AkramNadwi

শিরোনাম : তুরকীর মতো মানুষ বড়ই বিরল। ————

শিরোনাম : তুরকীর মতো মানুষ বড়ই বিরল।
——————–

আমি কখনো ভুলব না সেই দিনটি—যেদিন প্রথমবার তুরকী আল-ফুজলীকে দেখেছিলাম।
তাকে দেখে মনে হয়েছিল, তিনি যেন বেরিয়ে এসেছেন প্রতিভাবান আলেমদের পুরনো গ্রন্থভাণ্ডারের তাক থেকে।
মনে হয়েছিল, হাফিজ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহিমাহুল্লাহর (صفحات من صبر العلماء على شدائد العلم والتحصيل) “শিক্ষা ও জ্ঞান অর্জনের কষ্ট সহ্য করার গল্প” গ্রন্থের ঝলমলে কোনো পাতা থেকে তিনি জীবন্ত হয়ে এসেছেন।
আবার মনে হচ্ছিল, ইমাম শামসুদ্দীন যাহাবীর সিয়ার আ’লামিন নুবালা বা তারিখুল ইসলাম থেকে অজান্তেই তিনি বেরিয়ে পড়েছেন।
হয়তো ইবনু আবি হাতিম যখন তার পিতার কাহিনি লিখছিলেন, তখন সেসব চরিত্রের একজন যেন হঠাৎ সশরীরে এসে দাঁড়িয়েছেন আমার সামনে।

তাঁর মধ্যে আমি দেখতে পেয়েছিলাম তৃতীয় হিজরি শতকের মহৎ মানুষদের বৈশিষ্ট্য।
তাদের মতোই তাঁর হাঁটার ভঙ্গিতে ছিল সুন্নাহর মর্যাদার আভা।
আর তাঁর কথা বলার ভেতর দিয়ে ভেসে আসছিল সালাফদের সুগন্ধি ঐতিহ্য।

তিনি যেন এসেছিলেন আমাদের মনে করিয়ে দিতে—আমরা একসময় কী ছিলাম।
যে সময় আমাদের আলেমরা ছিলেন প্রাণবন্ত ও দৃঢ়চেতা।
কিন্তু আজ আমরা নিস্তেজতার রোগে আক্রান্ত।
আমাদের মাঝে বেড়েছে নামধারী বর্ণনাকারীর সংখ্যা, কিন্তু কমে গেছে সত্যিকারের দক্ষ ও বিশ্বস্ত মানুষ।

তুরকী তার সমসাময়িকদের মধ্যে শিখন-অর্জন, চরিত্র-নৈতিকতা, আচরণ ও ভদ্রতায় স্পষ্টভাবে এগিয়ে। তার হাঁটায় আছে অভিজ্ঞ, প্রাজ্ঞ আলেমের সেই মর্যাদাপূর্ণ স্থিরতা—যদিও তার মাথায় এখনো শ্বেত চুল জ্বলে ওঠেনি। তার একান্ত নির্জনে বিদ্যাচর্চার ভঙ্গি যেন সেই অবিবাহিত ব্যক্তির মতো, যিনি নিজের অন্তর পুরোপুরি উৎসর্গ করেছেন জ্ঞানচর্চায়—যদিও তিনি বিবাহিত, এবং তার ঘর সন্তানদের কোলাহলে ভরা। তার কথাবার্তায় পাওয়া যায় সেই মর্যাদাপূর্ণ মজলিসের ছাপ—যেখানে বসতে পারে কেবল তারা-ই, যারা জানে শব্দের মর্যাদা ও নীরবতার মূল্য। তার চোখে আছে সেই অদ্ভুত দীপ্তি, যা দেখা যায় শুধু তাদের চেহারায়—যারা পান করেছে এক নির্মল উৎস থেকে, যেটি তাড়াহুড়োর হাত থেকে অক্ষত, আর যাদের জ্ঞানপিপাসা ছিল দেখানোর জন্য নয়, বরং বোঝার জন্য। মনে হয়, তার আত্মা গড়া হয়েছে সালাফদের ধৈর্য দিয়ে, আর তার উচ্চাকাঙ্ক্ষা ঢালাই করা হয়েছে আলেমদের দৃঢ় ধাতুতে।

তিনি শায়খদের সাহচর্য করেছেন যেমন একটি সন্তান দীর্ঘ সফরে পিতার সাহচর্য করে—তাদের মুখ থেকে ঝরে পড়া প্রতিটি কথা তিনি কুড়িয়ে নিয়েছেন, যা তার কাছে রত্নের চেয়েও মূল্যবান, আর সেগুলো সংরক্ষণ করেছেন এমনভাবে, যেমন এক মিতব্যয়ী তার শেষ সোনার মুদ্রাটি সযত্নে রাখে। তিনি শায়খদের কাছে জিজ্ঞেস করতেন মানুষদের সম্পর্কে, তাদের উপাধি ও বংশপরিচয়, তাদের বর্ণনা ও হাদিস বহনের অবস্থা—কিন্তু কখনো তাড়াহুড়ো করে শুধু নাম লিখে নেওয়া বা অচেতনভাবে কোনো শব্দ গ্রহণ করায় সীমাবদ্ধ থাকতেন না।

তার এই মনোযোগী ও সতর্ক স্বভাব আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় এক ছাত্রের কাহিনি, যে একটি সনদ উল্টো পড়ে ফেলেছিল। যখন তাকে সতর্ক করা হলো, সে বলল, “আমার শায়খ এভাবেই পড়েছেন।” তখন বলা হলো, “তাহলে তোমার শায়খ একবার উল্টেছেন, আর তুমি সেটি দ্বিগুণ উল্টে দিলে!” সে ছিল সেই দিনের কথা, যখন মানুষের হৃদয় হাদিস মুখস্থ করার জন্য ছিল, সনদ উল্টানোর জন্য নয়।

ইমাম বুখারি যথার্থই বলেছেন—
“আমি যেমনভাবে হাদিস লিখেছি, তেমনভাবে এরা লেখেনি। আমি যখন কারো কাছ থেকে লিখতাম, তখন তার নাম, উপাধি, বংশপরিচয়, এবং তার বর্ণনা ও বোঝার ক্ষমতা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতাম। যদি তিনি বোধসম্পন্ন হতেন, তাহলে তার মূল পাণ্ডুলিপি দেখতে চাইতাম। কিন্তু অন্যরা এসব তোয়াক্কা করে না—কী লিখছে, কিভাবে লিখছে, কিছুই পরোয়া করে না।”
(সিয়ার আ’লামিন নুবালা, ১২/৪০৬)

যদি আজ বুখারি আমাদের মাঝে ফিরতেন, তবে তিনি দেখতেন—মানুষ এমন সব লোকদের থেকে লিখছে যাদের নামও জানে না, শায়খ কারা তাও জানে না, এমনকি তারা কোন দেশে থাকে সেটাও জানে না!

আমাদের যুগের অনেক হাদিস শিক্ষার্থী মুগ্ধ হয়েছে কেবল সামা’ (শোনার) প্রতি, এবং শায়খদের সামনে কিতাব পড়াকে তারা এমনভাবে নেয়, যেন শিশুরা ডাকটিকিট বা পুরনো মুদ্রা সংগ্রহ করছে। তারা যাচাই-বাছাই ছাড়া লিখে চলে, ইজাযাহ সংগ্রহ করে কিন্তু ফিকহ বোঝে না, পাঠে ভুল করে, অর্থ বুঝতে হোঁচট খায়, ভাষাগত ভুলে পড়ে যেমন ঘোড়া কাদায় পড়ে যায়—তারপরও গর্বভরে ওঠে দাঁড়িয়ে, যেন তারা অ্যান্দালুস পুনরায় জয় করে ফেলেছে! অথবা যেন তারা শাহজাহানকেও ছাড়িয়ে গেছে তাজমহল তৈরিতে! মনে হয় আরবি ভাষা তাদের ছেড়ে গেছে কোনো সুন্দর বিচ্ছেদের মতো, আর ফুসহা যেন হয়ে গেছে কোনো দূরবর্তী স্বপ্ন, যা স্পর্শ করা যায় না।

কিন্তু তুরকী—তিনি শিখেছেন নাহু, সরফ ও ই’রাব এমনভাবে, যেন তার জিহ্বা খাপ থেকে বের করা তলোয়ার—যা না তোতলায়, না দ্বিধা করে। তিনি পাঠ করেন মূল পাঠ ঠিক যেমনটি নাজিল হয়েছে, বুঝেন লেখকের উদ্দেশ্যমতো, মিলিয়ে নেন সাদৃশ্যগুলো যেমন দক্ষ জহুরী মুক্তো আর কাচের পার্থক্য বোঝেন। তিনি জানেন ইসনাদের উচ্চ ও নিম্ন স্তর,

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *