AkramNadwi

শক্তির ভারসাম্য ও স্বায়ত্তশাসনের নতুন মানদণ্ড

শক্তির ভারসাম্য ও স্বায়ত্তশাসনের নতুন মানদণ্ড

৪ মার্চ ২০২৬

بسم الله الرحمن الرحيم
আমেরিকা ও ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানের বিরুদ্ধে শুরু করা যৌথ সামরিক অভিযানটি মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ভূরাজনৈতিক পরিবর্তনের ধারায় এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। একে কেবল সীমিত লক্ষ্যকে সামনে রেখে সংঘটিত কোনো সামরিক সংঘর্ষ বা বারবার উত্থিত উত্তেজনার ধারাবাহিকতার একটি সাময়িক পর্ব মনে করা সঠিক হবে না। বরং এটিকে শক্তির ভারসাম্য, রাষ্ট্রের স্বায়ত্তশাসনের কাঠামো এবং আঞ্চলিক প্রভাব ও কর্তৃত্বের স্তরবিন্যাসকে পুনর্গঠনের বৃহত্তর প্রক্রিয়ার আলোকে দেখা উচিত। এ ধরনের পরিবর্তন শুধু সামরিক বাস্তবতাকেই বদলে দেয় না; বরং সংঘর্ষের নিয়মকেও নতুন রূপ দেয়, জোটের মানচিত্র পাল্টে দেয় এবং এমন এক রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টি করে, যেখানে প্রতিরোধ ও অবস্থান নির্ধারণের হিসাব-নিকাশও নতুনভাবে গঠিত হয়।

এই সামরিক অভিযানের উদ্দেশ্য হিসেবে বিশ্বমঞ্চে সাধারণত বলা হয়, এটি একটি নির্দিষ্ট হুমকিকে নিষ্ক্রিয় করা কিংবা এমন কিছু সামরিক সক্ষমতাকে দুর্বল করার চেষ্টা, যেগুলোকে নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগজনক মনে করা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতির তাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিষয়টি বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কেন্দ্রীয় ও সর্বোচ্চ কোনো কর্তৃত্ব থেকে বঞ্চিত বৈশ্বিক ব্যবস্থায় প্রতিযোগিতা এবং আপেক্ষিক শক্তি বৃদ্ধির প্রবণতাই মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করে। এই বাস্তবতায় বৃহৎ শক্তিগুলো নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত স্বার্থের আলোকে আঞ্চলিক পরিবেশকে পুনর্বিন্যাস করে নিজেদের প্রাধান্য সুদৃঢ় করার চেষ্টা করে। ফলে কোনো আঞ্চলিক রাষ্ট্রের কৌশলগত কাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু বানানো সাধারণত একটি বৃহত্তর প্রক্রিয়ার অংশ, যার লক্ষ্য হলো শক্তির ভারসাম্যকে এমনভাবে পুনর্গঠন করা, যাতে নির্দিষ্ট কোনো পক্ষের আধিপত্য রাজনৈতিক ও সামরিক নিশ্চয়তার মাধ্যমে দীর্ঘস্থায়ী করা যায়।

আধিপত্যভিত্তিক স্থিতিশীলতার তত্ত্ব অনুযায়ী, বৈশ্বিক ব্যবস্থায় এক ধরনের শৃঙ্খলা তখনই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে, যখন কোনো বৃহৎ শক্তি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গুরুত্বপূর্ণ স্থল ও সামুদ্রিক পথের তদারকি করা এবং আন্তর্জাতিক আচরণের নিয়ম নির্ধারণের দায়িত্ব নিজের হাতে নেয়। কিন্তু এই স্থিতিশীলতা প্রকৃতপক্ষে নিরপেক্ষ হয় না; কারণ তা মূলত প্রভাবশালী শক্তির দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বার্থের প্রতিফলন বহন করে। এর ফলে বৈশ্বিক ব্যবস্থার ভেতরে বিভিন্ন পক্ষের ভূমিকা এমনভাবে পুনর্বিন্যস্ত হয় যে অন্য রাষ্ট্রগুলো অপেক্ষাকৃত নিম্নস্তরের একটি স্পষ্ট শ্রেণিবিন্যাসের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। এই অর্থে স্থিতিশীলতা নিজেই কোনো স্বতন্ত্র লক্ষ্য নয়; বরং এটি এমন একটি কাঠামো, যার ভেতরে স্বার্থের ব্যবস্থাপনা পরিচালিত হয়, এবং যা প্রায়ই অসম শক্তির ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

এই প্রেক্ষাপটে আমেরিকা ও ইসরায়েলের সামরিক সমন্বয়কে আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোর পুনর্গঠনের একটি প্রচেষ্টা হিসেবেও দেখা যেতে পারে। এখানে ইসরায়েল প্রতিরক্ষামূলক সমীকরণের কেন্দ্রীয় স্তম্ভে পরিণত হয়, আর আমেরিকা তাকে কৌশলগত ছায়া, রাজনৈতিক সমর্থন এবং কূটনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে। এর ফলে আঞ্চলিক শক্তিকেন্দ্রগুলোর বহুমাত্রিক ভারসাম্য ধীরে ধীরে এমন এক ব্যবস্থার দিকে সরে যেতে থাকে, যা একটি কেন্দ্রীয় অক্ষকে ঘিরে আবর্তিত হয়। অন্য রাষ্ট্রগুলো তখন স্বেচ্ছায় বা অনিচ্ছায় এই নতুন বাস্তবতার সঙ্গে নিজেদের অবস্থান সামঞ্জস্য করতে বাধ্য হয়।

তবে এই পরিবর্তন কোনো রাজনৈতিক শূন্যতায় ঘটে না। আরব রাষ্ট্রগুলো, বিশেষ করে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদের সদস্য দেশগুলো, নিরাপত্তার চাহিদা এবং জাতীয় স্বায়ত্তশাসনের প্রয়োজনের মধ্যে এক অত্যন্ত সূক্ষ্ম ভারসাম্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে বাহ্যিক নিরাপত্তার ছাতা সম্ভাব্য সংঘাত বৃদ্ধির আশঙ্কার বিরুদ্ধে এক ধরনের আশ্বাস দেয়; অন্যদিকে এমন একটি নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গভীরভাবে জড়িয়ে পড়া, যা জাতীয় কাঠামোর বাইরে গড়ে ওঠে, রাষ্ট্রের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর সংকুচিত করতে পারে। ফলে আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ নীতিগুলো কখনো কখনো এমন অগ্রাধিকারের সঙ্গে মানিয়ে নিতে বাধ্য হয়, যা সরাসরি জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে।

নির্ভরতার তত্ত্ব অনুযায়ী, বড় ও ছোট শক্তির মধ্যে অসম সম্পর্কের প্রভাব কেবল সামরিক ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা অর্থনীতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং কৌশলগত অবস্থান নির্ধারণ পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। যখন কোনো রাষ্ট্র তার নিরাপত্তার জন্য অন্য একটি রাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন সংকটময় মুহূর্তে তার সিদ্ধান্তগুলো প্রভাবশালী পক্ষের বিবেচনার সঙ্গে অধিকতর সম্পর্কিত হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতি সাময়িকভাবে স্থিতিশীলতা এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা স্বায়ত্তশাসনের ধারণাকেই নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করে ফেলে, এমনকি একসময় বাস্তব স্বাধীনতার পরিবর্তে তা কেবল আইনি ও আনুষ্ঠানিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়তে পারে।

বাস্তববাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হলে বোঝা যায়, যে রাষ্ট্রগুলো কোনো কেন্দ্রীয় বাধ্যতামূলক কর্তৃত্ববিহীন বৈশ্বিক ব্যবস্থায় অবস্থান করে, তারা নিজেদের টিকে থাকার জন্য ক্রমাগত আপেক্ষিক শক্তি বৃদ্ধি করার চেষ্টা করে। এই যুক্তি অনুযায়ী, ইরানের সক্ষমতাকে দুর্বল করার জন্য যে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা আসলে একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশ হতে পারে, যার উদ্দেশ্য এমন সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীর উত্থান ঠেকানো, যে আঞ্চলিক পর্যায়ে ইসরায়েলের প্রাধান্যের মোকাবিলা করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় প্রতিরক্ষামূলক সমীকরণগুলো নতুন করে বিন্যস্ত হয় এবং ধীরে ধীরে এমন একটি আঞ্চলিক কাঠামো গড়ে ওঠে, যেখানে বিভিন্ন রাষ্ট্রের ভূমিকা নির্ধারিত হয় কেন্দ্রীয় শক্তির নিকটতা বা দূরত্বের ভিত্তিতে। এর প্রভাব পড়ে জোটের প্রকৃতি এবং ভবিষ্যতের শক্তির ভারসাম্যের ওপরও।

উম্মাহর ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা আমাদের এ কথাই শেখায় যে শক্তি যখন ন্যায় ও শৃঙ্খলার কাঠামো থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তা বাহ্যিক স্থিতিশীলতার পরিবর্তে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। খুলাফায়ে রাশেদীনের যুগে যে শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, তা ছিল ঐক্য, ন্যায়ভিত্তিক শাসন এবং সামাজিক সামঞ্জস্যের ওপর দাঁড়ানো; এর বিস্তার ছিল সেই অভ্যন্তরীণ স্থিতির ফল, ভিত্তি নয়। একইভাবে সালাহউদ্দিন আইয়ুবীও মুক্তির বৃহত্তর লক্ষ্য সামনে আনার আগে অভ্যন্তরীণ ঐক্য ও রাজনৈতিক কাঠামোর সংস্কারকে অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন। কিন্তু উসমানীয় খেলাফতের শেষ যুগে অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা ও বহির্ভরতা ধীরে ধীরে তার কাঠামোকে ক্ষয় করে দেয়, যদিও বাহ্যিক শক্তির আভা দীর্ঘদিন পর্যন্ত টিকে ছিল।

আজ এই অঞ্চলের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ কোনো একক সামরিক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং প্রশ্নটি হলো, এই ঘটনাগুলো মিলিতভাবে অঞ্চলকে কোন ধরনের বৃহত্তর কাঠামোর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। সেই কাঠামো কি এমন হবে যেখানে শ্রেণিবিন্যাস ও প্রাধান্যই মুখ্য হয়ে উঠবে? স্বার্থের ভারসাম্যের ওপর দাঁড়ানো একটি ব্যবস্থা এবং আধিপত্যনির্ভর একটি ব্যবস্থার মধ্যে পার্থক্য মৌলিক। একতরফা শ্রেষ্ঠত্ব সাময়িক স্থিতি এনে দিতে পারে, কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত ভূমিকার বণ্টনে ন্যায্য ভারসাম্য ও পারস্পরিক স্বার্থের স্বীকৃতি না থাকে, ততক্ষণ সেই স্থিতি ভঙ্গুরই থেকে যায়।

এই কারণেই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ অনেকখানি নির্ভর করছে—এ অঞ্চলের দেশগুলো কীভাবে নিরাপত্তার প্রয়োজন এবং স্বায়ত্তশাসনের দাবির মধ্যে ভারসাম্য স্থাপন করতে পারে তার ওপর। একই সঙ্গে প্রশ্ন হলো, জোটে অংশগ্রহণ করেও তারা কতটা নিজেদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পরিসর রক্ষা করতে পারে। যে জোট অভ্যন্তরীণ সক্ষমতাকে শক্তিশালী করে এবং বিকল্পের সুযোগ অটুট রাখে, তার সঙ্গে সেই জোটের পার্থক্য সুস্পষ্ট, যা দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতার দিকে ঠেলে দেয়। পারস্পরিক স্বার্থের ভারসাম্য থেকে যে স্থিতিশীলতা জন্ম নেয়, তা সেই স্থিতিশীলতার মতো নয়, যা কেবল শক্তির প্রাধান্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে।

এই মুহূর্তে অঞ্চলটি এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। হয় এই পরিবর্তনগুলো এমন এক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাবে, যা আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক, যেখানে রাষ্ট্রগুলোর স্বায়ত্তশাসনের প্রতি সম্মান থাকবে; অথবা একটি আরও স্তরবিন্যস্ত ও আধিপত্যকেন্দ্রিক কাঠামো স্থায়ী হয়ে উঠবে। এই প্রেক্ষাপটে মূল প্রশ্নটি হলো, নিরাপত্তা কি স্বায়ত্তশাসনকে সুদৃঢ় করার মাধ্যম হবে, নাকি তা স্বায়ত্তশাসনের ধারণাকেই সীমিত করে দেওয়ার পথে রূপ নেবে? আগামী বছরগুলোতে এই প্রশ্নের উত্তর নির্ধারিত হবে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর দৃঢ় সংকল্প, দূরদর্শিতা এবং শক্তির বাস্তব উপলব্ধির ওপর এবং এ বিষয়ের ওপরও যে তারা নিজেদের কৌশলের কেন্দ্রে মর্যাদা ও স্বায়ত্তশাসনের সুরক্ষাকে স্থান দেয় কি না।

—————

ক্যাটাগরি : ইসলামি চিন্তাধারা, তারিখ, দর্শন,

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8601

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *