https://t.me/DrAkramNadwi/1920
بسم الله الرحمن الرحيم.
———–
‘বন্ধুত্ব’ শব্দটি সাধারণ হলেও, প্রকৃত বন্ধুত্ব মোটেও সাধারণ নয়। এই পবিত্র সম্পর্কের পবিত্রতা সব সময় লঙ্ঘিত হয়েছে, আর আজকাল যেভাবে এই সম্পর্ককে কলঙ্কিত করা হচ্ছে, সম্ভবত মানবজাতির দীর্ঘ ইতিহাসে এমনটি আর কখনও ঘটেনি। স্বার্থপরতা ও ভোগ-বিলাসের নোংরা সম্পর্কের জন্য ‘বন্ধুত্ব’ শব্দটি এত বেশি ব্যবহৃত হচ্ছে যে, সত্যিকারের বন্ধুত্বের অস্তিত্বই হারিয়ে গেছে।
স্বার্থনির্ভর বন্ধুত্বের পেছনে কোনো না কোনো লাভ পাওয়ার উদ্দেশ্য কাজ করে। যতক্ষণ সেই লাভ পাওয়া যায়, বন্ধুত্ব টিকে থাকে। কিন্তু যখন সেই লাভ পূর্ণ হয়ে যায় বা লাভ পাওয়ার আশা ফুরিয়ে যায়, তখন বন্ধুত্বও শেষ হয়ে যায়। এ ধরণের বন্ধুত্ব সেই সুতোর মতো, যেটা ছোঁয়া মাত্র কিছুক্ষণ পর ছিঁড়ে যায়। এটা সেই বন্ধুত্বেরই স্বাভাবিক পরিণতি। আর প্রকৃতির এই নিয়ম কতই না বেদনাদায়ক! স্বার্থান্বেষী বন্ধুরা ঠিক সেই পথিকদের মতো, যারা কিছুটা পথ একসাথে চলে কিন্তু কোনো এক মোড়ে বা স্টেশনে এসে আলাদা হয়ে যায়। তারা কখনও গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছানোর অঙ্গীকার করে না, আর যদি করেও, তা রক্ষা করতে পারে না।
ইকবালের অভিযোগ ছিল, তিনি সমুদ্র থেকে শিশির পেলেন—আর এখানে যেসব বন্ধুদের কথা বলা হচ্ছে, তাদের কাছে দেওয়ার মতো সেই শিশিরও নেই। যদি এই স্বার্থপরদের প্রকৃতি জানতে চাও, তাহলে দেখো—দুনিয়ার রঙকে প্রয়োজনের পোশাক পরিয়ে দাও!
ভোগ-বিলাসনির্ভর বন্ধুত্বের পেছনে যৌনাচারমূলক আবেগ কাজ করে। এই বন্ধুত্বের তাপ যখন তীব্র হয়, তখন তাকে প্রেম বলা হয়। এটা নিছক কামনানির্ভর বন্ধুত্ব, যার তীব্রতা মানুষের চিন্তাশক্তিকে পরাজিত করে ফেলে। যখন কামনা নিস্তেজ হয়ে যায় বা ভালোবাসার মানুষ বদলে যায়, তখন এই সম্পর্কের সূর্য অস্তমিত হতে থাকে বা একেবারে ডুবে যায়। তারপর শুধুই অন্ধকার—একটি বিভীষিকাময় রজনীর পরিবেশ। এতে যে ঝংকার শোনা যায়, তা এক হৃদয়বিদারক আর্তনাদে গিয়ে শেষ হয়। যেন এই সম্পর্ক গড়েই ওঠে ধ্বংস আর বিপর্যয়ের জন্য—আহাজারি, কষ্ট, আর্তনাদ—কিন্তু শোনার মতো কেউ নেই। সুন্দর এক সূচনার মর্মন্তুদ পরিণতি!
সত্যিকারের বন্ধুত্ব হলো উৎকর্ষপ্রেম (كمال پسندى) — অর্থাৎ কাউকে তার জ্ঞান, তাকওয়া, চরিত্র বা অন্য কোনো আধ্যাত্মিক গুণ ও অন্তর্নিহিত সৌন্দর্যের কারণে ভালোবাসা। এটাই প্রকৃত বন্ধুত্ব। এই বন্ধুত্ব যতটা স্বার্থ থেকে মুক্ত হয়, ততটাই পরিপূর্ণ ও বিশুদ্ধ হয়। আগের দুই ধরণের বন্ধুত্ব ছিল প্রকৃতিগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং নীচতার পরিচায়ক। কিন্তু এই তৃতীয় প্রকার বন্ধুত্বই হলো সত্যিকারের বন্ধুত্ব, যা উচ্চমানের মানবিক গুণাবলির অন্তর্ভুক্ত। এই বন্ধুত্ব থেকেই জন্ম নেয় আরও অনেক মহৎ গুণ।
যখন বন্ধুত্ব নিঃস্বার্থতার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে, তখন বন্ধু বন্ধুর সঙ্গে বিনয় ও নম্রতা প্রদর্শন করে, অহংকার ও ঔদাসীন্য থেকে দূরে থাকে। সে বন্ধুর জন্য নিজের জীবন ঝুঁকিতে ফেলে, কাপুরুষতা পরিহার করে, নিজের সম্পদ উৎসর্গ করে, উদারতা অবলম্বন করে এবং কৃপণতা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখে। সে রাগ দমন করে, সহনশীলতা ধারণ করে, কষ্টে ধৈর্য ধরে এবং অভিযোগ ও হতাশা থেকে নিজেকে দূরে রাখে।
এই বন্ধুত্বে কোনো ভান থাকে না, না কোনো কৃত্রিমতা বা আনুষ্ঠানিকতা। না কোনো বাহ্যিক রীতিনীতির বন্ধন, না স্বার্থের হুমকি, না প্রভাব বিস্তার বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রদর্শনের বাসনা, না কোনো মানসিক চাপ, না লজ্জা বা ভয়, না অপমান বা বিদ্রূপ, না তিরস্কার বা ঠাট্টা। সত্যিকারের বন্ধুরা হালকা-ফুলকা মজা করে, তাদের লক্ষ্য কাউকে আঘাত করা নয়, বরং কৃত্রিমতার পর্দা সরানো।
তারা একে অপরের গুণাবলি স্বীকার করে, ভুলত্রুটি আড়াল করে, একে অপরের ওপর বিশ্বাস রাখে, ভুল বোঝাবুঝিতে পড়ে না, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে না এবং না প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের অভিযোগ করে। না তারা ক্ষমা চাইতে লজ্জা পায়, না ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন পড়ে। তারা একে অপরের সফলতায় অভিনন্দন জানায়, বন্ধুর আনন্দে আনন্দিত হয়, বিপদে সাহস জোগায়, নিজে কষ্ট করে বন্ধুকে শান্তি দেয়, এবং দুঃখ-কষ্টে একে অপরের সঙ্গী হয়। এই সঙ্গ এতটা শক্তিশালী হয় যে, কষ্ট লাঘব হয়ে যায়—বরং একে অপরের সান্নিধ্যে তারা এমন তৃপ্তি অনুভব করে যে, সেই কষ্টও যেন এক ধরনের নেয়ামত মনে হয়, যেহেতু এই কষ্টই তাকে বন্ধুর ভালোবাসার স্পর্শ এনে দিয়েছে।
এই বন্ধুত্বে শান্তি ও প্রশান্তি থাকে। যখন তারা একে অপরের সঙ্গে কথা বলে, তাদের কথা কতই না মধুর ও সুরেলা হয়—মনে হয় যেন কেউ বাঁশি বাজাচ্ছে, আর মন চায় শুধু সেই সুর শোনা হোক, শুনতেই থাকা হোক। এমনকি তাদের নীরবতাও যেন এক ধরনের কথা—মনে হয় হৃদয় হৃদয়ের সঙ্গে কথা বলছে। তারা মনের কথা ব্যক্ত করে, যদিও কখনও সঠিক শব্দ মেলে না উদ্দেশ্য প্রকাশের জন্য। কিন্তু, কে আছে যে এই নীরব ভাষার সেই মিষ্টি শব্দ শুনতে চায় না?
এই বন্ধু যখন একসাথে চা পান করেন, তখন মনে হয় যেন তারা ভালোবাসার রস ও প্রেমের মদ পান করছেন। এই চায়ের কাপেও তারা আঙ্গুর কন্যার (মধুর পানীয়ের) স্বাদ অনুভব করেন। তারা ভালবাসার নেশায় বুঁদ হয়ে যান। চারদিকে শুধু রঙের খেলা, সুবাস, সুর, হাসি, উল্লাস ও আনন্দ ছড়িয়ে পড়ে।
এই বন্ধুত্ব মানুষকে নিচুতা থেকে উন্নতির দিকে নিয়ে যায়, সাহস ও সংকল্প জোগায়। যখন কোনো একটি আলো নিভে যায়, তখন আরেকটি আলো জ্বলে ওঠে। এখানে আশাগুলো ভেঙে গিয়েও নতুন করে গাঁথা হয়।
এমন বন্ধুদের মাধ্যমে জীবনে বাঁচার সাহস আসে। তারা চোখের সামনে না থাকলেও একে অপরকে দেখে ফেলে, সুরেলা গান কিংবা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ শুনতে না পেলেও, কোনো বার্তাবাহকের খবর পৌঁছায় না—তবুও তারা জানে, একে অপরের জীবনে কী ঘটছে।
তাদের সান্নিধ্য সময় ও স্থানের দূরত্বে কমে না, বরং মৃত্যুও এই বন্ধনের স্থায়িত্বে বিঘ্ন ঘটাতে পারে না:
گو وقت كے ايواں ميں گل ہوگئيں قنديليں
يادوں كے شبستاں ميں برہم نه ہوئى محفل
“যদিও সময়ের প্রাসাদে বাতিগুলো নিভে গেছে,
তবুও স্মৃতির কক্ষগুলোতে সেই আড্ডা আজও ভাঙেনি।”
জীবনের আসল আনন্দ এই ধরণের বন্ধুদের সঙ্গেই পাওয়া যায়। তারা থাকলে জীবন মনোমুগ্ধকর হয়, না থাকলে জীবন নিরস ও রসহীন মনে হয়।
তাদের বন্ধুত্ব হৃদয়ের ভাবনা ও অনুভূতির দৈনিক ডায়েরি, আর জীবনের রহস্যময়তার এক চিরস্থায়ী গ্রন্থ।
——————–
✍ মূল : ড. আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড, ইউকে।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা : মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।