AkramNadwi

শিরোনাম : সূরা আর-রহমান ১০/২/২০২৬ بسم الله الرحمن

শিরোনাম : সূরা আর-রহমান
১০/২/২০২৬

بسم الله الرحمن الرحيم
❖ প্রশ্ন:

আসসালামু আলাইকুম।

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তা‘আলার তাওফীকে ইনশা আল্লাহ রমযান মাসে আমি আমার ছাত্রীদের সঙ্গে সূরা রহমানের তাদাব্বুর করতে চাই। আমার ইচ্ছা, তা যেন সম্মানিত শায়খের দিকনির্দেশনায় বোঝা যায়।

অনুগ্রহ করে দিকনির্দেশনা দিন, এই সূরার মূল তাদাব্বুরের বিষয়গুলো কী? এ থেকে আমাদের কী শিক্ষা নেওয়া উচিত?
এর তিলাওয়াতের পর আমাদের মধ্যে কেমন চিন্তাগত ও কর্মগত মানসিকতা সৃষ্টি হওয়া প্রত্যাশিত?
এখানে “فَبِأَيِّ آلَاءِ رَبِّكُمَا تُكَذِّبَانِ” আয়াতটির পুনরাবৃত্তির উদ্দেশ্য কী? এটি আমাদের চিন্তা ও চরিত্রে কেমন পরিবর্তন দাবি করে?
সূরার সূচনা মুবারক নাম “الرَّحْمٰن” দিয়ে, এর সঙ্গে বর্ণিত নিয়ামতসমূহের কী সম্পর্ক?
এভাবে বোঝা কি সঠিক যে, সূরাটি নিয়ামতের পরিচয় করায়, কৃতজ্ঞতার দাওয়াত দেয় এবং অকৃতজ্ঞতার ব্যাপারে সতর্ক করে? বাস্তবে কীভাবে শোকরগুজারি সৃষ্টি হবে এবং অকৃতজ্ঞতার রূপগুলো কী?

# সুফিয়া খান

❖ উত্তর:

ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

আপনার এ বরকতময় নিয়ত, রমযানে ছাত্রীদেরকে সূরা রহমানের তাদাব্বুরের সঙ্গে যুক্ত করা, হৃদয়ের গভীর থেকে আনন্দ জাগায়। এটি কেবল একটি পাঠদান নয়; বরং অন্তরসমূহকে রহমতের উৎসের সঙ্গে যুক্ত করার এক মহৎ আহ্বান। আল্লাহ তাআলা আপনার এ প্রচেষ্টা কবুল করুন, আপনাকে ও আপনার ছাত্রীদের জন্য এটিকে হিদায়াত, মারিফাত ও নৈকট্যের মাধ্যম বানান এবং এর প্রভাব স্থায়ী করে দিন।

সূরা আর-রহমান কুরআনের সেই মহিমান্বিত সূরাগুলোর অন্তর্ভুক্ত, যেখানে আল্লাহ রব্বুল ইজ্জতের কুদরত, হিকমত এবং বিশেষভাবে তাঁর রহমতের গুণ অত্যন্ত সামগ্রিক ও হৃদয়গ্রাহী ভঙ্গিতে প্রকাশিত হয়েছে।

এই সূরার মূল ও কেন্দ্রীয় বিষয় হলো আল্লাহ তাআলার অগণিত অনুগ্রহ, তাঁর অসংখ্য নিয়ামত, দান এবং রবুবিয়্যাতের অবিরাম অনুকম্পা।
সূরার শুরুই হয়েছে মহান নাম “আর-রহমান” দিয়ে, যা পুরো সূরার জন্য যেন শিরোনাম ও চাবিকাঠি। পরবর্তী সব আলোচনা আসলে এ সত্যেরই ব্যাখ্যা, এই বিশ্বজগৎ, এর সুশৃঙ্খল ব্যবস্থা, মানুষের সৃষ্টি, তার হিদায়াত, এমনকি পরিণামে প্রতিদান ও শাস্তি, সবই আল্লাহর রহমতের বহিঃপ্রকাশ।

সূরার শুরুতে মানুষের সৃষ্টির আগেই “তালীমুল কুরআন” ( কুরআন শিক্ষা) উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বোঝা যায়, হিদায়াতই মানবজীবনের সর্ববৃহৎ প্রয়োজন এবং সর্বশ্রেষ্ঠ নিয়ামত। তারপর মানুষের সৃষ্টি ও তাকে “বয়ান” ( ভাষা ও প্রকাশক্ষমতা) দানের কথা এসেছে; যা জ্ঞান, বোধ, সভ্যতা ও সংস্কৃতির ভিত্তি।

এরপর সূর্য ও চাঁদের সুনির্দিষ্ট নিয়মে চলা, নক্ষত্র ও বৃক্ষের সিজদা, আসমানকে উঁচু করে স্থাপন করা এবং “মীযান” (ন্যায় ও ভারসাম্য) প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়, সৃষ্টিজগতের গোটা ব্যবস্থা ন্যায়, সামঞ্জস্য ও প্রজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত। এখানে রহমত কেবল আবেগের বিষয় নয়; বরং সুপরিকল্পিত রবুবিয়্যাতের রূপে প্রকাশিত।

এই সূরা নাযিল হয়েছিল মক্কার সেই সময়ে, যখন কুরাইশরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কঠোর বিরোধিতা করছিল এবং তাঁর নিকট এমন অলৌকিক নিদর্শন চাইছিল, যা তাদের মতে তাঁর সত্যতা প্রমাণ করবে। কুরআন এ দাবির জবাবে মানুষকে দৃষ্টি ফেরাতে বলে, বাহ্যিক চমকপ্রদ নিদর্শনের দিকে নয়, বরং সেই সর্বব্যাপী নিয়ামতগুলোর দিকে, যা প্রতিক্ষণ তাকে ঘিরে আছে এবং তার নিজের সত্তার মধ্যেই বিদ্যমান।

সমস্যা নিদর্শনের অভাব নয়; সমস্যা হলো তা দেখার ও মানার প্রস্তুতির অভাব। আগের সূরায় প্রশ্ন উঠেছিল “কেউ কি উপদেশ গ্রহণ করবে?” এখানে সেই ধারাবাহিকতায় প্রশ্ন রাখা হয়েছে “অতএব তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের কোন কোন নিয়ামত অস্বীকার করবে?”

এই পুনরাবৃত্ত প্রশ্ন শুধু ভাষাগত অলংকার নয়; এটি বিবেককে নাড়া দেওয়ার এক ধারাবাহিক আহ্বান। প্রতিটি নিয়ামতের উল্লেখের পর এ প্রশ্ন যেন হৃদয়ের দরজায় কড়া নাড়ে, স্বীকার করবে, না অস্বীকার করবে? কৃতজ্ঞ হবে, না উদাসীন থাকবে?

সূরার সম্বোধন মানুষ ও জিন, উভয়ের প্রতি। এতে ইঙ্গিত রয়েছে যে আল্লাহর রহমত কোনো এক সৃষ্টির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সব দায়িত্বশীল সৃষ্টিকে পরিব্যাপ্ত করে। কুরআন জানায়, জিনদের এক দল এ বাণী শুনে ঈমান এনেছিল। তবে সাধারণ নীতি হলো, প্রতিটি জাতির মধ্য থেকেই তাদের জন্য রাসূল প্রেরিত হন, যদিও কোনো নবীর দাওয়াত তার মূল সম্বোধিতদের বাইরে পৌঁছাতেও পারে।

“আর-রহমান” নাম এবং সূরার বিষয়বস্তুর মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। কুরআনের শিক্ষা রহমত, মানুষের সৃষ্টি রহমত, তাকে জ্ঞান ও ভাষা দেওয়া রহমত, পৃথিবীর সম্পদ রহমত, সাগরের ভাণ্ডার রহমত, এমনকি আখিরাতে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাও রহমত। কারণ হিসাব-নিকাশ না হলে জুলুম ও অবাধ্যতা অবাধ হয়ে যেত।

এভাবে সূরাটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এক জীবন্ত তাফসির, যে রবের রহমত সর্বব্যাপী, নিরবচ্ছিন্ন এবং জীবনের প্রতিটি স্তরকে পরিবেষ্টন করে।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *