শিরোনাম : সুরা আত-তাগাবুনের একটি আয়াত।
——————–
প্রশ্ন:
মাস্কাট (ওমান) এর সক্রিয় ও কর্মঠ আলেম ও দাঈ, মাওলানা তৌকীর আহমদ নাদভী নদওয়াতুল উলামায় লিখেছেন:
“হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই তোমাদের স্ত্রীদের ও সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু, সুতরাং তাদের থেকে সাবধান থাকো”
(আত-তাগাবুন: ১৪)।
এ আয়াতের সাধারণ অর্থ এভাবে বোঝানো হয় যে, স্ত্রী ও সন্তানরা তোমাদের শত্রু। কিন্তু কুরআনের সাধারণ ভাষণ তো নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য হয়ে থাকে। সেই আলোকে এ অর্থ হবে যে, স্ত্রীর জন্য স্বামী শত্রু, আর স্বামীর জন্য স্ত্রী শত্রু। অর্থাৎ আয়াতটির মর্ম একপাক্ষিক নয়, বরং উভয় লিঙ্গের জন্য প্রযোজ্য। একপাক্ষিক অর্থ নিলে মহিলাদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক মনোভাব প্রকাশ পায়—এমন অভিযোগ উঠতে পারে।
উত্তর:
কুরআন কারিমে “زوج” (বহুবচন: “أزواج”) শব্দটি মানুষের প্রসঙ্গে বিভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।
কিছু জায়গায় এর দ্বারা স্ত্রী বোঝানো হয়েছে, যেমন:
“তোমাদের জন্য তোমাদের স্ত্রীরা যা রেখে যায় তার অর্ধেক রয়েছে” (আন-নিসা: ১২),
“তোমরা এবং তোমাদের স্ত্রীগণ জান্নাতে প্রবেশ করো, তোমরা আনন্দে থাকবে” (আয-যুখরুফ: ৭০)।
কিছু স্থানে এর দ্বারা স্বামী বোঝানো হয়েছে, যেমন:
“যদি সে তাকে (তৃতীয়বার) তালাক দেয়, তবে তার জন্য আর হালাল নয়, যতক্ষণ না সে অন্য স্বামীকে বিয়ে করে” (আল-বাকারা: ২৩০)।
আবার কোথাও এটি উভয়ের জন্য ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন:
“আমি তোমাদেরকে যুগল আকারে সৃষ্টি করেছি” (আন-নাবা: ৮)।
সুরা আত-তাগাবুনের উল্লিখিত আয়াত বোঝার জন্য তার প্রেক্ষাপট অনুধাবন করা জরুরি। এ প্রেক্ষাপট হলো হিজরত এবং আল্লাহর দ্বীনের পথে আত্মত্যাগ। একই বিষয়কে সুরা আল-মুমতাহিনাহতে স্পষ্ট করা হয়েছে:
“তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তার সাথীদের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে” (আল-মুমতাহিনাহ: ৪)।
মানুষকে হিজরত ও দ্বীনের আত্মত্যাগ থেকে বিরত রাখার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায় স্ত্রী, সন্তান ও সম্পদের প্রতি ভালোবাসা। নারীদের ক্ষেত্রেও স্বামী, সন্তান ও সম্পদের প্রতি ভালোবাসা বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে যেহেতু নারীরা মুস্তাদাফিন (দুর্বল ও বিপদগ্রস্ত শ্রেণি) হিসেবে ধরা হয়েছে, তাই তাদের উপর হিজরত ফরজ করা হয়নি। তবে যদি তারা স্বেচ্ছায় হিজরত করে, তবে তা গ্রহণযোগ্য। এজন্যই সুরা আল-মুমতাহিনাহতে নারীদের হিজরতের বিধান বিস্তারিতভাবে বলা হয়েছে:
“হে ঈমানদারগণ! যখন মুমিন নারীরা হিজরত করে তোমাদের কাছে আসে, তখন তাদের পরীক্ষা করো…” (আল-মুমতাহিনাহ: ১০)।
এখানে বলা হয়েছে:
“আর যদি তোমাদের কাছ থেকে তোমাদের স্ত্রীদের কেউ হারিয়ে যায়” (আল-মুমতাহিনাহ: ১১)।
এখানে “أزواج” দ্বারা শুধু স্ত্রী বোঝানো হয়েছে, স্বামী বোঝানো সম্ভব নয়।
এই ধারাবাহিকতায় সুরা আস-সাফে এ বিধান আরও জোর দিয়ে বলা হয়েছে। সুরা আল-জুমুআতে সম্পদের প্রতি অতিরিক্ত ঝোঁক থেকে বিরত করা হয়েছে:
“তারা যখন কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য বা বিনোদন দেখে, তখন তোমাকে দাঁড় করিয়ে রেখে সেখানে ছুটে যায়” (আল-জুমুআহ: ১১)।
আর সুরা আল-মুনাফিকুনে বলা হয়েছে:
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তানরা যেন তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ থেকে বিমুখ না করে” (আল-মুনাফিকুন: ৯)।
একই ধারাবাহিকতায় সুরা আত-তাগাবুনে বলা হয়েছে:
“হে ঈমানদারগণ! নিশ্চয়ই তোমাদের স্ত্রীদের ও সন্তানদের মধ্যে কেউ কেউ তোমাদের শত্রু, সুতরাং তাদের থেকে সাবধান থাকো। আর যদি তোমরা ক্ষমা করো, চোখ বুজে যাও এবং মাফ করে দাও, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু” (আত-তাগাবুন: ১৪)।
এখানে “أزواج” দ্বারা স্ত্রীদের বোঝানো হয়েছে। কারণ হিজরত ও সাহায্যের মূল خطاب প্রথমত পুরুষদের উদ্দেশে ছিল। এর সাথে এসেছে “فاحذروهم” (তাদের থেকে সাবধান হও), যা পুরুষদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, কারণ তারাই সংসারের অভিভাবক (قوام)।
এরপর আশঙ্কা ছিল যে, কিছু পুরুষ হয়তো অযথা দাম্পত্য সম্পর্ক ছিন্ন করে ফেলবে। এজন্যই বলা হলো—অতিরিক্ত কঠোর হওয়ার দরকার নেই; বরং ক্ষমা, সহনশীলতা ও দয়া অবলম্বন করো।
সুরা আত-তাগাবুনের পরবর্তী দুটি সূরা হলো—আত-তালাক ও আত-তাহরীম। এগুলোতে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের সীমারেখা স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে।
সুরা আত-তালাক-এ বলা হয়েছে—যদি স্ত্রীদের পছন্দ না হয়, তবে সীমালঙ্ঘন কোরো না, তাদের সাথে বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ কোরো না। আল্লাহকে ভয় করো এবং ন্যায়বিচারের সাথে বিচ্ছেদ ঘটাও (আত-তালাক: ১-২)।
সুরা আত-তাহরীম-এ বলা হয়েছে—স্ত্রীদের ভালোবাসায়ও সীমা লঙ্ঘন কোরো না, বরং মধ্যপন্থা অবলম্বন করো।
শেষে চারজন নারীর উদাহরণ দেওয়া হয়েছে:
দুই অবিশ্বাসীর জন্য—নূহ ও লূত (আ.)-এর স্ত্রীগণ (আত-তাহরীম: ১০)।
দুই ঈমানদারের জন্য—ফিরআউনের স্ত্রী (আসিয়া) ও মরিয়ম বিনতে ইমরান (আত-তাহরীম: ১১-১২)।
সারকথা হলো:
সুরা আত-তাগাবুনের এ আয়াত স্পষ্ট করে যে, দ্বীনের পথে স্ত্রী ও সন্তানের প্রতি ভালোবাসাই বড় পরীক্ষা। তাই মুমিন পুরুষদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—সাবধান থাকো। তবে সাথে এটিও বলা হয়েছে—অতিরিক্ত কঠোর হয়ো না; বরং ক্ষমাশীলতা, সহনশীলতা ও মাফ করার নীতি অবলম্বন করো।
——————–
ক্যাটাগরি : তাফসির, কোরআন,
—
✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7046