে পারে, আবার সর্বনিম্ন স্তরেও নেমে যেতে পারে। দয়াময় আল্লাহর ইচ্ছা হলো তারা যেন সৎপথ বেছে নেয় এবং তাঁর চিরন্তন অনুগ্রহ লাভের যোগ্য হয়ে ওঠে। আর সেই একই দয়ার কারণেই তিনি নবীদের পাঠিয়েছেন, কিতাব নাজিল করেছেন এবং উপদেশ ও সতর্কবার্তার ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছেন।
সুতরাং, জাহান্নাম সৃষ্টি করা হয়নি এ কারণে যে আল্লাহ শাস্তি দিতে আনন্দ পান বা তাতে তাঁর কোনো লাভ হয়—এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল। বরং এটি স্বাধীনতার অপব্যবহারের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি, সেইসব মানুষের জন্য ন্যায়বিচারের প্রকাশ যারা সচেতনভাবে দয়ার পথকে প্রত্যাখ্যান করেছে। পরীক্ষায় সাফল্যের ফল হলো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও চিরস্থায়ী জান্নাত; আর ব্যর্থতার ফল হলো ক্ষতি, দূরত্ব এবং জাহান্নামের শাস্তি।
আসলে উভয় ফলই আল্লাহর দয়ার প্রকাশ—দয়া দ্বারা তিনি পথ দেখান, সতর্ক করেন, সত্যকে পরিষ্কার করে দেন; আর ন্যায়ের দ্বারা কাউকে দলিল বা সুযোগ ছাড়া ফেলে রাখেন না। যেমন কুরআনে বলা হয়েছে:
“আল্লাহ কখনো মানুষের প্রতি অন্যায় করেন না; বরং মানুষ নিজেরাই নিজেদের প্রতি অন্যায় করে।” (ইউনুস: ৪৪)
অতএব, মানবসৃষ্টি, পরীক্ষা ব্যবস্থা, এমনকি জাহান্নামের অস্তিত্ব—এসব কিছুর উদ্দেশ্য স্রষ্টার কোনো প্রয়োজন মেটানো নয়, যিনি তো একেবারেই অমুখাপেক্ষী। বরং এগুলো সৃষ্টিরই কল্যাণের জন্য—তাদের সামনে উন্মুক্ত করা হয়েছে পূর্ণতার পথ, চিরস্থায়ী সাফল্য ও আল্লাহর নৈকট্যের আনন্দ।
মানুষের আনুগত্য ও ইবাদতে আল্লাহর কিছুই বৃদ্ধি পায় না, আবার তাদের গুনাহ ও বিদ্রোহে তাঁর কিছুই হ্রাস পায় না। তবে তিনি তাঁর বান্দাদের মর্যাদা দিতে ভালোবাসেন, পুরস্কৃত করতে ভালোবাসেন; শাস্তি দিতে তিনি ভালোবাসেন না।
আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর আনুগত্যশীল বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত করুন, তাঁর অসন্তুষ্টির কারণগুলো থেকে রক্ষা করুন, আর তাঁর রহমতের দ্বারা আমাদের জান্নাতে প্রবেশ করান—যেখানে চিরকাল তাঁর সান্নিধ্যে থাকা যাবে।
আমীন।
———-
ক্যাটাগরি : ইসলামি চিন্তাধারা, দর্শন, শিক্ষা।
—
✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ
—-
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/6916