AkramNadwi

সুতরাং “فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ”

সুতরাং “فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ” এই আয়াতের পুনরাবৃত্তিই সূরা আর-রহমানের সবচেয়ে উজ্জ্বল শৈল্পিক ও তরবিয়তমূলক বৈশিষ্ট্য। এটি কেবল শব্দসৌন্দর্যের জন্য নয়; বরং চেতনাকে জাগিয়ে তোলা এবং বিবেককে নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য। প্রতিটি নিয়ামতের বর্ণনার পর এই প্রশ্ন যেন শ্রোতাকে থামিয়ে চিন্তা করতে বাধ্য করে।

মানুষ যখন বারবার এই চ্যালেঞ্জ শোনে, তখন অস্বীকারের পথ তার জন্য সংকুচিত হতে থাকে এবং স্বীকারোক্তির দরজা উন্মুক্ত হতে থাকে। এভাবে সূরাটি এক জীবন্ত সংলাপে পরিণত হয়, যেখানে বান্দার নীরব থাকার সুযোগ নেই। তার অন্তরকে সাক্ষ্য দিতেই হয় যে, এই নিয়ামতগুলোর অস্বীকার সম্ভব নয়।

এই সূরা যে চিন্তাধারা নির্মাণ করে তা হলো, মানুষ যেন নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ও নির্ভরহীন মনে না করে; বরং সর্বক্ষণ রহমতের বেষ্টনীতে আবদ্ধ এক মুখাপেক্ষী বান্দা হিসেবে নিজেকে চিনতে শেখে। এই উপলব্ধি তার মধ্যে বিনয়, কৃতজ্ঞতা ও দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে। তখন সে নিয়ামতকে নিজের অধিকার নয়, বরং দান হিসেবে বুঝতে শেখে। আর দানপ্রাপ্ত ব্যক্তি অবশ্যই দাতার কাছে জবাবদিহি করবে। এভাবেই সূরার বার্তা মানুষকে অহংকার থেকে বের করে ইবাদতের পথে নিয়ে আসে।

এই প্রেক্ষাপটে শোকর ও অকৃতজ্ঞতার বিষয়টি মৌলিক গুরুত্ব পায়। শোকর শুধু “আলহামদুলিল্লাহ” বলার নাম নয়; এটি একটি সমন্বিত মানসিকতা, যেখানে হৃদয়, জিহ্বা ও কর্ম, তিনটিই অংশগ্রহণ করে। হৃদয়ে দৃঢ় বিশ্বাস থাকবে যে প্রতিটি নিয়ামত আল্লাহর পক্ষ থেকে; জিহ্বা তাঁর প্রশংসা ও স্বীকৃতি উচ্চারণ করবে; আর জীবনযাপন প্রমাণ দেবে যে নিয়ামতগুলো তাঁর সন্তুষ্টির পথেই ব্যবহৃত হচ্ছে।

এর বিপরীতে নিয়ামতের কুফর হলো মানুষ দানকে নিজের যোগ্যতা বা কেবল প্রাকৃতিক কারণের দিকে সম্পৃক্ত করে, দাতাকে ভুলে যায়, অথবা নিয়ামতকে অবাধ্যতার পথে ব্যবহার করে। অহংকার, উদাসীনতা এবং হিদায়াত থেকে বিমুখ হওয়া, এগুলো সবই অকৃতজ্ঞতার রূপ।

শিক্ষা ও তরবিয়তের ক্ষেত্রে সূরাটির তাদাব্বুর তখনই অধিক কার্যকর হয়, যখন প্রতিটি নিয়ামতের উল্লেখ ব্যক্তিগত আত্মসমালোচনার সঙ্গে যুক্ত হয়। পাঠক বা শ্রোতা নিজেকে প্রশ্ন করবে, সে কি সত্যিই এই দানগুলোর স্বীকৃতি দেয়? তার চিন্তা ও আচরণ কি শোকরের ভাষ্য বহন করে? নাকি অজান্তেই সে অস্বীকারকারীদের কাতারে দাঁড়িয়ে আছে?

যখন এ প্রশ্নগুলো অন্তরে নেমে আসে, তখন সূরাটি কেবল পাঠ্য নয়, এক জীবন্ত বার্তায় পরিণত হয়, যা মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দেয়।

এইভাবে সূরা আর-রহমান নিয়ামতের একটি তালিকা উপস্থাপন করে না; বরং এক সামগ্রিক অন্তর-বাহিরের বিপ্লবের আহ্বান জানায়। এটি মানুষকে নতুন চেতনায় বিশ্বকে দেখতে শেখায়, প্রতিটি কিছুর মধ্যে রবের রহমত চিনতে, তাঁর অনুগ্রহের স্বীকৃতি দিতে এবং সেই স্বীকৃতির ভিত্তিতে নিজের জীবনকে আনুগত্য, বিনয় ও কৃতজ্ঞতার ছাঁচে গড়ে তুলতে।

———-

ক্যাটাগরি : কোরআন, তাফসীর, উপদেশ, ইসলামি চিন্তাধারা, শিক্ষা।

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8388

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *