بسم الله الرحمن الرحيم.
ইসলামের ইতিহাসে তাবলিগ জামাত এক উজ্জ্বল ও কার্যকর অধ্যায়, যা আমাদের সামনে খালিছ নিয়ত, সরলতা ও আল্লাহর সাথে গভীর সম্পর্কের এক অপূর্ব সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এই জামাত কোনো মতপার্থক্যের কেন্দ্র নয়, কোনো রাজনৈতিক আন্দোলন নয়, বরং এটি একটি নীরব, নিঃস্বার্থ ও অপ্রচারিত দাওয়াতি আন্দোলন, যার একমাত্র উদ্দেশ্য—সাধারণ মুসলমানদের হৃদয়ে ঈমানের উষ্ণতা ও দীনের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলা।
এই জামাত সেই সব মানুষের কাছে দ্বীনের বার্তা পৌঁছে দিয়েছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে গাফিলতি, আমলহীনতা ও দুনিয়াদারির গভীর স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল। উপমহাদেশের সেই ভূমি, যা একসময় জ্ঞানের সুবাসে ভরে থাকত, যখন আধ্যাত্মিক শুষ্কতায় আক্রান্ত হলো—তখন এই জামাত সেই পাড়ায়, গলিতে, বস্তিতে ফিরে গেল, যেখানে মসজিদ ছিল শুন্য, কাতার ছিল ফাঁকা, আর মানুষের হৃদয় ছিল আল্লাহর জিকির থেকে বঞ্চিত।
তাবলিগ জামাতের দাওয়াতের মূল রূহ এই—দ্বীনকে কেবল তর্ক বা চিন্তাচর্চার মাধ্যমে নয়, বরং আচরণ, চরিত্র ও খালিছ নিয়তের মাধ্যমে জীবন্ত করে তোলা। এরা বেশি কথা বলে না, বরং চালচলনে কথা বলে। এমন সেজদা করে যা মসজিদের মেঝেতে চিহ্ন রেখে যায়, এমন আচরণ করে যা মানুষের মনে আল্লাহভীতির বাতাস ছড়িয়ে দেয়, এমন জীবনধারা অবলম্বন করে যা দুনিয়ার চাকচিক্যের ঊর্ধ্বে। এটাই এই দাওয়াতের আসল সৌন্দর্য।
যদি কেউ তাবলিগ জামাতের কোনো কথা বা পদ্ধতির সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করেন, তাহলেও তা যেন ন্যায়বোধ ও ইনসাফের সীমা অতিক্রম না করে। মতের অমিল মানে অবজ্ঞা বা অপমান নয়, বরং গভীর উপলব্ধি ও উদারতার সঙ্গে আলোচনার সুযোগ।
মাওলানা ইলিয়াস কাঁন্ধলভী (রহ.)-এর শুরু করা এই আন্দোলন কোনো দলীয় কৌশল বা সাময়িক প্রতিক্রিয়া নয়। বরং এটি ছিল আধ্যাত্মিক অনুপ্রেরণার ফল, এমন এক ব্যথা, যা তিনি উম্মতের অবস্থা দেখে হৃদয়ে অনুভব করেছিলেন। তিনি এমনভাবে দ্বীনের দাওয়াত শুরু করেন, যাতে না ছিল কোনো বাহিনীর জাঁকজমক, না ছিল কোনো প্রচারণার রমরমা অবস্থা । তাঁর এই দাওয়াতের প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে, দীর্ঘদিনের গাফেলতিও যেন মুহূর্তেই ছিন্ন হয়ে যায়।
তিনি আমাদের শেখালেন—যখন আমলের আলো, জিকিরের সুবাস আর সরলতার শক্তি একত্র হয়, তখন সবচেয়ে ঘন অন্ধকারও কেটে যায়।
আমার নিজের জীবনে এই দাওয়াত একটি আধ্যাত্মিক বিপ্লবের মতো ছিল। নদওয়াতুল উলামা-তে ছাত্রজীবন থেকে শুরু করে অক্সফোর্ডের মতো উচ্চতর জ্ঞানচর্চার প্রতিষ্ঠানে পা রাখার দীর্ঘ যাত্রায় আমি জ্ঞানের নানা দিক দেখেছি। কিন্তু যখনই আমি তাবলিগের কাফেলার অংশ হতাম, তখনই মনে হতো—হৃদয়ের জানালা যেন নতুন কোনো দিগন্তে খুলে যাচ্ছে। যুক্তির মাঝে ছিল জ্ঞান, কিন্তু স্মরণের মাঝে ছিল প্রশান্তি।
অক্সফোর্ডের রাজকীয় ভবন, চিন্তামূলক বৈঠক, বিদ্বানদের আলোচনা—সবই ছিল একদিকে, আর কোনো গ্রামের সাধারণ এক মুসল্লির পাশে বসে মসজিদে আল্লাহর জিকির করার যে মিষ্টতা অনুভব করতাম, তা পৃথিবীর কোনো বিদ্যাপীঠে পাইনি।
তাবলিগের ভাইয়েরা আমার কাছে ছিল ফেরেশতার মতো। না তারা দুনিয়ার পিছে ছুটত, না তারা খ্যাতির লালসা রাখত। তাদের হৃদয় ছিল আল্লাহর স্মরণে পরিপূর্ণ, মুখে ছিল বিনয়, আর মুখাবয়বে ছিল নিয়তের দীপ্তি।
তাদের সঙ্গে একত্রে ভ্রমণ করেছি—কখনো পুরোনো বাসে, কখনো ট্রেনের কামরায়, কখনো পায়ে হেঁটে গলিপথে। আমরা মানুষকে নম্রভাবে দাওয়াত দিতাম, ঈমান, নামাজ, পবিত্রতা ও আখলাকের মূল শিক্ষা দিতাম। আমাদের ভয় ছিল না—কে কী বলবে, কী ফল হবে। আমাদের আসল সাফল্য ছিল এটুকু—যদি কোনো একটি হৃদয়েও আল্লাহর স্মরণের আলো জ্বলে ওঠে।
আজও সেই মুহূর্তগুলো আমার আত্মায় গেঁথে আছে—যখন মসজিদের নিস্তব্ধতায়, ফজরের পর থেকে সূর্য ওঠা পর্যন্ত জিকির আর দোয়ার যে পরিপূর্ণতা ছিল, তাতে মনে হতো—আমার অন্তরে এক নতুন জগৎ গড়ে উঠছে। এই নির্জনতার মুহূর্তগুলোয় যে ব্যথা, যে আন্তরিকতা সৃষ্টি হতো, তা হাজারটা বইপত্রও সৃষ্টি করতে পারে না।
আমি নিজের চোখে দেখেছি—পাপাচারে ডুবে থাকা মানুষ কীভাবে তওবার পর আলোর পথে ফিরে আসে, আর সেই পরিবর্তন তার চেহারায়, কথাবার্তায় স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই সফর থেকে ফিরে আমি নিজেকে সেই অবস্থানে পাই—যেখানে শুধু কুরআনের সূরা, নামাজের দোয়া, ওজুর নিয়ম আর সুন্নাতের শিক্ষা নয়, বরং সাধারণ মানুষের হৃদয়ে এই সত্যের প্রতি ভালোবাসাও গেঁথে দিতে পারি।
এই দাওয়াত আমাকে শিখিয়েছে—দ্বীন মানে কেবল যুক্তির বিশ্লেষণ বা ফিকহি জটিলতা নয়, বরং এমন আচরণ যা হৃদয়কে কোমল করে, চোখে অশ্রু আনে, আর আত্মাকে উড়ান দেয়।
তাবলিগ জামাতের পদ্ধতি সবসময় উম্মতকে একসূত্রে বাঁধার কাজ করে এসেছে। তারা আলেমদের সম্মান করে, দ্বীনের মতপার্থক্যকে কখনো ঘৃণার ভিত্তি বানায় না। তাদের কাছে আসল মাপকাঠি হলো—নিয়ত ও খালিছ ইখলাস, আর এ মাপকাঠির চূড়ান্ত বিচার একমাত্র আল্লাহর কাছেই।