শিরোনাম : সহিহ মুসলিমে বর্ণিত “لا يصلين أحد الظهر إلا في بني قريظة” হাদিস প্রসঙ্গে।
|১৯|১২|২০২৫|
প্রশ্ন:
সম্মানিত শাইখ আবু উবাইদা অ্যান্ড্রু বুসো আমার কাছে সহিহ মুসলিমে বর্ণিত এই হাদিস সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন:
“ا يصلين أحد الظهر إلا في بني قريظة”
তোমাদের কেউ যেন বনু কুরায়যায় না পৌঁছা পর্যন্ত যোহরের নামাজ আদায় না করে।”
অথচ ইমাম বুখারি এ হাদিসটি এভাবে বর্ণনা করেছেন :
لا يصلين أحد العصر إلا في بني قريظة
“তোমাদের কেউ যেন বনু কুরায়যায় না পৌঁছা পর্যন্ত আসরের নামাজ আদায় না করে।”
একই হাদিস, একই সনদ হওয়া সত্ত্বেও যোহর ও আসরের নামাজে এই পার্থক্য কীভাবে সৃষ্টি হলো?
উত্তর:
ইমাম মুসলিম তাঁর ‘কিতাবুল জিহাদে এই হাদিসটি এভাবে বর্ণনা করেছেন:
আমাকে আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ ইবন আসমা আদ-দুবাঈ হাদিস শুনিয়েছেন; তিনি বলেন, জুওয়াইরিয়া ইবন আসমা আমাদের কাছে বর্ণনা করেছেন, তিনি নাফে‘র মাধ্যমে আব্দুল্লাহ (ইবন উমর) থেকে বর্ণনা করেন:
তিনি বলেন, আহযাব যুদ্ধ থেকে ফিরে আসার দিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের মধ্যে ঘোষণা দিলেন,
“তোমাদের কেউ যেন বনু কুরায়যায় না পৌঁছা পর্যন্ত যোহরের নামাজ আদায় না করে।”
কিছু লোক সময় শেষ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় বনু কুরায়যায় পৌঁছার আগেই নামাজ আদায় করে নিল। অন্যরা বলল, আমরা সেখানে পৌঁছানো ছাড়া নামাজ আদায় করব না, সময় চলে গেলেও না। পরে বিষয়টি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উপস্থাপিত হলে তিনি উভয় দলের কাউকেই তিরস্কার করেননি।
আর ইমাম বুখারি ‘সালাতুল খাওফ’-এর অধ্যায়ে হাদিসটি এভাবে এনেছেন:
আমাদের কাছে আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ ইবন আসমা বর্ণনা করেছেন; তিনি বলেন, জুওয়াইরিয়া নাফে‘র মাধ্যমে ইবন উমর থেকে বর্ণনা করেছেন:
তিনি বলেন, আহযাব যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের বললেন,
“তোমাদের কেউ যেন বনু কুরায়যায় না পৌঁছা পর্যন্ত আসরের নামাজ আদায় না করে।”
পথে কিছু লোকের আসরের সময় এসে গেলে তারা বলল, আমরা সেখানে না পৌঁছা পর্যন্ত নামাজ পড়ব না। অন্যরা বলল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের উদ্দেশ্য এটা ছিল না; তাই তারা পথেই নামাজ আদায় করে নিল। পরে বিষয়টি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে উল্লেখ করা হলে তিনি কাউকেই ভর্ৎসনা করেননি।
ইমাম বুখারি একই সনদে আরেক স্থানে হাদিসটি পুনরায় বর্ণনা করেছেন, সেখানেও ‘আসর’ এর কথাই এসেছে।
এই বর্ণনাগুলো থেকে স্পষ্ট হয় যে, উভয় শাইখ, বুখারি ও মুসলিম, একই সনদে হাদিসটি গ্রহণ করেছেন। এ কারণেই আলিমদের কাছে যোহর ও আসরের এই ভিন্নতা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। কেউ কেউ দুই বর্ণনার মধ্যে সমন্বয়ের চেষ্টা করেছেন, কিন্তু সে সমন্বয় খুব দৃঢ় নয়; কারণ উভয় হাদিসের উৎস এক। এ মতই গ্রহণ করেছেন হাফিজ ইবন হাজর।
তিনি বলেন, কিছু আলিম এভাবে সমন্বয় করেছেন যে, আদেশ দেওয়ার আগে কেউ কেউ যোহরের নামাজ আদায় করে ফেলেছিল, কেউ করেনি। যাদের যোহর পড়া হয়নি, তাদের উদ্দেশে বলা হয়েছিল, ‘যোহর’; আর যারা পড়ে ফেলেছিল, তাদের উদ্দেশে বলা হয়েছিল, ‘আসর’।
আর কেউ কেউ বলেছেন, একদল আগে রওনা হয়েছিল, তাদের জন্য বলা হয়েছিল ‘যোহর’; পরে যারা বের হয়েছিল, তাদের জন্য বলা হয়েছিল ‘আসর’।
দুটি ব্যাখ্যাই গ্রহণযোগ্য হতে পারে, তবে একই সনদে উভয় ইমামের বর্ণনা হওয়ায় এ ব্যাখ্যাগুলো কিছুটা দূরবর্তী মনে হয়। কারণ সনদের প্রতিটি বর্ণনাকারী একই হাদিস দুইভাবে বর্ণনা করেছেন, এমনটি হলে তা স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হতো, অথচ তেমনটি দেখা যায় না।
আমি বলি, ইমাম বুখারির ‘আসর’ শব্দের বর্ণনায় সহিহ মুসলিম ভিন্নতা দেখিয়েছেন। একইভাবে আবু আওয়ানার মুসনাদে মা‘আয ইবন মা‘আয বা আবু আহওয়াস, ইবন হিব্বানের সহিহে আবু ই‘লা এবং বায়হাকির সুনানুল কুবরায় ইব্রাহিম ইবন হাশিম, সবাই আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ ইবন আসমা থেকে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন ‘যোহর’ শব্দে।
এরা সবাই আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মদের শাগরেদ; আর তারা মুসলিমের বর্ণনার মতোই ‘যোহর’ বলেছেন। এতে বোঝা যায়, মুসলিম তাঁর শাইখের শব্দচয়নের প্রতি বিশ্বস্ত থেকেছেন এবং হুবহু তা সংরক্ষণ করেছেন। হাফিজ ইবন হাজর বলেন, মুসলিমের সঙ্গে আবু ই‘লা ও আরও কয়েকজন এ বর্ণনায় একমত। একইভাবে ইবন সা‘দ আবু ‘উতবান মালিক ইবন ইসমাইলের সূত্রে জুওয়াইরিয়া থেকে ‘যোহর’ শব্দে হাদিসটি এনেছেন; ইবন হিব্বানও আবু ‘উতবানের সূত্রে তাই করেছেন। জুওয়াইরিয়ার অন্য কোনো বর্ণনায় আমি ‘যোহর’ ছাড়া কিছু পাইনি; তবে আবু নু‘আইম তাঁর ‘মুস্তাখরাজ’- এ আবু হাফস আস-সুলামির সূত্রে জুওয়ারিয়া থেকে ‘আসর’ শব্দে হাদিসটি বর্ণনা করেছেন।
তবে সীরাত ও ইতিহাসবিদরা আব্দুল্লাহ ইবন মুহাম্মদ ইবন আসমার সূত্র ছাড়াও হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং সেখানে ঘটনাটি ‘আসর’ এর সঙ্গেই সম্পৃক্ত। হাফিজ ইবন হাজর বলেন, মাগাজি বা যুদ্ধবিষয়ক বর্ণনাকারীরা সবাই একমত যে এটি ছিল আসরের নামাজ।