শিরোনাম : তুমি তাজমহল বানাতে পারো, কিন্তু কাবা নয়।
——————–
بسم الله الرحمن الرحيم.
সেটি ছিল জুমার দিন, চতুর্দশ শতাব্দীর সাতচল্লিশ হিজরির চতুর্দশ সফরের সেই পুণ্যময় ক্ষণ, যখন জেদ্দার ভূমিতে আমাদের পা পড়ল। ভাগ্যের লওহে মহফুজে তখন লিপিবদ্ধ হয়ে গেল—এক কাফেলা তার আসল মাতৃভূমির পথে যাত্রা শুরু করছে। ঘণ্টা এখনো পূর্ণ হয়নি, এরই মধ্যে কাফেলার গতি মক্কার দিকে ঘুরে গেল।
হে বন্ধুরা! এটি সেই পথ ছিল না, যেখান দিয়ে সাধারণ কাফেলা তাদের মালপত্র বোঝাই করে চলে যায়। এটি সেই মহাসড়ক ছিল, যার প্রতিটি ধুলিকণায় দোয়ার উষ্ণতা জ্বলছিল, প্রতিটি বাতাসে জিকিরের সুবাস মিশে ছিল, প্রতিটি বাঁকে অশ্রুর মুক্তো ছড়িয়ে ছিল, আর প্রতিটি হাওয়ার ঝাপটায় আশা-ভরসার গান দোলা দিচ্ছিল। এটি বালু ও পাথরের শুধু একটি গলি ছিল না—এটি ছিল হৃদয় ও ঈমানের উজ্জ্বল সেতুপথ, যার সঙ্গে মাটির ও আকাশের কাহিনি পাশাপাশি চলছিল, আর অন্তর ও প্রভুর গোপন কথা কানে কানে বলা হচ্ছিল।
জীবন কী?—একটি ভিড়ের কোলাহল, দিকহীন এক কাফেলা, অবহেলার এক স্রোত, যেখানে মানুষ তার পরিচয় হারিয়ে ফেলে। তারপর তাকদিরের এক হাত বাড়িয়ে তোমার কাঁধ ধরে, তোমাকে সেই পথে নামিয়ে দেয়, যে পথ সরাসরি পৌঁছে দেয় সেই ঘরে, যে ঘর আল্লাহর, আর যে ঘর শুধু আল্লাহর দিকেই ডাকে।
আমি গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম—মরুভূমি রোদে সোনালি লাগছিল, বালু ছিল ঢেউ খেলানো, কিন্তু গরমের তাপ লাগছিল না, তৃষ্ণার জ্বালা অনুভূত হচ্ছিল না—কারণ আমরা পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন এক শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়িতে ছিলাম। হৃদয় বলল—এ কি সেই ভূমি নয়, যেখানে একদিন ইবরাহিম (আ.)-এর পদধূলি পড়েছিল? এ কি সেই বালুকণা নয়, যার নিচ থেকে বাইতুল্লাহর ভিত্তি উঠেছিল? এ কি সেই বাতাস নয়, যেখানে প্রিয় নবী ﷺ তাওয়াফ করেছিলেন, সাফা-মারওয়ার সাঈ করেছিলেন, ওহির নাজিল প্রত্যক্ষ করেছিলেন এবং তাঁর ওষ্ঠ যুগল দোয়ার জমজমে ভিজিয়ে নিয়েছিলেন?
হে পথিক! এ পথ এক নীরব আহ্বান, যা বলে—তুমি এমন এক উপস্থিতির কাছাকাছি চলে এসেছ, যার মতো আর কোনো উপস্থিতি নেই; এমন এক নৈকট্য, যা অন্তরের আয়নাকে আলোকিত করে দেয়; আর মানুষ জেনে যায়—সে কেন এসেছে, আর কোথায় যাবে।
মনে পড়ে গেল—পূর্বের প্রতিটি মক্কা সফরই ছিল এক নতুন জগৎ, এমন জগৎ যার আকাশ আর কোনো আকাশের সঙ্গে মেলে না, যার জমিন আর কোনো জমিনের সঙ্গে যুক্ত নয়, যার বাতাস আর কোনো বাতাসের সঙ্গে মেশে না। প্রতিটি সফরের শেষে হৃদয়ে জমে থাকত এক খনি, এমন খনি যা না জিহ্বার শব্দ ধারণ করতে পারত, না কলমের নিব ধরে রাখতে পারত। আর আমি আমার সরল মনে ভাবতাম—এবার নিশ্চয়ই শেষ রহস্য পেয়ে গেছি, পেয়েছি সেই পেয়ালা যা প্রশ্নকে নীরব করে দেয় আর তৃষ্ণাকে মিটিয়ে দেয়।
কিন্তু পরের সফর এসে আমার এ ধারণা ভেঙে চুরমার করে দিত—এটি প্রস্থে আরও বৃহৎ, গভীরতায় আরও গভীর, প্রভাবে আরও প্রবল হতো। এমন এক দ্বার খুলে যেত, যা আগে কল্পনাতেও ছিল না; এমন এক রহস্য মিলত, যা পুরনো রহস্যগুলোকে মুছে দেয় না, বরং আরও বাড়িয়ে ও উজ্জ্বল করে। প্রতিটি জিয়ারত একটি বই, আর যখন তুমি সেটি শেষ করো, তখন বুঝতে পারো—এ তো কেবল ভূমিকাই ছিল, আসল অধ্যায়গুলো তো এখনো বাকি।
জুমার নামাজের পর, ঠিক আড়াইটায় আমরা উমরার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। পথের মাঝামাঝি পৌঁছে যখন দিগন্তে হারামের মিনারগুলো ভেসে উঠল, মনে হল—যেন আলোয় গড়া স্তম্ভগুলো মাটি থেকে উঠে আকাশের ছাদে মিশে গেছে। হৃদয়ে এক কম্পমান অবস্থা তৈরি হল—এটি কি অশ্রু, নাকি আনন্দ, নাকি বিস্ময়—বোঝা যাচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, পায়ের আগে হৃদয় যেন ভেতরে পৌঁছে যায়; হাজরে আসওয়াদের সঙ্গে লেপটে যাই; জুতো খোলার আগেই যেন সব নূর বুকে ভরে নিই।
মুমিনের জন্য বাইতুল্লাহ থেকে দূরে থাকা—সেই পবিত্র ঘর থেকে, যেটিকে আল্লাহ তাঁর রহমতের ছায়া ও বান্দাদের হৃদয়ের প্রশান্তি বানিয়েছেন—এ আসলে নিজের অস্তিত্বের খনি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার সমান। এই দূরত্ব কেবল হেদায়াতের পথে ক্ষতি ও ঘাটতি আনে না, বরং অন্তর ও প্রাণে ফিতনা ও বিকার জন্ম দেয়। যে ব্যক্তি আল্লাহর দিকে মুখ ফেরায় না, সে তার আসল গন্তব্য থেকে হারিয়ে যায়; আর যে আল্লাহর আশ্রয় থেকে দূরে সরে যায়, সে অন্ধকারে ডুবে যায়।
হে পূর্ব ও পশ্চিমের বাসিন্দারা! যদি বদরের চাঁদ হারিয়ে যায়, হয়তো তোমরা আরেকটি চাঁদ বানিয়ে নিতে পারবে; যদি সকালের সূর্য উঠতে দেরি করে, হয়তো তোমরা আরেকটি সূর্য তৈরি করে ফেলতে পারবে। কিন্তু বলো তো—তোমরা কি বাইতুল্লাহ, সেই ইবরাহিমি ঘরের সমতুল্য কোনো ঘর নির্মাণ করতে পারবে?
যাও, তাজমহল গড়ে তোলো—একটি নয়, শত শত বানাও; প্রতিটি দেশে একটি, প্রতিটি শহরে একটি করে। কিন্তু জেনে রাখো—এসব সবই হবে প্রাণহীন কবর, নিথর সমাধি। এটাই তোমাদের সামর্থ্যের সীমা। তোমরা, সমগ্র মানবজাতি ও জিন জাতি—বরং সব সৃষ্টিই একসঙ্গে মিললেও—সেই কাবা নির্মাণ করতে পারবে না, যে কাবায় পৃথিবীর মানুষের জীবনের রহস্য নিহিত, যার উপর মানব অস্তিত্বের ভারসাম্য নির্ভর করে আছে, যার বরকত চারদিক ছড়িয়ে পড়েছে, আর যার দান-খয়রাত যুগের পর