০২/মার্চ/২০২৬
بسم الله الرحمن الرحيم
❖ প্রশ্ন:
সূরা বাকারা ২৭৫ নম্বর আয়াত উদ্ধৃত করার পর সিস্টার সাদাফ মুফতি প্রশ্ন করেন:
আমি ভাবছিলাম, সূরা বাকারা-তে যে বলা হয়েছে, যারা সুদ খায়, তারা যেন সেই ব্যক্তির মতো যে শয়তানের স্পর্শে বিকারগ্রস্ত—এটি কি মানুষের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ধারণার প্রতিফলন, নাকি আল্লাহ সত্যিই বলছেন যে শয়তানের স্পর্শ মানুষের মনকে প্রভাবিত করে তাকে উন্মাদ করতে পারে? কেউ কেউ এটিকে জিনে ধরা বা শয়তানি আসরের প্রমাণ হিসেবে ব্যবহার করেন।
❖ উত্তর:
সূরা আল-বাকারা ২৭৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন:
“যারা সুদ ভক্ষণ করে, তারা কিয়ামতের দিন এমনভাবে দাঁড়াবে, যেমন দাঁড়ায় সেই ব্যক্তি, যাকে শয়তান স্পর্শ করে বিকারগ্রস্ত করে দিয়েছে।” (কুরআন ২:২৭৫)
এই আয়াতটি এমন এক শক্তিশালী প্রেক্ষাপটে এসেছে, যেখানে রিবা (সুদ) ও সদকা (দান) কে নৈতিকতা ও পরিণতির দিক থেকে সম্পূর্ণ বিপরীত দুই বাস্তবতা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। “الذين يأكلون الربا” “যারা সুদ ভক্ষণ করে” এই অভিব্যক্তি স্পষ্ট করে যে সুদ দানের সম্পূর্ণ বিপরীত চরিত্রের। সূরার আগের অংশে দানকে আত্মাকে দৃঢ় ও স্থিতিশীল করার উপায় হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে (২:২৬৫), আর সুদকে ঘোষণা করা হয়েছে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে যুদ্ধের কারণ হিসেবে। অতঃপর আল্লাহ সুস্পষ্টভাবে বলেন: “আল্লাহ সুদকে নিশ্চিহ্ন করেন এবং দানকে বৃদ্ধি করেন।” (২:২৭৬)
রিবার মৌলিক অর্থ হলো ঋণের উপর অতিরিক্ত লাভ গ্রহণ করা। আধুনিক ব্যাংক সুদও এর অন্তর্ভুক্ত, যে নামই দেওয়া হোক না কেন। কারণ শরিয়তের দৃষ্টিতে বিবেচ্য বিষয় হলো বাস্তব অর্থ ও প্রকৃতি, নাম বা পরিভাষা নয়।
আয়াতে বলা হয়েছে:
“لا يقومون إلا كما يقوم الذي يتخبطه الشيطان من المس”
“তারা সেই লোকের মত দাঁড়াবে যাকে শয়ত্বান স্পর্শ দ্বারা বেহুশ করে দেয়,”
এখানে “يتخبطه” শব্দটি বিশৃঙ্খল ও ভারসাম্যহীনভাবে আঘাত করা বা নড়াচড়া করার অর্থ প্রকাশ করে, যেন এমন একজন ব্যক্তি, যার দৃষ্টিশক্তি সঠিকভাবে কাজ করছে না, ফলে সে এলোমেলোভাবে চলাফেরা করছে। এখানে কিয়ামতের দিন তাদের অবস্থার বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, যারা অবৈধভাবে সম্পদ গ্রাস করেছে, তারা উঠবে ভীত, বিভ্রান্ত ও অন্তর্গত অস্থিরতার অবস্থায়।
এখানে স্পষ্টভাবে বলা জরুরি যে, এই বর্ণনা শয়তানি ভর বা দেহে প্রবেশের ধারণাকে প্রতিষ্ঠা করে না। শয়তান মানুষের দেহে প্রবেশ করে না, বাস করে না, নিয়ন্ত্রণও করে না। মানুষের মন বা ইচ্ছাশক্তির উপর তার কোনো কর্তৃত্ব নেই। কুরআনেই শয়তানের স্বীকারোক্তি উদ্ধৃত হয়েছে:
“আমার তোমাদের উপর কোনো কর্তৃত্ব ছিল না; আমি শুধু তোমাদের আহ্বান করেছি, আর তোমরা সাড়া দিয়েছ। অতএব তোমরা আমাকে দোষ দিও না, বরং নিজেদের দোষারোপ কর।” (কুরআন ১৪:২২)
তার প্রভাব কেবল ওয়াসওয়াসা, কুমন্ত্রণা, প্রলোভন ও ইঙ্গিত পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। সে আহ্বান জানায়, বাধ্য করে না। সে কুমন্ত্রণা দেয়, অধিকার করে না। মানুষ নিজের সিদ্ধান্তের জন্য নিজেই নৈতিকভাবে দায়ী।
এখানে শয়তানের প্রতি “বিকারগ্রস্ত করা”-র যে সম্বন্ধ আরোপ করা হয়েছে, তা হযরত আইয়্যুব (আ.) এর উক্তির মতো:
“নিশ্চয় শয়তান আমাকে কষ্ট ও যন্ত্রণায় স্পর্শ করেছে।” (কুরআন ৩৮:৪১)
এতে শয়তানের আধ্যাত্মিক আধিপত্য বোঝানো হয়নি; বরং সে ছিল কষ্টের একটি নিকটবর্তী কারণ। চূড়ান্ত কারণ একমাত্র আল্লাহ। কুরআনের ভাষা অনেক সময় গৌণ কারণের দিকে কর্ম আরোপ করে, তবে সমস্ত ক্ষমতা ও সিদ্ধান্ত যে আল্লাহর, তা অটল থাকে।
সৎ আত্মাগুলো শয়তানের দ্বারা তাদের বুদ্ধি বা অন্তরে অধিকারপ্রাপ্ত হয় না। সর্বোচ্চ যা হতে পারে, তা হলো শারীরিক পরীক্ষার মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া বা কুমন্ত্রণা দেওয়া; কিন্তু সে মুমিনের বিবেক বা বোধশক্তিকে ছিনিয়ে নিতে পারে না।
কিন্তু যে আত্মা কলুষিত, বিশেষত যারা দরিদ্রদের শোষণ করে এবং অন্যায়ভাবে সম্পদ ভক্ষণ করে, তারা পার্থিব লোভে এমনভাবে নিমজ্জিত হয় যে তাদের নৈতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যায়। তাদের অন্তরের অন্ধত্ব এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে তারা হালাল ও হারামের পার্থক্য করতে অক্ষম হয়ে পড়ে।
এ কারণেই আয়াতটি তাদের অবস্থার ব্যাখ্যা নিজেই দিয়েছে:
“এটি এজন্য যে তারা বলেছিল ‘ব্যবসা তো সুদেরই মতো।’”
তারা দুনিয়াতে সত্য ও মিথ্যার মধ্যে গুলিয়ে ফেলেছিল; তাই আখিরাতে তারা উঠবে বিভ্রান্ত ও বিশৃঙ্খল অবস্থায়।
আল্লাহ তাআলা অন্যত্র বলেছেন:
“যে ব্যক্তি এ দুনিয়ায় অন্ধ থাকবে, সে আখিরাতেও অন্ধ থাকবে।” (কুরআন ১৭:৭২)
কিয়ামতের দিন তাদের সেই বিশৃঙ্খলভাবে দাঁড়ানো আসলে দুনিয়ার জীবনে তারা যে নৈতিক বিশৃঙ্খলা লালন করেছে, তারই প্রতিফলন। এটি আত্মিক ধ্বংস ও নৈতিক দৃষ্টিশক্তির পতনের এক জীবন্ত রূপকচিত্র, কোনোভাবেই শয়তানি ভর বা দখলের আক্ষরিক সমর্থন নয়।
এর বিপরীতে, যারা দান করে, তারা নিরাপদ অবস্থায় উঠবে:
“তাদের উপর কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা দুঃখিতও হবে না।”
এভাবে কুরআনের ভাষা অর্থনৈতিক অবিচারের গভীর নৈতিক পরিণতি তুলে ধরে, পাশাপাশি একটি মৌলিক আকীদাগত সত্য প্রতিষ্ঠা করে, শয়তানের ক্ষমতা কেবল কুমন্ত্রণা ও আহ্বান পর্যন্ত সীমাবদ্ধ; সে কখনো মানুষকে অধিকার বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না। মানুষ নিজেই কাজ করে, নিজেই নির্বাচন করে এবং নিজ প্রতিপালকের সামনে নিজ দায়িত্ব বহন করে।
————-
ক্যাটাগরি : তাফসীর, কোরআন, শিক্ষা, ইসলামি আলোচনা,
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8578