তারা জিজ্ঞেস করল—আল্লাহ তায়ালার এ বাণীর অর্থ কী:
তুমি মানুষকে তোমার রবের পথে আহবান কর হিকমাত ও সদুপদেশ দ্বারা এবং তাদের সাথে আলোচনা কর সুন্দরভাবে।
(সূরা নাহল, আয়াত ১২৫)
আমি বললাম—তোমরা সৌভাগ্যবান, কারণ তোমাদের মনে এই আয়াতের অর্থ অনুধাবনের তাগিদ জেগেছে। কেননা মানুষ সাধারণত এই আয়াতের অর্থ বুঝতে ভুল করে এবং প্রয়োগেও ভ্রান্ত হয়।
জেনে রাখো—আমাদের প্রভুর পথে আহ্বান করার বিষয়টি মূলত দুইটি গুণের মাধ্যমে সম্পূর্ণ হয়।
প্রথমটি হলো হিকমত (প্রজ্ঞা)—যা সম্পূর্ণভাবে প্রশংসনীয় ও গ্রহণযোগ্য, তাই এখানে কোনো শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়নি।
দ্বিতীয়টি হলো মাও‘ইযাহ (উপদেশ)—যাকে আল্লাহ তায়ালা ‘হাসানাহ’ অর্থাৎ ‘সুন্দর’ বলে বর্ণনা করেছেন। কেননা উপদেশেরও এমন রূপ আছে যা সুন্দর নয়, তাই তা থেকে বিরত থাকতে হয়।
আর বিতর্ক বা তর্ক (জিদাল)—তা পরিহার করাই উত্তম। তবে যদি তা একান্ত অনিবার্য হয়, তখনই কেবল ‘যা সবচেয়ে সুন্দর উপায়ে’ করা যায়।
তারা জিজ্ঞেস করল—আপনি কীভাবে বললেন যে, বিতর্ক পরিহার করা উচিত?
আমি বললাম—দেখো, আল্লাহ তায়ালা একই ধারায় দুটি বিষয় উল্লেখ করেছেন—হিকমত ও উত্তম উপদেশ। এ দুটোই তাঁর পথে আহ্বানের মাধ্যম। কিন্তু তর্ক সেই আহ্বানের পথ নয়, বরং তার আলাদা এক ভূমিকা আছে। তাই যখন আল্লাহ তায়ালা তর্কের কথা তুললেন, তখন তিনি পূর্বের দুটি পদ্ধতি থেকে এর ভিন্নতা স্পষ্ট করে দিলেন।
তারা বলল—হিকমতের অর্থ ব্যাখ্যা করুন।
আমি বললাম—‘হিকমত’ হলো এমন সব বিষয় যা দৃঢ় ও সুসংহত। এই প্রসঙ্গে এর অর্থ—মানুষের প্রকৃতি (ফিতরাহ) অনুযায়ী গঠিত, এবং সুস্থ বুদ্ধি দ্বারা সমর্থিত সকল বিষয়। অর্থাৎ, যখন কোনো কাজের ভিত্তি হয় প্রাকৃতিক সত্য এবং তা যুক্তি দ্বারা সমর্থন পায়, তখন তা হয় পরিপূর্ণ ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন কাজ।
বিশ্বাসীরা যেন মানুষকে আল্লাহর পথে আহ্বান করে তাদের সেই প্রকৃত ও যুক্তিসঙ্গত বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত করিয়ে—যেমন আল্লাহর নিয়ামত, তাঁর মহিমা, নিদর্শন ও গুণাবলির স্মরণ করানো। কারণ এসব বিষয় মানুষের প্রকৃতিতে নিহিত ও বুদ্ধিতে সমর্থিত।
যেমন—প্রভুর প্রতি কৃতজ্ঞতা, তাঁর ইবাদত, আনুগত্য, কুফর ও শিরকের প্রতি ঘৃণা, মানুষের প্রতি সদাচরণ, পিতা-মাতার প্রতি অনুগ্রহ—এসবই ফিতরাত ও বুদ্ধি দ্বারা স্বীকৃত বিষয়। এজন্যই কুরআনের শুরুতেই এসেছে—
“সব প্রশংসা আল্লাহর, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক।”
কারণ ‘হামদ’ (প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা) হলো মানব প্রকৃতির প্রথম ও মূল অনুভূতি।
আজকের অনেক দাঈ (প্রচারক) দাওয়াতের ক্ষতি করছেন, কারণ তারা হিকমতের প্রকৃত অর্থ বোঝেন না। তারা দাওয়াতে জোর দেন আল্লাহর অস্তিত্ব প্রমাণ ও তাঁর রবুবিয়্যতের যুক্তিতর্কে। অথচ এতে তারা বড় ভুলে পড়েন।
আল্লাহ তায়ালা মানুষের প্রকৃতির গভীরে তাঁর প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা স্থাপন করেছেন, এবং সুস্থ বুদ্ধি এটিকে সমর্থন করে। অথচ তারা যে যুক্তিগত প্রমাণ হাজির করেন, তা সহজেই খণ্ডনযোগ্য। তাছাড়া এসব প্রমাণের কোনো বাস্তব উপকারও নেই, কারণ এগুলো নবী-রাসূলদের দাওয়াতের অংশ নয়।
শয়তানও তো আল্লাহর রবুবিয়্যত স্বীকার করে, অথচ সে সবচেয়ে বড় কাফির। এখান থেকেই মুতাকাল্লিম ও সুফিদের একাংশ তাওহিদের ব্যাখ্যায় ভুল করেছেন।
প্রকৃতির সত্য ও যুক্তিভিত্তিক বিষয়গুলোর ওপর নির্ভর করাই সবচেয়ে শক্ত প্রমাণ, দৃঢ় যুক্তি এবং সবচেয়ে প্রভাবশালী পদ্ধতি। যে মানুষ হিকমতের পথ অবলম্বন করে, তার কথা মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে।
তারা বলল—একটি উদাহরণ দিন।
আমি বললাম—একজন পিপাসিত মানুষ এক বৃদ্ধার পাশে দিয়ে যাচ্ছিলেন, যিনি কূপের পাশে বসে ছিলেন। সে বলল, “মা! আমি খুব পিপাসিত, যদি অনুমতি দেন একটু পানি খাই।” বৃদ্ধা তাঁর ভদ্রতায় খুশি হলেন; তাঁকে মিষ্টি খেতে দিলেন এবং ঠান্ডা পানি পান করালেন।
এরপর আরেকজন এল। সে বলল, “এই শোনো, আমার বাপের বউ, একটু পানি দাও!” তখন বৃদ্ধা লাঠি তুলে তাঁকে আঘাত করলেন।
এখানে দেখা যায়—বড়দের প্রতি সম্মান ও উপযুক্ত সম্বোধনে কথা বলা ফিতরাতজাত সত্য, যা বুদ্ধিও অনুমোদন করে। তেমনি শালীন আচরণ ও ভদ্র অনুরোধে মুগ্ধ হওয়াও প্রকৃতি ও যুক্তি উভয়ের সমর্থিত।
তারা বলল—এখন বলুন, মাও‘ইযাহ (উপদেশ)-এর অর্থ কী?
আমি বললাম—‘মাও‘ইযাহ’ হলো মানুষকে আল্লাহর দিনসমূহের কথা স্মরণ করানো—অর্থাৎ অতীত জাতিগুলোর কাহিনি, যাদের আল্লাহ কখনো পুরস্কৃত করেছেন, কখনো শাস্তি দিয়েছেন। তেমনি মানুষকে মৃত্যু, আখেরাত, কিয়ামতের হিসাব, জান্নাত ও জাহান্নামের কথা স্মরণ করানোও এর অন্তর্ভুক্ত।
তবে যখন উপদেশ এতটা ভীতিকর হয়ে ওঠে যে মানুষ নিরাশা ও হতাশায় ডুবে যায়, তখন তা হয়ে পড়ে ‘অসুন্দর উপদেশ’, যা পরিহারযোগ্য।
আল্লাহর কিতাবে বহুবার এ ধরনের স্মরণ করানো এসেছে—আল্লাহর দিনসমূহ, মৃত্যু, পুনরুত্থান, জমায়েত, বিচার, জান্নাত ও জাহান্নামের স্মৃতি—সবই মানুষের হৃদয়কে জাগ্রত করার উপদেশ।
তারা বলল—তাহলে “যা সবচেয়ে সুন্দর তর্ক” তার অর্থ কী?
আমি বললাম—প্রথমেই বুঝে রাখো, আমি যেমন বলেছি, তর্ক বা বিতর্ক দাওয়াতের কোনো মূলপথ নয়। তবে যদি দাওয়াতপ্রাপ্ত ব্যক্তি বা দল তর্কে জড়িয়ে পড়ে, তখন দাঈর দায়িত্ব হলো বুঝে নেওয়া যে, তারা আসলে তাকে তার দাওয়াত থেকে সরিয়ে দিতে বা ব্যস্ত রাখতে চায়।
তখন দাঈর উচিত তার বুদ্ধি খাটানো—কখনো সে তর্ক উপেক্ষা করবে, কখনো আবার তাদের দুর্বল যুক্তি স্পষ্টভাবে খণ্ডন করে মূল দাওয়াতে ফিরে যাবে।
তর্ক উপেক্ষার এক উদাহরণ কুরআনে দেখা যায়—
ফেরাউন বলল, “বিশ্বজগতের প্রভু কে?”
মূসা বললেন, “আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবী এবং তাদের মধ্যবর্তী সব কিছুর প্রতিপালক—যদি তোমরা নিশ্চিত বিশ্বাস রাখো।”
ফেরাউন তার চারপাশের লোকদের বলল, “তোমরা শুনছো না?”
মূসা বললেন, “তোমাদের প্রভু এবং তোমাদের পূর্বপুরুষদের প্রভুও তিনিই।”
ফেরাউন বলল, “তোমাদের প্রেরিত রাসূল নিশ্চয়ই পাগল।”
মূসা বললেন, “পূর্ব ও পশ্চিম এবং যা তাদের মধ্যে আছে তার প্রভু—যদি তোমরা বুদ্ধি ব্যবহার করো।”
(সূরা আশ-শু‘আরা: ২৩–২৮)
আর তর্কের দুর্বলতা প্রকাশের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো ইব্রাহিম (আ.)-এর ঘটনা—
“তুমি কি দেখনি সেই ব্যক্তিকে, যে তার প্রভু সম্পর্কে ইব্রাহিমের সঙ্গে তর্ক করেছিল, কারণ আল্লাহ তাকে রাজত্ব দিয়েছিলেন? ইব্রাহিম বললেন, ‘আমার প্রভু তিনিই, যিনি জীবন দেন ও মৃত্যু ঘটান।’ সে বলল, ‘আমিও জীবন দিই ও মৃত্যু ঘটাই।’ তখন ইব্রাহিম বললেন, ‘আল্লাহ সূর্যকে পূর্ব দিক থেকে উদয় করেন, তুমি তা পশ্চিম দিক থেকে উদয় করো।’ তখন কাফের ব্যক্তি হতবাক হয়ে গেল। আর আল্লাহ জালেম সম্প্রদায়কে পথ দেখান না।”
(সূরা আল-বাকারা: ২৫৮)
তারা বলল—তর্কের উপকারিতা কী?
আমি বললাম—এর উপকার হলো, কিছু মানুষ থাকে যারা দুনিয়ার সামান্য প্রাপ্তিতে বিভ্রান্ত হয়ে নিজের যুক্তিকে অপরাজেয় মনে করে। তখন একজন প্রাজ্ঞ ও বুদ্ধিমান মানুষ তার যুক্তির দুর্বলতা প্রকাশ করলে, সে নিজের ভেতরে ভেঙে পড়ে, নির্বাক হয়ে যায়, তার মর্যাদা নিজের সমাজে কমে যায়, এবং শেষ পর্যন্ত সে দাঈর প্রতিরোধে অক্ষম হয়ে পড়ে।
——————–
ক্যাটাগরি : তাফসির, উপদেশ, ইসলামি চিন্তাধারা।
— মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
— অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক:
https://t.me/DrAkramNadwi/7390