“হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের প্রতি সচেতন হও, যিনি তোমাদেরকে একক নফস থেকে সৃষ্টি করেছেন, এবং তা থেকে তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, আর এ দু’জন থেকে বহু পুরুষ ও নারী ছড়িয়ে দিয়েছেন। আল্লাহকে ভয় কর—যাঁর নামে তোমরা একে অপরের কাছে চাও এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা কর। নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বদা তোমাদের ওপর তত্ত্বাবধায়ক।”
প্রত্যেক মানুষ আল্লাহর কাছে ব্যক্তিগতভাবে দায়বদ্ধ, এই জীবনে তাদের দায়িত্ব ও পরকালে তাদের প্রতিদান একক ও স্বতন্ত্র। প্রতিভা ও সুযোগের বৈচিত্র্য এই নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ যে আল্লাহ কাউকে তার সাধ্যের বাইরে বোঝা চাপিয়ে দেন না। তাই আল্লাহ ও বান্দার মাঝে কোনো মধ্যবর্তী কর্তৃপক্ষের প্রয়োজন নেই। ইবাদতের সব বিষয় এবং দুনিয়াবি বিরোধের সমাধান কেবল কুরআন ও সুন্নাহর দিকনির্দেশনার মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। এ নির্দেশনার অধিকার কোনো নির্দিষ্ট গোত্র (যেমন কুরাইশ অন্য আরব বা অনারবদের ওপর), কোনো বিশেষ লিঙ্গ বা সামাজিক মর্যাদার একচেটিয়া সম্পত্তি নয়; বরং এটি নির্ভর করে শুধু একজন মানুষের কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞান ও আনুগত্যের ওপর।
যৌন নির্যাতনের ঘটনা মোকাবিলা করতে হলে ন্যায়বিচার, জবাবদিহিতা এবং দুর্বলদের সুরক্ষার ভিত্তিতে স্বচ্ছ ও নীতিসম্পন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। এর দুটি মৌলিক ধাপ হলো—
১. অভিযোগ জানানো ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা:
যে কোনো অভিযোগ বা যৌন নির্যাতনের ঘটনা ঘটলে তা অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে। ভুক্তভোগীর জন্য ন্যায়বিচার চাওয়া কেবল নৈতিক দায়িত্বই নয়, বরং এটি আমাদের ঈমানেরও দাবি। এভাবে আমরা নির্যাতিতদের মর্যাদা রক্ষা করি এবং আমাদের দ্বীনের স্বচ্ছতা বজায় রাখি। কেউ কেউ বলতে পারেন যে এসব অপরাধ প্রকাশ করলে ইসলাম ও এর নেতৃত্বের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়; কিন্তু এটি ভীষণ ভ্রান্ত ধারণা। অপরাধ গোপন করা, অপরাধীদের রক্ষা করা এবং ভুক্তভোগীদের অবহেলা করা কোনো ধার্মিকতা নয়। বরং জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও ন্যায়বিচারই হলো আমাদের প্রকৃত মূল্যবোধের প্রতিফলন।
২. নিরাপদ ও সীমানাসম্পন্ন মেলামেশা নিশ্চিত করা:
অসদাচরণের সুযোগ কমাতে হলে নারী-পুরুষ (যারা মাহরাম নয়) পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সুস্পষ্ট ও নিরাপদ সীমানা বজায় রাখা অপরিহার্য। অভিভাবকদের উচিত নয় সন্তানদের পড়াশোনার জন্য অপরিচিতদের বাড়িতে পাঠানো, কিংবা শিক্ষকদের নিজেদের বাড়িতে ডাকা। বেশিরভাগ নির্যাতনের ঘটনা ঘটে এমন গোপন পরিবেশেই। মনে রাখা দরকার, আলেম, দাঈ বা শিক্ষকও শেষ পর্যন্ত অন্যদের মতোই মানুষ। তাই তাদের সঙ্গে সম্পর্কও সতর্কতার সঙ্গেই হওয়া উচিত। নারী ও পুরুষ উভয়ের উচিত শিক্ষকের বা আলেমের সঙ্গে সম্মানজনক কিন্তু প্রকাশ্য ও পেশাদারিত্বপূর্ণ পরিবেশে মেলামেশা করা। নিজের ও অন্যের সুরক্ষার জন্য যথাযথ সীমানা বজায় রাখা অবিশ্বাস নয়; বরং এটি সবার জন্য একটি নিরাপদ ও নৈতিক পরিবেশ গড়ে তোলার সচেতন পদক্ষেপ।
পূর্বে উল্লিখিত বিষয়ের দিকে ফিরে তাকালে দেখা যায়, আমাদের উচিত এমন সমাধান খোঁজা যা কাউকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। এ-ও মনে রাখতে হবে যে নারী-পুরুষ উভয়েই আল্লাহর বান্দা, আর কিয়ামতের দিনে উভয়েই সমানভাবে প্রতিদান লাভ করবে। এ বিষয়টি স্পষ্ট করে উল্লেখ করা হয়েছে কুরআনের একটি বহুল পরিচিত আয়াতে, যার অবতরণের প্রেক্ষাপট হাদিসে উল্লিখিত আছে—আব্দুর রহমান ইবনে শায়বাহ বর্ণনা করেন, তিনি উম্মু সালামা (রাদিয়াল্লাহু আনহা)—রাসুলুল্লাহর (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্ত্রী—এর মুখে শুনেছেন:
“আমি রাসুলুল্লাহকে (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) জিজ্ঞেস করলাম: ‘কেন কুরআনে আমাদের [নারীদের] নাম পুরুষদের মতো করে উল্লেখ করা হয়নি?’ তারপর সেদিন বিকেলে আমি তাঁকে মিম্বর থেকে ডাকতে শুনলাম। তখন আমি চুল আঁচড়াচ্ছিলাম, দ্রুত তা গুটিয়ে নিয়ে বাড়ির একটি কক্ষে গিয়ে মনোযোগ দিয়ে শোনার জন্য দাঁড়ালাম। তখন আমি তাঁকে মিম্বর থেকে বলতে শুনলাম:
‘হে মানুষ, আল্লাহ তাঁর কিতাবে বলেছেন: মুসলিম পুরুষ ও মুসলিম নারী, মুমিন পুরুষ ও মুমিন নারী, আনুগত্যশীল পুরুষ ও আনুগত্যশীল নারী, সত্যবাদী পুরুষ ও সত্যবাদী নারী, ধৈর্যশীল পুরুষ ও ধৈর্যশীল নারী, দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, রোজাদার পুরুষ ও রোজাদার নারী, যারা লজ্জাস্থান হেফাজত করে সেই পুরুষ ও সেই নারী, আর যারা আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে সেই পুরুষ ও সেই নারী—আল্লাহ তাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন।’”
——————–
ক্যাটাগরি : আখলাক, তালিম।
—
✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/6696