হলো—এই কাহিনি কি সত্য হলো, কারণ এতে নিদর্শন ও পরীক্ষা আছে? নাকি এটা আসলে কেবল এক বর্ণনা, যেখানে গবেষক তার সংস্কৃতির অভ্যাস অনুযায়ী বেছে নিয়েছে ও ব্যাখ্যা করেছে? সত্য তো সত্যই থাকে, প্রমাণ প্রমাণই থাকে। কিন্তু বর্ণনা সবসময় রচয়িতার সংস্কৃতি ও অভ্যাস দ্বারা গঠিত হয়।
পাশ্চাত্য ইতিহাসবিদেরা মুসলিমদের উত্থানকে এভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন: এটা ছিল জনসংখ্যার চাপ, গোত্রগুলোর নতুন ভূমি ও দ্রুত সম্পদের চাহিদা। হাদিস সম্পর্কেও তাঁরা এমনই করেছেন—সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তারপর কিছু মুসলিম এসে বললেন: হ্যাঁ, এটাই হলো সঠিক পদ্ধতি, এটাই হলো কঠোর বুদ্ধিবৃত্তি। অথচ তা ছাড়া আর কিছু নয়—প্রভাবশালী সংস্কৃতির প্রভাব, এমন এক পদ্ধতি, যা কেবল পাঠ্যকে নিজের কর্তৃত্বের অধীনে আনতে চায়।
আমরা স্পষ্টভাবে পার্থক্য করি—প্রাথমিক সমালোচনার (النقد التمهيديّ) মধ্যে, যা ইতিহাস নির্মাণের ভিত্তি হতে পারে, আর মানুষের জন্য রচিত বর্ণনার (السرد) মধ্যে। কোনো নির্দিষ্ট হাদিসে, নির্দিষ্ট কোনো বর্ণনাকারীতে, অথবা নির্দিষ্ট কোনো সনদপথে সন্দেহ প্রকাশ করা—এটাই আসল গবেষণার কাজ, এটাই প্রকৃত শিল্পকলা। কিন্তু প্রতিটি হাদিসকেই জাল ধরে নেওয়া, যতক্ষণ না তার সত্য প্রমাণিত হয়—এমন ধারণা আসলে কোরআনকেই সন্দেহ করা; কেননা কোরআনের সত্য নির্ভর করে যে রাসুল ﷺ তা পৌঁছে দিয়েছেন তাঁর সত্যনিষ্ঠতার ওপর, আর রাসুলের সত্যনিষ্ঠা নির্ভর করে তাঁর কথাবার্তায় ও ব্যাখ্যায় আমানতদারির ওপর।
ইমামগণ হাদিস অনুসন্ধান করেছেন আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনকারীর মতো, তাঁর নবির সুন্নাহ ভালোবেসে। তাঁরা লিপিবদ্ধ করেছেন সেই সব হাদিস, যা মানুষকে ইবাদতে, লেনদেনে, চরিত্রে ও আচার-আচরণে দিশা দেয়; ইতিহাসের কাহিনি সাজানোর জন্য নয়। হাদিসে যুদ্ধের ঘটনাবলী, অবতীর্ণ হওয়ার কারণ ইত্যাদি খুব অল্প; বাকিটা হলো ফিকহ, ধর্ম, আচার, নীতি ও আদব।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো—কিছু লোক শব্দভেদকে অজুহাত বানিয়ে হাদিসের সমালোচনা করে। অথচ সামান্য বুদ্ধি দিলেই বুঝতে পারত, শব্দভেদের মধ্যেই সত্যতার প্রমাণ রয়েছে, মিথ্যার নয়। কেননা মানুষ যখন একই ঘটনার সাক্ষী হয়, তারা আসল বক্তব্য মনে রাখে, কিন্তু শব্দে ভিন্নতা থাকে—যতক্ষণ না সবাই মিলে আগে থেকে ঠিক করে নেয়, অথবা শব্দটিই যদি নিজে থেকে উদ্দেশ্য হয়, যেমন কোনো আইনি দলিল বা শিক্ষকের নির্দিষ্ট বাক্য।
যা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই, তা হলো—হাদিসের উদ্দেশ্য ছিল না প্রতিটি ঘটনার সূক্ষ্মতম বিবরণ লিপিবদ্ধ করা, সব দিক আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রাখা। বরং উদ্দেশ্য ছিল মানুষের কাছে এমন দিকনির্দেশনা পৌঁছে দেওয়া, যা তারা আমল করতে পারে; এমন শরিয়তের বিধান দেওয়া, যার দিকে তারা ফিরে যেতে পারে; এমন এক জীবনদর্শন উপস্থাপন করা, যা তারা অনুসরণ করতে পারে। যেখানে প্রয়োজন ছিল শব্দগুলোতেই নির্ভর করার, সেখানে তা একই ছিল বা অন্তত ঘনিষ্ঠভাবে মিলত—যথেষ্ট প্রমাণ ও উদ্দেশ্য পূরণ করার জন্য। সুতরাং হাদিস থেকে নতুন কোনো যুক্তি তৈরি করে সামগ্রিক সন্দেহ ছড়ানোর অবকাশ নেই, আর হাদিসের কোনো নির্ভরযোগ্য উপায়ও নেই, যা প্রতিষ্ঠিত নিশ্চিত বিশ্বাসকে টলাতে পারে। বরং এটা হলো পাশ্চাত্যের চিন্তার এক নতুন ধারা, যা নিজের কর্তৃত্ব এমন সব ক্ষেত্রে বিস্তৃত করতে চাচ্ছে, যেখানে তার কোনো অধিকার ছিল না।
হাদিসের আংশিক সমালোচনা (النقد الجزئي) কোনো নতুন ব্যাপার নয়, যা এ যুগের পরবর্তী চিন্তাবিদেরা উদ্ভাবন করেছেন। বরং এটি হলো মুহাদ্দিসগণের নিজস্ব কাজ, তাঁদের বিদ্যালয়ের উত্তরাধিকার, দীর্ঘ সাধনার ফল। তাঁরা এ বিষয়ে সূক্ষ্ম মনোযোগ দিয়েছেন, সুসংহত পদ্ধতি প্রণয়ন করেছেন, বর্ণনাগুলোর মধ্যে তুলনা করেছেন, সনদ ও মতনের দিকে নজর দিয়েছেন—যাতে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেন, যা প্রমাণিতভাবে সত্য হওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে প্রবল।
এখানে আমি একটি দৃষ্টান্ত আনব—ইমাম বুখারি যা বর্ণনা করেছেন এবং ইমাম মুসলিম যা সংরক্ষণ করেছেন তার মধ্যে তুলনা করে। এর মাধ্যমে বোঝা যাবে এ সমালোচনার প্রকৃতি কী, এর সীমা কোথায়, এবং কিভাবে এটি সুন্নাহ সংরক্ষণে ও রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
——————–
ক্যাটাগরি : হাদিস,তারিখ, ইসলামি চিন্তা।
—-
✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ
—-
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/6875