শিরোনাম : ইতিহাস কী?
———-
ইতিহাস সেই মৌলিক জ্ঞানশাস্ত্রগুলির একটি, যার অভাবে কাউকে প্রকৃত অর্থে বিদ্বান বলা কঠিন। এই মৌলিক তিনটি শাস্ত্র হলো: সাহিত্য, ইতিহাস এবং দর্শন। প্রতিটি শাস্ত্র মানুষের বোধশক্তি ও চেতনা গঠনে মূল ভূমিকা রাখে। তবে এই আলোচনায় আমাদের কেন্দ্রবিন্দু হলো ইতিহাস।
ইতিহাস কেবল ঘটনার বর্ণনা নয়, বরং এটি মানবচেতনার আয়না। এখানে অতীতের ঘটনা, মানবকর্ম, সামাজিক কাঠামো এবং সভ্যতার বিকাশের প্রতিফলন থাকে। ইতিহাসের মাধ্যমে মানুষ অতীত থেকে শিক্ষা ও প্রজ্ঞা অর্জন করে, বর্তমানকে বুঝে এবং ভবিষ্যতের সম্ভাবনার দিকনির্দেশ পায়।
ইতিহাসের একটি পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞা এভাবে দেওয়া যায়:
এটি হলো মানব-সংক্রান্ত ঘটনা ও কার্যকলাপের সুসংগঠিত অধ্যয়ন—যার উদ্দেশ্য হলো অতীতের অবস্থা সংরক্ষণ করা, তা বিশ্লেষণ করা এবং সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তী প্রজন্মকে পথনির্দেশ প্রদান করা।
এখানেই বুখারি শরিফ ও অন্যান্য হাদিসগ্রন্থের মূলনীতি কার্যকর দেখা যায়, যেখানে রাসুলুল্লাহ ﷺ এর বাণী ও কর্ম নির্ভরযোগ্য সূত্রে সংরক্ষিত হয়ে আমাদের কাছে পৌঁছেছে। প্রকৃতপক্ষে হাদিসও এক ধরনের সংবাদ (خبر) এবং ইতিহাস। বরং সহিহাইন (সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিম)-এর অনুসন্ধান ও যাচাইয়ের মান এতটাই উচ্চ যে বিশ্বের কোনো ঐতিহাসিক গ্রন্থ তার সমকক্ষ হতে পারে না।
রাজনৈতিক ইতিহাসে, ইমাম তাবারি (মৃত্যু: ৩১০ হি.)-এর তারিখুর রুসুল ওয়াল মুলূক একটি মহান গ্রন্থ। এখানে তিনি ইসলামী শাসনব্যবস্থার উত্থান-পতন, খোলাফায়ে রাশেদীনের সিদ্ধান্ত, উমাইয়া ও আব্বাসীয় রাজনীতি এবং সামরিক বিজয় সমূহকে সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে সংরক্ষণ করেছেন। অমুসলিম ঐতিহাসিক এডওয়ার্ড গিবন তাঁর খ্যাতনামা বই Decline and Fall of the Roman Empire-এ রোমান সাম্রাজ্যের পতনের যে বিশ্লেষণ করেছেন, তা আজও পাশ্চাত্যের ঐতিহাসিক চিন্তার ভিত্তি ধরা হয়।
সামাজিক ইতিহাসে, ইবন খালদুন (মৃত্যু: ৮০৮ হি.)-এর মুকাদ্দিমাহ অসাধারণ গুরুত্ব বহন করে। এখানে তিনি গোত্র, নগর, সভ্যতা এবং মানবসমাজের গঠন ও বিকাশের গভীর বৈজ্ঞানিক নীতিমালা প্রণয়ন করেছেন। পাশ্চাত্যে একই ধরনের বিশ্লেষণ দিয়েছেন মার্ক ব্লখ ও এরিক হবসবম, যারা সামাজিক শ্রেণি ও বিপ্লবগুলোকে সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিশ্লেষণ করেছেন।
অর্থনৈতিক ইতিহাসে, আল্লামা আল-মাকরিজি (মৃত্যু: ৮৪৫ হি.)-এর إغاثة الأمة بكشف الغمة একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা। এতে তিনি মিশরে দুর্ভিক্ষ ও অর্থনৈতিক সংকটের কারণ ও ফলাফলকে গভীরভাবে বিশ্লেষণ করেছেন। আধুনিক যুগে ফার্নান্দ ব্রাউডেল তাঁর The Mediterranean World গ্রন্থে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি বিবর্তনমূলক উপাদানগুলো সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করেছেন।
সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক ইতিহাসে, শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী (মৃত্যু: ১১৭৬ হি.)-এর বৌদ্ধিক আন্দোলন ভারতবর্ষের চিন্তাধারা ও সভ্যতাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। পাশ্চাত্যে জ্যাকব বারখার্ট তাঁর প্রসিদ্ধ বই The Civilization of the Renaissance in Italy-এ কলা ও মানবমুক্তির পারস্পরিক সম্পর্ক যুক্তিসম্মতভাবে উপস্থাপন করেছেন।
সামরিক ইতিহাসে, ইমাম ওয়াকিদি (মৃত্যু: ২০৭ হি.)-এর আল-মাগাযি এবং তাবারির ফুতুহাত-সংক্রান্ত অধ্যায়গুলো মুসলমানদের সামরিক ব্যবস্থা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। আধুনিক যুগে কার্ল ফন ক্লাউজেভিটস তাঁর On War গ্রন্থের মাধ্যমে যুদ্ধদর্শনের একটি স্থায়ী ধারা প্রবর্তন করেন।
পরিবেশ-ইতিহাসে, আল-বিরুনি (মৃত্যু: ৪৪০ হি.)-এর আল-হিন্দ অসাধারণ মূল্য বহন করে। এখানে তিনি ভূগোল, আবহাওয়া এবং মানবজীবনের পারস্পরিক সম্পর্কের ওপর বিস্তারিত আলোকপাত করেছেন। সমকালীন যুগে জ্যারেড ডায়মন্ড তাঁর Guns, Germs, and Steel-এ দেখিয়েছেন কিভাবে প্রকৃতি ও সম্পদ মানবসভ্যতার বিকাশে নির্ধারক ভূমিকা পালন করে।
মৌখিক ইতিহাসের উজ্জ্বলতম উদাহরণ হলো সাহাবায়ে কেরাম রাযি.। তাঁরা রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর কথা, কাজ ও অবস্থা সংরক্ষণ করেছেন। পরবর্তী প্রজন্ম এসব বর্ণনাকে লিপিবদ্ধ করে হাদিসশাস্ত্র, সীরাতশাস্ত্র ও ইতিহাসের রূপে উত্তরাধিকারসূত্রে হস্তান্তর করেছে। প্রকৃতপক্ষে হাদিস হলো সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও সামরিক ইতিহাসেরই একটি দিক। এর রচনা নবী ﷺ-এর যুগেই শুরু হয়ে যায়, যার বিস্তারিত আমি আমার বই تمهيد علم الحديث-এ উল্লেখ করেছি।
বিশ্ব ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে, ইবনুল আসিরের আল-কামিল ফিত-তারিখ এবং আধুনিক ঐতিহাসিক উইলিয়াম ম্যাকনিল-এর A World History প্রমাণ করে যে ইতিহাস কোনো একটি জাতির সম্পত্তি নয়, বরং এটি মানবচেতনার যৌথ আমানত।
অতএব, ইতিহাস কেবল অতীতকে সংরক্ষণের নাম নয়। এটি হলো ঘটনার কারণ, ফলাফল ও প্রভাবের গভীর গবেষণা ও বিশ্লেষণ। এ জ্ঞান মানুষকে সেই অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে যাতে সে অতীতের আলোকে বর্তমানকে উন্নত করতে পারে এবং ভবিষ্যতের জন্য সঠিক দিক নির্ধারণ করতে পারে।