হযরত আবু দারদা (রা.)-এর একটি বাণীর ব্যাখ্যা।
————-
একজন আন্তরিক ও সৎ শিক্ষিকা একটি প্রশ্ন পাঠিয়েছেন—
|| প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম,
সহীহ বুখারীতে হযরত আবু দারদা (রা.)-এর একটি উক্তি এসেছে:
“وقال ابو الدرداء فی المري ذبح الخمر النينان والشمس”
দয়া করে এর ব্যাখ্যা দিন।
মাছ কি খমরের (মদের) প্রভাব দূর করে দেয়, আর এতে কি খমর হালাল হয়ে যায়? খমরের হারামত্ব কুরআন-হাদীসে খুবই কঠোরভাবে এসেছে। এজন্য যারা পান করে, খাওয়ায়, কেনাবেচা করে—সবাই লা’নতপ্রাপ্ত হয়েছে। শরীয়তের দৃষ্টিতে শুধু লেনদেনই নয়, খমরের যে কোনো ব্যবহারই নিষিদ্ধ। তাহলে প্রসেস করে ব্যবহার করার বিষয়টি কিভাবে বোঝা হবে? বর্তমানে রান্নায় ওয়াইন ব্যবহার করা হয় এবং বলা হয়, প্রসেসের মাধ্যমে এর প্রভাব চলে যায়। এভাবে রান্নায় ব্যবহারের ব্যাপারে শরীয়তের দৃষ্টিভঙ্গি কী?
|| উত্তর:
উল্লিখিত বাণীর অর্থ হলো: ‘মারি’—অর্থাৎ খমরের সেই বিশেষ মিশ্রণ—যা লবণ, মাছ ও রোদের প্রভাবে তার আসল অবস্থা থেকে বদলে যায়, তখন তা যেন ‘যবেহ’ হয়ে যায়, অর্থাৎ হালাল হয়ে যায়।
লবণ ও সূর্যের প্রভাবে খমরের নেশাজনক বৈশিষ্ট্য বিলীন হয়ে যায়। এজন্য বলা হয়েছে: “ذبح الخمر”—অর্থাৎ এটি তার মূল হারাম ও নাপাক অবস্থা থেকে বের হয়ে মুবাহ হয়ে গেল। খমরকে হারাম করার আসল কারণ হলো এর নেশা। যখন সেই নেশা একেবারে দূর হয়ে যায়, তখন এর শরঈ হুকুমও পরিবর্তিত হয়ে যায়।
এ বিষয়ে ফুকাহার মধ্যে দুটি মত পাওয়া যায়—
১. জওয়াজের মত (হানাফি ও মালিকি মাযহাব):
যদি খমর তার নেশাজনক বৈশিষ্ট্য হারিয়ে অন্য কোনো অবস্থায় রূপ নেয়—যেমন ভিনেগারে পরিণত হয়—তবে তা পবিত্র ও হালাল হয়ে যায়। এ মতের ভিত্তি হলো, খমরকে হারাম করার কারণ হলো ইসকার (নেশা)। যখন এই কারণ থাকে না, তখন হারাম থাকাও যুক্তিযুক্ত নয়।
২. তাহরীমের মত (শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাব):
তাদের মতে, খমর সব অবস্থায়ই হারাম ও নাজিস রয়ে যায়। তা যেভাবেই অন্য কিছুর সাথে মিশুক বা যেভাবেই প্রসেস করা হোক, এমনকি রান্নায় ব্যবহার হলেও এর হারামত্ব দূর হয় না। যদি উদ্দেশ্য হয় প্রসেস করে খমরকে হালাল বানানো, তবে তা শরীয়ত অনুযায়ী গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ নিয়তে ‘তাখলীল’ (ইচ্ছাকৃতভাবে ভিনেগার বানানোর চেষ্টা) থাকলে এর হারামত্ব বহাল থাকে।
এই কারণে শায়খুল ইসলাম ইবন তাইমিয়া রহ.সহ অনেক আলেমের মতে—খমর তখনই হালাল ও পবিত্র হবে, যখন আল্লাহর ইচ্ছায় স্বাভাবিকভাবে তা ভিনেগারে পরিণত হবে; মানুষের হস্তক্ষেপে নয়।
বর্তমান প্রেক্ষাপট:
আজকাল রান্নায় ওয়াইন বা খমর অনেক সময় কেবল স্বাদ বৃদ্ধির জন্য ব্যবহার করা হয়। কিন্তু যদি তাতে নেশার প্রভাব থেকে যায়, তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে স্পষ্টত হারাম।
আর যদি কোনো প্রসেসে নেশার বৈশিষ্ট্য পুরোপুরি বিলীন হয়ে যায় এবং খমর একেবারে নতুন, নেশামুক্ত কোনো বস্তুতে পরিণত হয়—যেমন ভিনেগার—তাহলে হানাফি ও মালিকি ফুকাহার মতে তা বৈধ হবে।
তবে বাস্তবে দেখা যায়, রান্নায় ওয়াইন মেশানোর পরও এর নেশাজনক প্রভাব অনেকাংশে রয়ে যায়। তাই সর্বোত্তম হলো—এ থেকে বেঁচে থাকা ও সতর্কতা অবলম্বন করা।
সারসংক্ষেপ:
খমরকে হারাম করার মূল কারণ হলো এর নেশা। যদি সেই নেশা অটল থাকে, তবে কোনো পরিবর্তন বা প্রসেসই তাকে হালাল করতে পারবে না। আর যদি তা সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যায় এবং খমর নতুন, নেশামুক্ত কোনো বস্তুতে রূপান্তরিত হয়, তবে কিছু ফুকাহার মতে এর ব্যবহার অনুমোদিত।
——————–
ক্যাটাগরি : ফিকহ, ফাতাওয়া।
—-
✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ
—-
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/6869