بسم الله الرحمن الرحيم.
হে আল্লাহ! তুমি সেই মহান সত্তা, যিনি আসমান ও জমিনে এবং তাদের মাঝখানে অসংখ্য নিদর্শনের মাধ্যমে নিজেকে প্রকাশ করেছ। তোমারই আলোয় সূর্য দীপ্তিময় হয়ে ওঠে, তোমার বিধানেই চাঁদ কখনো ক্ষীণ হিলাল, কখনো পূর্ণিমার উজ্জ্বল চাঁদ হয়ে ঘোরে। আকাশের নক্ষত্র ও গ্রহরাজি তোমার আদেশেই চলমান। সমুদ্র ও নদীর স্রোতে তোমার দানের প্রবাহ বয়ে যায়। ফুল, বৃক্ষ ও ফল তোমার মহিমা গেয়ে ওঠে।
এই বিশ্বজগতের যা প্রকাশ্য এবং যা অদৃশ্য, যা চলমান এবং যা স্থির, সবকিছুই তোমার আদেশে পরিচালিত। তুমি পৃথিবীকে মানুষের জন্য শান্ত বিশ্রামের স্থান বানিয়েছ, পাহাড়কে স্থাপন করেছ দৃঢ় ভিত্তির মতো। তুমি মেঘমালা থেকে প্রবল ধারায় পানি বর্ষণ করো, যার দ্বারা জন্ম নেয় শস্য, উদ্ভিদ ও ঘন সবুজ বাগান। তুমি তাদের রাঙিয়েছ নানা উজ্জ্বল রঙে এবং অলংকৃত করেছ মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্যে।
রাত্রি ও অন্ধকার তোমার প্রশংসা করে। তাদের মধ্যে তুমি দিয়েছ নীরবতা, প্রশান্তি, কখনো উচ্ছ্বাস, কখনো স্থিরতা। ঘন অন্ধকারের বুক চিরে যে ভোরের আলো জন্ম নেয়, সেও তোমারই মহিমা ঘোষণা করে। তুমি বাতাসকে কখনো ঝড়ো, কখনো কোমল করে প্রবাহিত করো; তারা ভারী মেঘমালাকে বহন করে আনে। সেই মেঘের বৃষ্টিতে তুমি মৃত পৃথিবীকে আবার জীবন্ত করে তোল। তখন পৃথিবী সবুজ বাগানের মতো সজীব হয়ে ওঠে, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে স্নিগ্ধতা ও সুগন্ধ। তোমার অনুগ্রহের ধারা আমাদের দিকে একের পর এক নেমে আসে—একটি আসে, আরেকটি অপেক্ষায় থাকে।
আমি যখন তোমার নিয়ামত ও অনুগ্রহ নিয়ে চিন্তা করি, তখন আমার হৃদয় আনন্দে ভরে ওঠে। যখন সেগুলো গভীরভাবে উপলব্ধি করি, তখন আমার দৃষ্টি প্রসারিত হয় এবং জ্ঞান ও বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়। আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস তোমাকে স্মরণ করায়, আমার প্রতিটি চলাফেরা ও স্থিরতা আমাকে তোমার আরও কাছে নিয়ে আসে।
মানুষের হৃদয় কীভাবে পরিবর্তিত হয়? বুদ্ধি কীভাবে বিস্ময়ে থেমে যায়? শিরায় শিরায় রক্ত কীভাবে প্রবাহিত হয়? এসব ভাবতে গিয়ে আমি তোমার জ্ঞান ও ক্ষমতার অসীম সাগরে ডুবে যাই। আমার জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আমি তোমার অনুগ্রহ অনুভব করি। আমার জীবন তো আসলে তোমার দানেরই আরেক নাম; তোমার উদারতা ছাড়া এর কোনো ভরসা নেই। আমি স্বীকার করি তোমার অনুগ্রহ, তোমার দানশীলতা ও তোমার অশেষ দয়া। তোমার পক্ষ থেকে তো আছে কেবল ভালোবাসা ও অনুগ্রহ; আর আমার শত্রু বলতে আছে কেবল আমার নিজের সেই প্রবৃত্তি, যা আমাকে ভুলের দিকে টেনে নেয়।
যখন আমি জন্মগ্রহণ করলাম, তখন তোমার নামই আমার কানে জীবনের প্রথম সুর হয়ে ধ্বনিত হলো। যখন জ্ঞান ও চেতনা পেলাম, তখন তোমার নামই আমার জিহ্বায় ভেসে উঠল। যৌবনে পৌঁছালে তুমি-ই হলে আমার শক্তি ও ভরসা। আর যখন আমি মৃত্যুর পথে যাব, তখন তোমার নামই হবে আমার জন্য অনন্ত জীবনের মধুরতা ও শান্তি।
তোমার নাম ছাড়া আমি কোনো প্রকৃত প্রশান্তি পাইনি। তোমার নাম আমার হৃদয়ে শান্তি এনে দেয়, আমার আত্মাকে প্রশান্ত করে এবং চারপাশের সবকিছুকে প্রাণবন্ত করে তোলে। আসমান ও জমিন তোমার নামেই প্রতিষ্ঠিত। অন্যের প্রশংসা করলে তা অনেক সময় অতিরঞ্জন হয়ে যায়, কিন্তু তোমার প্রশংসা করলে তা সবসময় সত্য হয়—কারণ তোমার মহিমা বর্ণনা করতে গিয়ে কেউ অতিরঞ্জিত হয় না। চাঁদ পূর্ণ হয়ে উঠলেও একসময় তার আলো ম্লান হয়, কিন্তু তোমার মহিমা কখনো ম্লান হয় না।
আমি নশ্বর, আর সমস্ত সৃষ্টিই একদিন বিলীন হবে; কেবল তুমি চিরস্থায়ী। আমি যে রঙ দেখি তা একদিন মুছে যাবে, যে সুগন্ধ অনুভব করি তা একদিন বিলীন হবে, যে সৌন্দর্য দেখি তা একদিন ক্ষণস্থায়ী স্বপ্নে পরিণত হবে। এই দুনিয়া তো ক্ষণস্থায়ী—এর জীবন সামান্য ভোগমাত্র। একটি বাসনা শেষ না হতেই আরেকটি জন্ম নেয়। আমার মুক্তি কেবল তোমার স্মরণেই। যখনই আমি মনকে শান্ত করতে চাই, তখন তোমার নামই আমার ব্যথার ওষুধ এবং আমার প্রয়োজনের আরোগ্য।
কখনো আমি নিজের অহংকারে বিভোর হয়ে পড়ি, নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারি না। তখন তোমার রহমত আমার চোখে আমার ত্রুটিগুলো স্পষ্ট করে দেয়, ফলে আমি আবার সঠিক পথে ফিরে আসি। কখনো অহংকার আমাকে আচ্ছন্ন করে, তখন তুমি আমার দুর্বলতার মাধ্যমে আমাকে পরীক্ষা করো এবং সেই অহংকার ভেঙে দাও। এরপর আবার তোমার কোমল অনুগ্রহে আমার ভাঙা হৃদয় জোড়া লাগিয়ে দাও—যেমন দূরের মেঘ এসে শুষ্ক ভূমিতে বৃষ্টি বর্ষণ করে।
কখনো অসতর্কতা আমাকে গ্রাস করে; আমি ভুলে যাই জীবনের উদ্দেশ্য, তুচ্ছ বিষয় নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। তখন তুমি আমার অন্তরে ভয় জাগিয়ে দাও, মৃত্যু ও পরিণতির কথা স্মরণ করিয়ে দাও। ফলে আমি আবার আমার অবহেলা থেকে ফিরে এসে সঠিক পথে চলতে শুরু করি।
কখনো হতাশা আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। মনে হয় সময় যেন অন্তহীন কষ্টের বোঝা। দুশ্চিন্তা যেন শেষ হয় না, সব পথ যেন বন্ধ হয়ে যায়। তখন তুমি আমার অন্তরে আশা জাগিয়ে দাও—কারণ শেষ পর্যন্ত সব আশার পথ তোমার দিকেই গিয়ে মেলে।
আমি অনেক কিছু নিজ প্রচেষ্টায় পেতে চাই, কিন্তু তা পাই না। অথচ যখন তোমার দিকে ফিরে আসি, তখন এমন জায়গা থেকেও তা পেয়ে যাই, যেখানে কোনো আশা ছিল না। জীবনের কঠিন সময়ে আমি যখন তোমার কাছে প্রার্থনা করেছি, তুমি সেই কষ্ট সহজ করে দিয়েছ। আমি তোমার অবাধ্যতা করি, আর তুমি ধৈর্য ধারণ করো। তোমার মতো এত উদার ও ক্ষমাশীল আর কেউ নেই। তোমার দান সীমাহীন, তোমার অনুগ্রহ অপরিমেয়। তুমি এমন দান করো, যা মানুষের কল্পনাকেও অতিক্রম করে। তোমার দানে নেই কোনো অহংকার, নেই কোনো কার্পণ্য। মানুষ ও জিন—উভয়েই এর সাক্ষী।
তোমার অনুগ্রহ আমার জীবনকে নতুন করে তোলে, আমার মর্যাদা বাড়িয়ে দেয়। হে আমার প্রতিপালক! আমাকে এমন তাওফিক দাও যেন আমি হালাল উপার্জনে সংযম ও সততার সাথে জীবনযাপন করি এবং তোমার নির্ধারিত অংশে সন্তুষ্ট থাকি। প্রতিদিন তুমি আমাকে যে অনুগ্রহ দাও, তার সামান্য অংশের জন্যও আমার কৃতজ্ঞতা যথেষ্ট নয়।
আমার দিন ভয়ে ভরা, আমার রাত গভীর অন্ধকারের মতো। জীবনের বিপদ থেকে কোথাও আশ্রয় খুঁজে পাই না। আমার সব আশা যেন হারিয়ে গেছে। হে আমার প্রতিপালক! আমার কাছে তো আছে কেবল পাপ ও ভুলে ভরা জীবন। জীবনের বাজারে আমার কোনো মূল্য নেই। তবুও আমি তোমার দয়ার আশায় তাকিয়ে থাকি।
আমার ভুল ও বিচ্যুতির কোনো অজুহাত নেই। আমার হাতে নেই কোনো উপায়—তুমি ছাড়া আমার কোনো অবলম্বন নেই। হে আল্লাহ! আমি গভীর অনুতাপ নিয়ে তোমার কাছে ফিরে এসেছি। বাইরে শান্ত থাকার চেষ্টা করি, কিন্তু আমার অন্তর অস্থিরতায় ভরা। তোমার পক্ষ থেকে তো আছে কেবল ক্ষমা, মার্জনা ও দয়া। তাই আমাকে ক্ষমা করো, আমাকে মার্জনা করো, আমার প্রতি দয়া করো। আমার জীবনে আবার শান্তি ফিরিয়ে দাও, আমার হৃদয়ে প্রশান্তি দান করো। তোমার একটি অনুগ্রহের সঙ্গে আরেকটি অনুগ্রহ যুক্ত করে দাও—কারণ পরপর জোড়া মুক্তায় মালা যেমন সুন্দর হয়, তেমনি অনুগ্রহের ধারাও জীবনকে সুন্দর করে তোলে।
হে আমার প্রতিপালক! আমার দিকে দৃষ্টি দাও, আমাকে অনুগ্রহে ভরিয়ে দাও। তোমা থেকে দূরে গেলে আমার জীবন নিরস হয়ে যায়, আর তোমার কাছে ফিরে এলে তা আবার অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠে। তোমার ভালোবাসা নির্মল ও বিশুদ্ধ; মানুষের ভালোবাসা মিশ্রিত ও অস্থায়ী। কোনো নিয়ামত দেরিতে এলেও তাতে আমার ক্ষতি নেই—কারণ আমার রব এমন, যার অনুগ্রহকে কেউ ঠেকাতে পারে না এবং যার দয়ার পথ কেউ বন্ধ করতে পারে না।
মানুষ কখনো বিপদকে বড় করে দেখে, আর নিয়ামতকে ভুলে যায়। কিন্তু তুমি-ই আমাদের আশা, তুমি-ই আমাদের ভরসা—যখন সব আশা ব্যর্থ হয় এবং সব প্রত্যাশা মিথ্যা হয়ে যায়।
হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে প্রার্থনাকারী, তোমার অনুগ্রহপ্রার্থী। তুমি সেই মহান সত্তা, যিনি প্রার্থনাকারীকে ফিরিয়ে দাও না এবং সাহায্যপ্রার্থীকে ব্যর্থ করো না। হে সেই সত্তা, যিনি চাওয়ার আগেই দান করো, ক্ষমা প্রার্থনার আগেই দয়া করো, আর প্রতিশ্রুতির আগেই তোমার অনুগ্রহ পৌঁছে যায়—আমাকে ক্ষমা করো, আমাকে মাফ করো, আমার প্রতি দয়া করো।
তোমার ক্ষমা কতই না মধুর! তোমার ক্ষমাই কত সুন্দর আশ্রয়।
————–
ক্যাটাগরি : দোয়া, তাজকিয়াহ, ইসলামি চিন্তাধারা,
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/2126