AkramNadwi

লাইলাতুল কদর

লাইলাতুল কদর

بسم الله الرحمن الرحيم

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জন্মগতভাবেই ছিলেন নির্মল ফিতরতের অধিকারী। তাঁর জাতির ভ্রান্তি সেই ফিতরতকে কলুষিত করতে পারেনি। তিনি স্বভাবতই ছিলেন সুস্থ ও পরিশুদ্ধ বুদ্ধির মানুষ; জাহেলি সমাজের নির্বুদ্ধিতা তাঁর চিন্তাকে মলিন করতে পারেনি।

যখন তিনি পূর্ণ পরিপক্বতায় পৌঁছালেন এবং চল্লিশ বছর বয়সে উপনীত হলেন, তখন কুরাইশদের শিরক ও কুফরির প্রতি তাঁর বিরক্তি গভীর হয়ে উঠল। তিনি হেরা গুহায় আশ্রয় নিলেন। সেখানে তিনি আত্মসংযমে নিজেকে গড়ে তুলতেন, হৃদয়কে পবিত্র করতেন, আত্মাকে পরিশুদ্ধ করতেন এবং একাগ্রচিত্তে তাঁর প্রতিপালকের ইবাদতে নিমগ্ন থাকতেন। তিনি আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করতেন এবং শিরকের সব মলিনতা থেকে নিজেকে দূরে রাখতেন।

এই সাধনায় তাঁর হৃদয় ক্রমেই স্বচ্ছ ও নির্মল হয়ে উঠল, অবশেষে সত্য তাঁর কাছে এসে উপস্থিত হলো। কিন্তু সেই ঘটনা ঘটল এমন এক অচেনা ও অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে, যার কোনো অভিজ্ঞতা আগে তাঁর ছিল না, কোনো কথা তিনি আগে শোনেননি। ফলে তিনি নিজের জন্য ভয় অনুভব করলেন। এই ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ এসেছে উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার সেই হাদিসে, যা ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।

পরবর্তীতে যখন সেই ভয় কেটে গেল এবং তাঁর মনে পুনরায় শান্তি ও প্রশান্তি ফিরে এল, তখন তিনি স্মরণ করলেন সেই নূরানী আলোকে, যা প্রথম ওহির সময় হেরা গুহাকে পরিব্যাপ্ত করেছিল। স্মরণ করলেন সেই বরকত ও কল্যাণকে, যা তাঁর পবিত্র অন্তরকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিয়েছিল। সেই মধুর স্বাদ, সেই অনন্য উল্লাস ও আনন্দ হারিয়ে যাওয়ার বেদনাও তিনি অনুভব করলেন।

অবশেষে তিনি নামাজে সান্ত্বনা পেলেন। ধারাবাহিকভাবে ওহি নাজিল হতে লাগল, আর তিনি মানুষকে তাঁর প্রতিপালকের দিকে আহ্বান করতে শুরু করলেন।

কিন্তু তাঁর জাতির পক্ষ থেকে তিনি তীব্র শত্রুতার সম্মুখীন হলেন। তারা নানা অলৌকিক নিদর্শন দাবি করতে শুরু করল। তাদের দাবি ছিল, তারা কখনো ঈমান আনবে না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের চোখে আকাশ থেকে কুরআনের অবতরণ প্রত্যক্ষ করে।

بَلْ يُرِيدُ كُلُّ امْرِئٍ مِّنْهُمْ أَن يُؤْتَىٰ صُحُفًا مُّنَشَّرَةً

“বরং তাদের প্রত্যেকেই চায়, তার কাছে যেন খোলা পত্রসমূহ এনে দেওয়া হয়।”
সূরা আল-মুদ্দাস্সির, আয়াত ৫২

তারা এমন এক ফেরেশতা চেয়েছিল, যে আকাশ থেকে এমন একটি কিতাব নিয়ে আসবে, যা কোনো মানুষের লেখা নয়। কুরআনে এ কথাও এসেছে;

رَسُولٌ مِّنَ اللّٰهِ يَتْلُو صُحُفًا مُّطَهَّرَةً

“আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন রাসূল, যিনি পবিত্র পত্রসমূহ তিলাওয়াত করেন।”
সূরা আল-বাইয়্যিনাহ, আয়াত ২

তাদের এই দাবিগুলোর সারসংক্ষেপ এসেছে আরেক আয়াতে;

وَلَن نُّؤْمِنَ لِرُقِيِّكَ حَتّىٰ تُنَزِّلَ عَلَيْنَا كِتَابًا نَّقْرَؤُهُ

“তুমি আকাশে আরোহণ করলেও আমরা বিশ্বাস করব না, যতক্ষণ না আমাদের জন্য একটি কিতাব অবতীর্ণ কর, যা আমরা পড়তে পারি।”
সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৯৩

এ ধরনের দাবির সঙ্গে আহলে কিতাবের অবস্থাও মিল রয়েছে। তারা বলেছিল;

يَسْأَلُكَ أَهْلُ الْكِتَابِ أَن تُنَزِّلَ عَلَيْهِمْ كِتَابًا مِّنَ السَّمَاءِ فَقَدْ سَأَلُوا مُوسَىٰ أَكْبَرَ مِن ذَٰلِكَ فَقَالُوا أَرِنَا اللّٰهَ جَهْرَةً

“আহলে কিতাব তোমার কাছে চায়, তুমি যেন তাদের জন্য আকাশ থেকে একটি কিতাব অবতীর্ণ করো। অথচ তারা তো মূসার কাছে এর চেয়েও বড় দাবি করেছিল, বলেছিল, আমাদের সামনে প্রকাশ্যে আল্লাহকে দেখাও।”
সূরা আন-নিসা, আয়াত ১৫৩

কিন্তু আল্লাহ তাঁর নবীকে জানিয়ে দিলেন, মানুষের সামনে আকাশ থেকে কুরআন নাজিল হওয়া প্রত্যক্ষ করা কিংবা তাদের হাতে নাজিলকৃত পত্র স্পর্শ করার কোনো প্রয়োজন নেই।

إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ

“নিশ্চয়ই আমি এটি অবতীর্ণ করেছি লাইলাতুল কদরে।”
সূরা আল-কদর, আয়াত ১

এতেই প্রমাণ রয়েছে, কুরআন কোনো নিম্ন জগতের গ্রন্থ নয়; এটি পবিত্র আসমানি জগত থেকে অবতীর্ণ। সেই জগতে একটি বরকতময় রাত রয়েছে, যেখানে প্রতিটি প্রজ্ঞাময় বিষয় নির্ধারিত হয়।

إِنَّا أَنزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُّبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنذِرِينَ ۝ فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ

“নিশ্চয়ই আমি এটিকে অবতীর্ণ করেছি এক বরকতময় রাতে; নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। সেই রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাময় বিষয় নির্ধারিত হয়।”
সূরা আদ-দুখান, আয়াত ৩–৪

এই রাত তোমাদের জগতের রাত নয়। এটি অন্য এক জগতের রাত, যা তোমাদের জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক সময়চক্রের অন্তর্ভুক্ত নয়। সেই রাতেই ভাগ্যলিপি লেখা হয় এবং প্রজ্ঞাময় সিদ্ধান্তসমূহ অবতীর্ণ হয়। আর সেই সব বিষয়ের মধ্যে সর্বোত্তম হলো, কুরআনের অবতরণ।

সূরা কদর এবং সূরা দুখানের এই আয়াত থেকে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝলেন, ঊর্ধ্ব জগতে একটি বরকতময় রাত রয়েছে। সেই রাতে বিষয়সমূহ নির্ধারিত হয় এবং সেখান থেকে বিভিন্ন জগতে অবতীর্ণ হয়। আর কুরআনের অবতরণের সূচনা হয়েছিল সেই বরকতময় রাতেই।

কুরআনে বলা হয়েছে;

لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِّنْ أَلْفِ شَهْرٍ

“লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।”
সূরা আল-কদর, আয়াত ৩

আরবরা “হাজার” শব্দটি দুই অর্থে ব্যবহার করে। এক অর্থ নির্দিষ্ট সংখ্যা, আরেক অর্থ সর্বোচ্চ সংখ্যার রূপক। যেমন—

فَلَبِثَ فِيهِمْ أَلْفَ سَنَةٍ إِلَّا خَمْسِينَ عَامًا

“সে তাদের মধ্যে এক হাজার বছর থেকে পঞ্চাশ বছর কম অবস্থান করেছিল।”
সূরা আল-আনকাবুত, আয়াত ১৪

আরেক স্থানে বলা হয়েছে ;

ثُمَّ يَعْرُجُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ أَلْفَ سَنَةٍ مِّمَّا تَعُدُّونَ

“তারপর তা তাঁর কাছে উঠে যায় এমন এক দিনে, যার পরিমাণ তোমাদের গণনায় এক হাজার বছরের সমান।”
সূরা আস-সাজদাহ, আয়াত ৫

আবার কখনো “হাজার” শব্দটি সর্বোচ্চ সংখ্যার রূপক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়েছে ;

يَوَدُّ أَحَدُهُمْ لَوْ يُعَمَّرُ أَلْفَ سَنَةٍ وَمَا هُوَ بِمُزَحْزِحِهِ مِنَ الْعَذَابِ أَن يُعَمَّرَ

“তাদের কেউ চায়, যদি তাকে হাজার বছর জীবন দেওয়া হতো; অথচ তা তাকে শাস্তি থেকে মুক্ত করতে পারবে না।”
সূরা আল-বাকারা, আয়াত ৯৬

কুরআনের ভাষা থেকে বোঝা যায়—সূরা কদরে “হাজার” দ্বারা অসংখ্য মাস বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ এই মহান রাত নিম্ন জগতের অসংখ্য মাসের চেয়েও উত্তম।

তবে সূরা কদর কিংবা সূরা দুখানের আয়াতে কোথাও বলা হয়নি যে লাইলাতুল কদর রমজান মাসেই হয় বা এটি প্রতি বছর একবার ঘটে।

মক্কা অবস্থায় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাইলাতুল কদর অনুসন্ধানে তেমন মনোযোগ দেননি এবং তাঁর সাহাবিদের কাছেও সেই রাতের নূর ও বরকতের কথা বিশেষভাবে প্রচার করেননি।

অবশেষে হিজরতের দ্বিতীয় বছরে তাঁর ওপর রমজান মাসের রোজা ফরজ করা হলো। তখন নাজিল হলো ;

شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ

“রমজান সেই মাস, যাতে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে।”
সূরা আল-বাকারা, আয়াত ১৮৫

তখন তিনি এই আয়াতকে সূরা কদর ও সূরা দুখানের আয়াতের সঙ্গে মিলিয়ে বুঝলেন, ঊর্ধ্ব জগতের সেই বরকতময় রাতের সঙ্গে রমজান মাসের সম্পর্ক রয়েছে।

এরপর তাঁর অন্তরে আবার জেগে উঠল সেই প্রথম ওহির রাতের নূর ও বরকতের স্মৃতি। তিনি আকুল হয়ে উঠলেন সেই রাতের পুনরাগমনের প্রত্যাশায়।

তিনি বুঝতে পারলেন, সেই রাতের সৌভাগ্য তিনি লাভ করেছিলেন তখনই, যখন তিনি মানুষের ভিড় ও বস্তুজগতের কোলাহল থেকে দূরে হেরা গুহায় নির্জনে অবস্থান করেছিলেন।

আর শরিয়তের বিধানগুলোর মধ্যে সেই অবস্থার সবচেয়ে নিকটবর্তী হলো ইতিকাফ, মসজিদে অবস্থান করা, যেখানে মানুষ দিনরাত কাটায় সম্পূর্ণ বিনয়, আত্মসমর্পণ ও আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তনের অবস্থায়। এতে হৃদয়ের সেই স্বচ্ছতা লাভ হয়, যা সেই নূর ও বরকত লাভের জন্য অপরিহার্য।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রথম দশকে ইতিকাফ করলেন, কিন্তু সেই রাতের সাক্ষাৎ পেলেন না। এরপর দ্বিতীয় দশকেও ইতিকাফ করলেন, তবুও সেই রাত তাঁর সামনে উদ্ভাসিত হলো না। অবশেষে তিনি তৃতীয় দশকে ইতিকাফে বসলেন।

তখন শেষ দশকের কিছু রাত এমনভাবে মিলিত হলো যে, সেই ঊর্ধ্ব জগতের বরকত ও নূরের ধারা নেমে এলো তাঁর মসজিদে ইতিকাফে নিমগ্ন স্বচ্ছ হৃদয়ের মানুষদের অন্তরে। এতে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং বুঝতে পারলেন, আল্লাহ তাঁর আকাঙ্ক্ষার জবাব দিয়েছেন।

তিনি উপলব্ধি করলেন, শেষ দশকের কিছু রাতের সঙ্গে সেই বরকতময় রাত মিলিত হতে পারে। আর যে ব্যক্তি এই সময়ে ইতিকাফ করবে, কিংবা রাতে ইবাদতে দাঁড়াবে, অথবা কোনো সৎকর্মে নিজেকে নিয়োজিত রাখবে, সে তার হৃদয়ের পবিত্রতার পরিমাণ অনুযায়ী সেই রাতের বরকত ও নূরের অংশ লাভ করবে।

তিনি আরও বুঝলেন, এই একটি রাতই এই নিম্ন জগতের অসংখ্য রাতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ, এবং হৃদয়ের নির্মলতা মানুষকে ঊর্ধ্ব জগতের আরও কাছে নিয়ে যায়।

নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় তাঁর সাহাবিরা ইতিকাফ করতেন। তাঁর ইন্তিকালের পরও তাঁরা তা অব্যাহত রাখেন। যুগে যুগে এই উম্মতের নেককার পুরুষ ও নারীরাও ইতিকাফ করে আসছেন এবং সেই বরকতময় রাতের কিছু না কিছু অংশ লাভ করেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন ;
“যে ব্যক্তি ঈমান ও সওয়াবের আশায় লাইলাতুল কদরের রাতে ইবাদতে দাঁড়ায়, তার পূর্বের গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হয়।”

কল্যাণের পথে যে মানুষ এগিয়ে যায়, তার সেই চেষ্টা আল্লাহর কাছে প্রশংসিত হয় এবং বহুগুণ সওয়াব লাভ করে, বিশেষ করে এই বরকতময় রমজান মাসে। আল্লাহ তাআলা বলেন—

وَمَنْ أَرَادَ الْآخِرَةَ وَسَعَى لَهَا سَعْيَهَا وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَأُولَٰئِكَ كَانَ سَعْيُهُم مَّشْكُورًا

“আর যে ব্যক্তি আখিরাত কামনা করে এবং তার জন্য যথাযথ চেষ্টা করে, আর সে মুমিন হয়, তাদের সেই প্রচেষ্টা আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য ও প্রশংসিত।”
সূরা আল-ইসরা, আয়াত ১৯

এই দ্বীনের মূল ভিত্তিই হলো চেষ্টা ও সাধনা। তাই মুমিনদের উচিত দ্রুত সৎকর্মের দিকে অগ্রসর হওয়া, নিজেদের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করা এবং হৃদয়কে পবিত্র করে তোলা।

———

ক্যাটাগরি: তাজকিয়াহ, রামাদান, কোরআন, ইসলামি চিন্তাধারা,

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/4905

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *