|২৫|০১|২০২৬|
আর্থিক লেনদেন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা এবং পারিবারিক ভরণপোষণ সংক্রান্ত বিষয়গুলো ইসলামী ফিকহে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো মানুষের জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ও বাস্তব দিকগুলোর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। এখানে একদিকে রয়েছে শরিয়তের বিধান, কুরআন-সুন্নাহর নির্দেশনা ও ফিকহি নীতিমালা, আর অন্যদিকে রয়েছে মানুষের বাস্তব জীবন, তার দুর্বলতা ও সমাজের বাস্তব চাহিদা। এই কারণেই লাইফ ইন্স্যুরেন্সের মতো একটি বিষয়কে কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি হিসেবে হালকাভাবে বিচার করা যায় না, আবার কয়েকটি ফিকহি পরিভাষার ওপর ভর করে তড়িঘড়ি চূড়ান্ত ফতোয়া দিয়ে দেওয়াও জ্ঞানগত সততা ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। এই বিষয়ে সঠিক উপলব্ধি তখনই সম্ভব, যখন একে উসুলে ফিকহ, সামগ্রিক নীতিমালা, বিধানের কার্যকারণ এবং মাকাসিদুশ শরিয়ার বিস্তৃত প্রেক্ষাপটে রেখে পর্যালোচনা করা হয়।
ইসলামী ফিকহে লেনদেন অধ্যায়ের সূচনা হয় একটি সুপ্রতিষ্ঠিত ও সর্বসম্মত নীতির মাধ্যমে, যা ফকিহগণ কিতাব ও সুন্নাহর গভীর পর্যবেক্ষণ থেকে গ্রহণ করেছেন।
লেনদেনে মূলনীতি হলো বৈধতা ও অনুমোদন।
এর অর্থ হলো, ক্রয়-বিক্রয়, চুক্তি, আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক উদ্যোগ নিজ স্বভাবেই নিষিদ্ধ নয়; যতক্ষণ না এর মধ্যে এমন কোনো উপাদান পাওয়া যায়, যা কোনো স্পষ্ট দলিল, সর্বসম্মত নীতি বা শরিয়তের মৌলিক নৈতিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। ইসলামী শরিয়তে নিষেধাজ্ঞা কখনো খেয়ালখুশিভিত্তিক আরোপ করা হয় না; বরং তা আরোপিত হয় স্পষ্ট কোনো ক্ষতি প্রতিরোধের জন্য, জুলুমের পথ বন্ধ করতে, কিংবা মানবসমাজকে নৈতিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে। এ কারণেই ফকিহগণ সবসময় এই প্রশ্নটি উত্থাপন করেন, কোনো লেনদেনে নিষেধের কারণটি কী, এবং সেই কারণটি বাস্তবেই ও প্রধানভাবে সেখানে বিদ্যমান কি না।
যখন আলেমসমাজ প্রচলিত বাণিজ্যিক ইন্স্যুরেন্স, বিশেষত লাইফ ইন্স্যুরেন্সকে সাধারণভাবে অবৈধ বলে আখ্যায়িত করেন, তখন এর উদ্দেশ্য কখনোই এই নয় যে আর্থিক নিরাপত্তা, পারস্পরিক সহযোগিতা কিংবা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ধারণা শরিয়তবিরোধী। বাস্তবে ইসলামী শরিয়ত নিজেই পারস্পরিক সহায়তা, সামাজিক দায়িত্ব ও দুর্বল শ্রেণির সুরক্ষাকে একটি মহান নৈতিক মূল্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। বরং আপত্তি ওঠে সেই নির্দিষ্ট উপাদানগুলোর বিরুদ্ধে, যা সাধারণত প্রচলিত ইন্স্যুরেন্স চুক্তিগুলোতে বিদ্যমান থাকে এবং যেগুলোকে ফিকহি পরিভাষায় বলা হয়, গরর, মাইসির ও রিবা।
ঘরার বলতে বোঝায় এমন তীব্র ও অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা, যা চুক্তির মূল বিনিময়কেই সন্দেহের মধ্যে ফেলে দেয়। ইসলামী ফিকহ স্বীকার করে যে দুনিয়ার কোনো কাজেই শতভাগ নিশ্চিত জ্ঞান সম্ভব নয়; তাই সামান্য ও অনিবার্য অনিশ্চয়তা ক্ষমাযোগ্য। কিন্তু যখন এই অনিশ্চয়তা এমন পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে পক্ষদ্বয়ের কেউই স্পষ্টভাবে জানে না, তারা আসলে কোন কিছুর বিনিময়ে কোন কিছুর জন্য বাধ্য হচ্ছে, তখন শরিয়ত একে জুলুম ও বিরোধের দুয়ার হিসেবে চিহ্নিত করে। প্রচলিত লাইফ ইন্স্যুরেন্সে বীমাগ্রহীতা বছরের পর বছর কিস্তি পরিশোধ করে, অথচ তার জানা থাকে না বীমাকৃত ঘটনা কবে ঘটবে, আদৌ ঘটবে কি না, কিংবা শেষ পর্যন্ত সে কতটুকু আর্থিক সুবিধা লাভ করবে। এভাবে পুরো চুক্তির ভিত্তিই দাঁড়িয়ে থাকে এক অনির্ধারিত ভবিষ্যতের ওপর। এই ধরনের লেনদেন থেকেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিষেধ করেছেন। এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা হলো, গরর শত্রুতা, বিরোধ, শোষণ এবং অন্যায়ভাবে লাভবান হওয়ার পথ খুলে দেয়, যা শরিয়তের ন্যায় ও কল্যাণভিত্তিক ব্যবস্থার পরিপন্থী।
ঘরারের পাশাপাশি মাইসিরের উপাদানটিও এই আলোচনায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মাইসির বলতে বোঝায় এমন আর্থিক লাভ, যা প্রকৃত পরিশ্রম, উৎপাদন বা ন্যায্য বিনিময়ের ফল নয়; বরং কেবল কাকতালীয় ঘটনা, ভাগ্য বা দুর্ঘটনার ওপর নির্ভরশীল। যদিও ইন্স্যুরেন্স বাহ্যিকভাবে জুয়ার বিনোদনমূলক রূপ নয়, তবুও এর কাঠামোর গভীরে একই নীতি কাজ করে, যেখানে এক পক্ষ অস্বাভাবিক লাভ অর্জন করতে পারে, আর অন্য পক্ষ তার পরিশোধিত অর্থের বিপরীতে কিছুই নাও পেতে পারে। কুরআন মাজিদ এই মানসিকতা ও ব্যবস্থাকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে, কারণ এটি সমাজে অনুৎপাদনশীল সম্পদের প্রবাহ এবং নৈতিক উদাসীনতাকে উৎসাহিত করে।
এ ছাড়াও অধিকাংশ লাইফ ইন্স্যুরেন্স পলিসিতেই কোনো না কোনোভাবে সুদের উপাদান যুক্ত থাকে, কখনো নিশ্চিত মুনাফার প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে, আবার কখনো কিস্তির অর্থ সুদভিত্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করার ফলে। সুদের নিষেধাজ্ঞা কেবল একটি ফিকহি কৌশল নয়; এর পেছনে রয়েছে গভীর নৈতিক ও সামাজিক প্রজ্ঞা। সুদ এমন এক ব্যবস্থা গড়ে তোলে, যেখানে ঝুঁকি ও শ্রম ছাড়াই মুনাফাকে নিশ্চিত করা হয়, আর এর ফলে সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও তীব্র ও প্রোথিত হয়। এই কারণেই আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, তিনি ক্রয়-বিক্রয়কে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন। ফকিহদের দৃষ্টিতে যেখানে সুদ বিদ্যমান, সেখানে মূল বিধান হলো নিষেধাজ্ঞা; কেবল তখনই ব্যতিক্রম হতে পারে, যখন প্রকৃত ও অনিবার্য প্রয়োজন প্রমাণিত হয়।
এই সব কারণের ভিত্তিতেই অধিকাংশ ফকিহ এবং আন্তর্জাতিক ফিকহি প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিমত হলো, প্রচলিত বাণিজ্যিক ইন্স্যুরেন্স নীতিগতভাবে অবৈধ, বিশেষত যখন তা আরাম, লাভলাভ বা জল্পনা-কল্পনার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা হয়। তবে এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য, ইসলামী শরিয়ত কেবল নিষেধাজ্ঞার সমষ্টি নয়; বরং এটি এমন এক পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যেখানে মানবজীবনের সুরক্ষা, স্বাচ্ছন্দ্য ও মর্যাদাকে মৌলিক গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
শরিয়তের এক মহান নীতি হলো, চরম প্রয়োজন বা অনিবার্য জরুরতের সময় কিছু নিষিদ্ধ বিষয়ে সীমিত পরিসরে অবকাশ দেওয়া যায়। ফকিহগণ এই নীতিকে এভাবে ব্যক্ত করেছেন, জরুরত নিষিদ্ধকে বৈধ করে দেয়, এবং প্রয়োজন কখনো কখনো জরুরতের মর্যাদা পায়, তা সাধারণ হোক বা বিশেষ। এই নীতিগুলো কোনো আইনি কৌশল বা ছাড় নয়; বরং এটাই শরিয়তের সেই মৌলিক দর্শনের প্রকাশ যে, দ্বীন মানুষের ওপর অসহনীয় বোঝা চাপানোর জন্য আসেনি। কুরআন নিজেই ঘোষণা করেছে, দ্বীনের ব্যাপারে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করা হয়নি। আর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইসলামী আইনের আত্মাকে সংক্ষেপে তুলে ধরেছেন এই বাক্যে, ক্ষতি করা যাবে না, ক্ষতির জবাবও ক্ষতি দিয়ে দেওয়া যাবে না।
লাইফ ইন্স্যুরেন্সের ক্ষেত্রে প্রকৃত প্রয়োজন তখনই সৃষ্টি হয়, যখন কোনো পরিবারের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের আশঙ্কা স্পষ্ট, নিকটবর্তী ও গুরুতর হয়ে ওঠে। যেমন— স্বামী যদি একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি হন, স্ত্রীর কোনো স্থায়ী আয়ের উৎস না থাকে, অপ্রাপ্তবয়স্ক সন্তানরা সম্পূর্ণভাবে তার ওপর নির্ভরশীল হয়, এবং বাসস্থান বা মৌলিক চাহিদা ঘিরে বড় ধরনের আর্থিক দায়িত্ব বর্তমান থাকে। এমন পরিস্থিতিতে উপার্জনকারীর আকস্মিক মৃত্যু কেবল সাময়িক কষ্ট নয়; বরং পরিবারের জীবন, সম্মান ও স্থিতিশীলতার জন্য মারাত্মক হুমকিতে পরিণত হতে পারে। এই ক্ষতি প্রতিরোধ করাই শরিয়তের প্রকৃত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কারণ তা জীবন রক্ষা, বংশ রক্ষা ও সম্পদ সংরক্ষণের মতো মৌলিক উদ্দেশ্যের অন্তর্ভুক্ত।
অতএব, যদি শরিয়তসম্মত বিকল্প, যেমন তাকাফুল, যুক্তিসংগত সঞ্চয় বা শক্তিশালী পারিবারিক সহায়তা, বাস্তবে বিদ্যমান না থাকে, তবে প্রয়োজনের সীমার মধ্যে লাইফ ইন্স্যুরেন্সের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। তবে এই অনুমতি সর্বব্যাপী বা স্থায়ী নয়; বরং এই নীতির অধীন, জরুরতের কারণে যা বৈধ হয়, তা তার পরিমাণেই সীমাবদ্ধ থাকবে। নিয়ত হতে হবে কেবল পরিবারকে ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করা, মুনাফা বা অতিরিক্ত আর্থিক সুবিধা অর্জন নয়; আর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে এই সিদ্ধান্ত নতুন করে পর্যালোচনা করাও অপরিহার্য।
সবশেষে এটাও স্পষ্ট থাকা উচিত, যদি কোনো ইন্স্যুরেন্স মডেল সত্যিই ঘরার, মাইসির ও সুদমুক্ত হয়, যেমন কিছু সমবায় বা তাকাফুলভিত্তিক ব্যবস্থা, তবে তার বৈধতা নিয়ে আর কোনো শরিয়তসম্মত সংশয় থাকে না। ইসলামী শরিয়ত সুরক্ষাকে হারাম করেনি, পরিকল্পনাকেও নিষিদ্ধ করেনি; নিষেধাজ্ঞা কেবল সেই নৈতিক ও অর্থনৈতিক বিকৃতির বিরুদ্ধে, যা মানুষ ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর।
ফলে সারকথা এই, প্রচলিত লাইফ ইন্স্যুরেন্স নীতিগতভাবে অবৈধ হলেও, শরিয়তের প্রশস্ততা, রহমত ও মানবকল্যাণের দৃষ্টিতে প্রকৃত প্রয়োজন বা চরম জরুরতের ক্ষেত্রে, বিশেষত পরিবারের কল্যাণ ও টিকে থাকার স্বার্থে, প্রয়োজনের সীমার মধ্যে এর অবকাশ দেওয়া ফিকহি নীতিমালা, মাকাসিদুশ শরিয়াহ এবং ইসলামী আইনের করুণাময় আত্মার সঙ্গে সম্পূর্ণ সঙ্গতিপূর্ণ।
————-
ক্যাটাগরি : ফিকাহ, ইসলামি চিন্তাধারা, ফাতাওয়া
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8276