AkramNadwi

❖ শিরোনাম : শিক্ষা-অমানতের সংকট

❖ শিরোনাম : শিক্ষা-অমানতের সংকট<br>
নিশ্চয়ই পাঠকদের কাছে এই শিরোনামটি কঠোর মনে হবে, অথবা অন্তত সূক্ষ্ম রুচির ওপর ভারী লাগবে। আমার অবস্থাও আপনাদের থেকে ভিন্ন নয়। মনে অনেক শিরোনাম এসেছিল, সেগুলো ছিল নরম ও হালকা, কিন্তু এই লেখার যে বার্তা পৌঁছে দেওয়া উদ্দেশ্য, তা প্রকাশে সেগুলো অক্ষম ছিল। তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও এই তিক্ততাকে গ্রহণ করা হয়েছে। সম্ভবত পুরো প্রবন্ধটি পড়ার পর অধিকাংশ পাঠক লেখকের যন্ত্রণা অনুভব করবেন, বিষয়টির গুরুত্ব উপলব্ধি করবেন এবং এই শিরোনামকে ন্যায্য বলেই মনে করবেন। আর যে লেখায় ফুল নেই, আছে কেবল ধারালো ও বিষাক্ত কাঁটা—তার জন্য এমন শিরোনামই মানানসই। বাজারে হৃদয়ের রক্ত নিয়ে আসা মানুষের সঙ্গে বস্তুবাদী ব্যবসায়ীর পার্থক্য যে কত গভীর! ভারতে সাম্প্রতিক সফরের সময় যেমন অনেক সুখকর অভিজ্ঞতা হয়েছে, তেমনি কিছু বেদনাদায়ক বাস্তবতাও সামনে এসেছে। তার মধ্যে একটি বাস্তবতা সম্পর্কে এই মুহূর্তে কিছু বলার সাহস করছি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অযোগ্য শিক্ষকের সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে, আর শিক্ষার্থীদের অসহায় অবস্থা দেখবার মতো। তারা জ্ঞান অর্জনের আকাঙ্ক্ষায় ঘর ছেড়েছে, বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনের বিচ্ছেদ সহ্য করেছে, পরিচিত দেশ ছেড়ে এসেছে, জীবনের মূল্যবান সময় উৎসর্গ করছে—কিন্তু হায় দুর্ভাগ্য! যাদের ওপর ভরসা করে তারা এই পথ ধরেছে, তারাই বিশ্বাসযোগ্য নয়। হায় পরিতাপ! পথপ্রদর্শকরাই হয়ে উঠেছে পথডাকাত। কিছু শিক্ষক আছেন, যারা প্রায় সর্বদাই যাত্রাপথে, মাদরাসায় কম, সফরে বেশি। দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে ফিরে এলেও পড়ানোর প্রতি তাদের মন বসে না। আবার কিছু শিক্ষক আছেন, যারা মাদরাসার চার দেয়ালের মধ্যেই থাকেন, তবু শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি ও নিজের দায়িত্ব পালনের কোনো তোয়াক্কা করেন না। কেউ কেউ পড়ান ঠিকই, কিন্তু কোনো অধ্যয়ন ও গবেষণা ছাড়াই। আবার এমনও আছেন, যাদের নিজের বিষয়ের প্রতিই আগ্রহ নেই; অপ্রাসঙ্গিক কথাবার্তায় তারা শিক্ষার্থীদের সময় নষ্ট করেন। পাঠদান এক মহামূল্যবান আমানত। জেনেশুনে এই আমানতের প্রতি অবহেলা করা, আর সেই অবহেলাকে অভ্যাসে পরিণত করা, এ যদি বিশ্বাসঘাতকতা না হয়, তবে আর কী? একটি জাতির নবীন প্রজন্মের জীবন ধ্বংস করা, তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলাচ্ছলে আচরণ করা, দেশ ও জাতির সম্পদ অপচয় করা, আর এই বিশ্বাসঘাতকতার বিনিময়ে বেতন গ্রহণ করা, এ যদি অপরাধ না হয়, তবে আর কী? যে শহরে ফকিরের উপার্জন লুণ্ঠিত হয়, সে শহরের শাসকের কোথাও না কোথাও ভুল হয়েছে। যেদিকেই তাকাই, বাগানে শুধু আগুন আর আগুন! এই উদ্যানের মালী কোথাও ভুল করেছে নিশ্চয়ই। এই পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীরা ক্ষুব্ধ, নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে হতাশ। তারা বুঝে উঠতে পারে না – কী করবে, কীভাবে এই বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া এবং এই অপরাধের শাস্তি ভোগ করা থেকে নিজেকে রক্ষা করবে। আমাকে বলা হয়েছিল, আমি যেন এ বিষয়ে কিছু লিখি। আমি ভাবছিলাম, আমার লেখাকে কি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা হবে না? শেষ পর্যন্ত মনে প্রাধান্য পেল এই উপলব্ধি যে, যখন অন্যায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তখন প্রত্যেক মানুষেরই দায়িত্ব, নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী—তা সংশোধনের চেষ্টা করা। এই বিষয়ে আমি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন দায়িত্বশীল অধ্যাপকের সঙ্গে মতবিনিময় করি এবং জিজ্ঞেস করি, এখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কি এমন শিক্ষকদের থাকার সুযোগ আছে? তিনি বললেন, খারাপ শিক্ষক এখানেও আছেন, কারণ শিক্ষক নিয়োগের প্রক্রিয়ায় বড় ত্রুটি রয়েছে, আর শিক্ষাদানের মতো মহান পদে অযোগ্য লোক নিয়োগ পেয়ে যায়। তবে এখানে এমনটা অসম্ভব যে কোনো শিক্ষক একেবারেই পড়াবেন না। এমন শিক্ষককে সঙ্গে সঙ্গে বরখাস্ত করা হয়। আর যারা দায়িত্ব পালনে শৈথিল্য দেখায়, সাধারণত শিক্ষার্থীরা তাদের থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করে, এবং প্রশাসনকে তাদের দাবি মানতেই হয়। উপমহাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর এই করুণ দশা শিক্ষাকে মারাত্মক ক্ষতির মুখে ফেলেছে। শিক্ষকদের এই দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ বিশ্বাসঘাতকতা, অপরাধ ও গুনাহের নিকৃষ্টতম দৃষ্টান্ত। এর ফলে তরুণদের সক্ষমতা নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে, জাতিকে বহন করতে হচ্ছে বিপুল ক্ষতি। এমন পরিস্থিতিতে আমরা কীভাবে কোনো বিষয়ে প্রকৃত দক্ষ মানুষের জন্ম আশা করতে পারি? আর সেই প্রজন্মই বা কীভাবে গড়ে উঠবে, যারা জাতির নেতৃত্ব ও পথনির্দেশনার দায়িত্ব পালন করতে পারবে? এ কারণেই আশ্চর্য নয় যে মাদরাসাগুলো থেকে কেবল বক্তা, সাংবাদিক ও রাজনীতিবিদই জন্ম নিচ্ছে। আর যে দেশ বা জাতিতে এদের আধিক্য থাকে, অথচ গবেষক আলেম, শিল্প ও কারিগরির শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা অনুপস্থিত থাকে, তার সংস্কার কখনোই সম্ভব নয়। প্রশ্ন হলো, এর কোনো সমাধান কি আছে? উত্তর হলো, যদি সদিচ্ছা থাকে, তবে সংশোধন সম্ভব। আর সেই সংশোধনের তিনটি স্তর রয়েছে। ১. যেসব শিক্ষক যোগ্য, এবং যেসব বিষয়ের পাঠদানের জন্য তাঁদের নির্বাচন করা হয়েছে সে বিষয়ে সত্যিই দক্ষ, তাঁদের অবশ্যই পেশার মর্যাদা রক্ষায় বাধ্য করা উচিত। নিজেদের দায়িত্ব গভীরভাবে উপলব্ধি করতে হবে, কোনো ব্যক্তিগত ব্যস্ততাকে পাঠদানের ওপর অগ্রাধিকার দেওয়া চলবে না। দাওয়াতি হোক বা অদাওয়াতি, অপ্রয়োজনীয় সফরকে বিদায় জানাতে হবে, সভা-সমাবেশে অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকতে হবে, গভীর অধ্যয়ন করতে হবে, পরিশ্রম ও আন্তরিকতার সঙ্গে পাঠদান করতে হবে। আমাদের শিক্ষকদের মধ্যে মাওলানা মুহাম্মদ ওয়াজেহ রশীদ নদভী, মাওলানা বুরহানুদ্দীন সম্ভালী, মাওলানা নাসির আলী নদভী, মাওলানা শাহবাজ সাহেব প্রমুখ আদর্শ শিক্ষকের তালিকায় উজ্জ্বল অবস্থান অধিকার করে ছিলেন। ২. কখনো কখনো শিক্ষকদের ব্যর্থতার কারণ হয়ে দাঁড়ায় পাঠ্যক্রমে পরিবর্তন, কিংবা শিক্ষার দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো মৌলিক রূপান্তর। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যমান শিক্ষকদের পুনঃপ্রশিক্ষণ অপরিহার্য, যাতে তাঁরা সেই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের সামঞ্জস্য করতে পারেন। অথবা নতুন পাঠ্যক্রম ও ব্যবস্থার মানদণ্ডে উপযুক্ত এমন নতুন শিক্ষকের নির্বাচন করতে হবে। ৩. কখনো কখনো নবীসুলভ নৈতিক সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দেয়। এমন সময় আসে, যখন সাময়িক পার্থিব লাভের আকর্ষণ প্রবল হয়ে ওঠে। তখন আল্লাহ ও আখিরাতের প্রতি সঠিক ও সুদৃঢ় ঈমান ছাড়া অগ্রগতি অসম্ভব। ইসলামী চিন্তাবিদ হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী রহমতুল্লাহি আলাইহি প্রতি নতুন শিক্ষাবর্ষের শুরুতে দারুল উলূমের শিক্ষকদের উদ্দেশে ভাষণ দিতেন, তাঁদের মর্যাদা স্মরণ করিয়ে দিতেন, এবং তাঁদের অন্তরে দায়িত্ববোধ জাগ্রত করতেন। সবশেষে শিক্ষকদের প্রতি নিবেদন, নিজেদের অবস্থানের মহিমা অনুধাবন করুন, দায়িত্বের প্রতি যত্নবান হোন। আপনাদের হাতেই জাতির ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল। আপনারাই মানবতার নির্মাতা। চারদিক থেকে চোখ বন্ধ করে এই মহান মিশনে আত্মনিয়োগ করুন। কেবল সেই সব সেমিনার ও সম্মেলনে অংশ নিন, যেগুলোর সরাসরি সম্পর্ক আপনার পাঠ্যবিষয়ের সঙ্গে রয়েছে এবং যেগুলোর অংশগ্রহণ আপনার পাঠদানের মান উন্নত করে। আর শিক্ষার্থীদের প্রতি অনুরোধ, ধৈর্য হারাবেন না, হাল ছেড়ে দেবেন না, হৃদয়ভাঙা পরিস্থিতিতে হতাশ হবেন না, দীর্ঘ দুঃখের পথে ভয় পেও না, হে সাহসী হৃদয়, এমন কোনো রাত নেই যার ভোর নেই। জ্ঞান অন্বেষণের সাধনাকে আপন করে নিন, পরিশ্রম অব্যাহত রাখুন। আপনার আগ্রহই আপনার সবচেয়ে বড় প্রেরণা, আর আপনার একাগ্রতা, সাধনের স্বল্পতা সত্ত্বেও আপনাকে সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে পারে। তোমার অন্তর-সাগরে কেন জোয়ার ওঠে না? কেন জাগে না তোমার ভেতর মুসলমানি আত্মা? তকদির নিয়ে অভিযোগ করে কী লাভ, হে বান্দা? নিজেই বা কেন তুমি নিজের তকদির গড়ে তোলো না? ————– | ক্যাটাগরি : শিক্ষা, উপদেশ, আখলাক, সমালোচনা। ✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড। ✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ। 🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇 https://t.me/DrAkramNadwi/1522
শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *