|২৪| জানুয়ারি| ২০২৬|
❖ প্রশ্ন
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
শায়েখ, এর আগে আমি যে প্রশ্নগুলো করেছিলাম, সেগুলোর বিস্তারিত উত্তরের জন্য আপনাকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আমি সেগুলো কমিউনিটির অনেকের সঙ্গে শেয়ার করেছি, এবং আলহামদুলিল্লাহ সেগুলো বহু ইসলামি বিষয়ে বিদ্যমান বিভ্রান্তি দূর করতে এবং নানা উদ্বেগের সমাধান করতে অত্যন্ত সহায়ক হয়েছে। আল্লাহ তাআলা আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন।
এখন আমার আরেকটি প্রশ্ন রয়েছে, যে বিষয়ে আপনার দিকনির্দেশনা পেলে কৃতজ্ঞ থাকব। আর্থিক খাতে কর্মরত এক তরুণী বোন আমার কাছে লাইফ ইনশুরেন্স বিষয়ে জানতে চেয়েছেন। তাকে সঠিকভাবে পথনির্দেশ দেওয়ার উদ্দেশ্যেই আমি বিষয়টি পরিষ্কারভাবে জানতে চাইছি। আপনার ধারাবাহিক সহায়তার জন্য আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।
আমার প্রশ্নগুলো হলো :
লাইফ ইনশুরেন্স কি ইসলামে নিষিদ্ধ, যদিও সেই পলিসি সুদভিত্তিক না হয়? অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্বামীর মৃত্যু হলে পরিবার লাইফ ইনশুরেন্সের অর্থ দিয়ে বাড়ির মর্টগেজ পরিশোধ করে কিংবা সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন করে, বিশেষ করে যখন স্ত্রী উপার্জনশীল নন। এই ধরনের প্রয়োজন কি শরঈ হুকুমের ওপর কোনো প্রভাব ফেলে?
আর কিছু লাইফ ইনশুরেন্স পলিসি আছে, যেখানে প্রিমিয়ামের অর্থ সুদভিত্তিক খাতে নয়; বরং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা হয়, এবং সেই ফান্ড নির্বাচন করেন পলিসিধারী নিজেই। যদি এতে সুদ না থাকে, তাহলে কি এই ধরনের পলিসি বৈধ বলে গণ্য হবে?
এই বিষয়ে আপনার দিকনির্দেশনার অপেক্ষায় রইলাম।
= মাওলানা মুহাম্মদ সিরাজুদ্দিন নাদভী
❖ উত্তর
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার আন্তরিকতা, গভীর মনোযোগপূর্ণ প্রশ্ন এবং শরিয়তের সঠিক নীতিমালার আলোকে অন্যদের পথনির্দেশ করার আগ্রহের জন্য আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আর্থিক বিষয়, নিরাপত্তা এবং পারিবারিক কল্যাণসংক্রান্ত প্রশ্নগুলো বিশেষ যত্নের দাবি রাখে, কারণ এগুলো শরঈ বিধান, নৈতিক উদ্দেশ্য এবং বাস্তব মানবিক অসহায়তার সংযোগস্থলে অবস্থান করে। সে কারণেই লাইফ ইনশুরেন্সের মতো বিষয়কে কেবল বিচ্ছিন্ন কিছু নিষেধাজ্ঞার আলোকে বিচার করা যথেষ্ট নয়; বরং ইসলামী আইনের সামগ্রিক কাঠামো, তার মূলনীতি এবং উচ্চতর উদ্দেশ্যের আলোকে বিষয়টি অনুধাবন করা জরুরি।
ইসলামী ফিকহে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত মূলনীতি হলো, লেনদেনের ক্ষেত্রে মূল বিধান হচ্ছে বৈধতা। অর্থাৎ আর্থিক চুক্তিসমূহ নীতিগতভাবে বৈধ, যতক্ষণ না তাতে এমন কোনো উপাদান থাকে যা শরিয়তের সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞার পরিপন্থী, অথবা তার নৈতিক ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শরিয়ত নির্বিচারে কোনো লেনদেন নিষিদ্ধ করে না; বরং অর্থনৈতিক জীবনে জুলুম, শোষণ, ক্ষতি এবং নৈতিক অবক্ষয় প্রতিরোধ করাই তার উদ্দেশ্য।
যখন আলেমগণ বলেন যে বাণিজ্যিক ইনশুরেন্স, যার মধ্যে প্রচলিত লাইফ ইনশুরেন্সও অন্তর্ভুক্ত, সাধারণভাবে বৈধ নয়, তখন এর দ্বারা তারা পারস্পরিক সুরক্ষা বা আর্থিক পরিকল্পনার ধারণাকেই অবৈধ ঘোষণা করতে চান না। বরং এই নিষেধাজ্ঞা সংশ্লিষ্ট হয় কিছু নির্দিষ্ট উপাদানের সঙ্গে, যা সাধারণত এই ধরনের চুক্তিতে বিদ্যমান থাকে। সেগুলো হলো গরর (ধোকা), জুয়া মাইসির এবং সুদ (রিবা)। এই উপাদানগুলো কেন নিষিদ্ধ, তা অনুধাবন করা হুকুমের প্রকৃতি ও সীমা বোঝার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গরর বলতে এমন অতিরিক্ত অনিশ্চয়তাকে বোঝায়, যা কোনো চুক্তির মূল বিনিময়কেই অনির্দিষ্ট করে তোলে। ইসলামী আইন সামান্য বা অনিবার্য অনিশ্চয়তা অনুমোদন করে, কিন্তু গুরুতর গরর নিষিদ্ধ করে, কারণ তা অধিকার ও দায়দায়িত্বের বিষয়ে গভীর অস্পষ্টতা সৃষ্টি করে। প্রচলিত লাইফ ইনশুরেন্সে দেখা যায়, পলিসিধারী দীর্ঘ সময় ধরে প্রিমিয়াম পরিশোধ করেন, অথচ তিনি জানেন না বিমাকৃত ঘটনাটি আদৌ ঘটবে কি না, কখন ঘটবে, কিংবা শেষ পর্যন্ত ঠিক কতটুকু সুবিধা পাওয়া যাবে। ফলে পুরো চুক্তিটিই এমন এক ভবিষ্যৎ ঘটনার ওপর নির্ভরশীল থাকে, যা কখনো নাও ঘটতে পারে। এ কারণেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ধরনের লেনদেন নিষিদ্ধ করেছেন। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে যে তিনি গররযুক্ত বিক্রয় থেকে নিষেধ করেছেন। এই নিষেধাজ্ঞার অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা হলো বিবাদ, শোষণ এবং অন্যায়ভাবে সম্পদ অর্জনের পথ রুদ্ধ করা।
গররের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত আরেকটি উপাদান হলো মাইসির। মাইসির বলতে বোঝায় উৎপাদনশীল পরিশ্রম বা ন্যায্য বিনিময়ের পরিবর্তে কেবল সুযোগ বা অনিশ্চয়তার ভিত্তিতে সম্পদ অর্জন করা। যদিও ইনশুরেন্স বিনোদনমূলক অর্থে জুয়া নয়, তবু কাঠামোগত দিক থেকে এতে সাদৃশ্য রয়েছে। কারণ এখানে এক পক্ষ কেবল একটি অনিশ্চিত ঘটনার সংঘটনের ফলে অসমানুপাতিকভাবে বড় লাভ পেতে পারে, আর অপর পক্ষ কোনো সমমূল্যের প্রতিদান না পেয়েই ক্ষতির সম্মুখীন হতে পারে। কুরআন এ ধরনের ব্যবস্থাকে নিন্দা করেছে, কারণ এতে প্রকৃত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ঝুঁকিনির্ভর সম্পদ স্থানান্তরকে স্বাভাবিক করে তোলা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, হে ঈমানদারগণ, নিশ্চয়ই মদ, জুয়া, মূর্তি এবং ভাগ্য নির্ণয়ের তীর, এসব শয়তানের কাজের অন্তর্ভুক্ত অপবিত্র বস্তু। সুতরাং এগুলো থেকে দূরে থাকো।
এর পাশাপাশি, বহু লাইফ ইনশুরেন্স পলিসিতে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রিবা বিদ্যমান থাকে। প্রিমিয়ামের অর্থ সুদভিত্তিক খাতে বিনিয়োগ করার মাধ্যমেই তা ঘটে। রিবা কেবল একটি কারিগরি নিষেধাজ্ঞা নয়; বরং তা নিষিদ্ধ, কারণ এটি অন্যায়কে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়, ঝুঁকিহীন লাভ নিশ্চিত করে এবং ইসলামী অর্থনীতির কাঙ্ক্ষিত নৈতিক ভারসাম্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আল্লাহ তাআলা সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, আল্লাহ ব্যবসাকে বৈধ করেছেন এবং রিবাকে হারাম করেছেন। যেখানে রিবা বিদ্যমান থাকে, সেখানে কঠোরতম প্রয়োজনের শর্ত ছাড়া বৈধতার কথা বলা যায় না।
এই সব কারণ একত্রে বিবেচনা করে বহু জ্যেষ্ঠ আলেম এবং আন্তর্জাতিক ফিকহ কাউন্সিলসমূহ সাধারণ নীতি হিসেবে প্রচলিত বাণিজ্যিক ইনশুরেন্সকে অবৈধ বলে রায় দিয়েছেন, বিশেষ করে যখন তা কেবল সুবিধা, লাভ বা অনুমাননির্ভর সুবিধা অর্জনের উদ্দেশ্যে গ্রহণ করা হয়, প্রকৃত ক্ষতি থেকে সুরক্ষার প্রয়োজন থেকে নয়।
একই সঙ্গে এটিও সত্য যে ইসলামি আইন কোনো কঠোর ব্যবস্থা নয়, যা বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। বরং এটি একটি নৈতিক ও আইনগত কাঠামো, যার লক্ষ্য মানুষের মৌলিক স্বার্থ সংরক্ষণ করা এবং কষ্ট ও সংকট দূর করা। শরিয়তের একটি গভীর দিক হলো এই স্বীকৃতি যে চরম প্রয়োজন বা তীব্র সংকটের ক্ষেত্রে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা যেতে পারে। এই নীতিটি একটি মৌলিক সূত্রে প্রকাশিত হয়েছে, প্রয়োজন নিষিদ্ধ বিষয়কে বৈধ করে তোলে। এর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত আরেকটি নীতি হলো, তীব্র প্রয়োজনকে প্রয়োজনের মর্যাদায় গণ্য করা হয়, তা সাধারণ হোক বা বিশেষ।
এই নীতিগুলো কোনো ফাঁকফোকর নয়; বরং শরিয়তের উচ্চতর নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরই প্রকাশ। এগুলো এই বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে যে আইন মানুষের কল্যাণের জন্য প্রণীত, মানুষের ওপর অসহনীয় কষ্ট চাপিয়ে দেওয়ার জন্য নয়। আল্লাহ তাআলা এ সত্যটি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, তিনি দ্বীনের মধ্যে তোমাদের ওপর কোনো সংকীর্ণতা আরোপ করেননি। একইভাবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সার্বজনীন আইনগত নীতি স্থাপন করেছেন, যখন তিনি বলেছেন, কোনো ক্ষতি করা যাবে না, আবার ক্ষতির প্রতিদান হিসেবেও ক্ষতি করা যাবে না।
লাইফ ইনশুরেন্সের প্রেক্ষাপটে কখনো কখনো এমন প্রকৃত প্রয়োজন দেখা দিতে পারে, যেখানে একটি পরিবারের আর্থিক বিপর্যয় পূর্বানুমেয় এবং গুরুতর ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে সেই অবস্থায়, যখন স্বামীই পরিবারের একমাত্র উপার্জনকারী, স্ত্রী কর্মজীবী নন এবং তাঁর কোনো স্বতন্ত্র আয় নেই, ছোট সন্তানরা পুরোপুরি নির্ভরশীল, আর বাড়ির মর্টগেজ বা নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচের মতো বড় দায়সমূহ বকেয়া রয়ে গেছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে উপার্জনকারীর মৃত্যু কেবল সাময়িক অসুবিধা সৃষ্টি করে না; বরং নির্ভরশীলদের জন্য চরম ক্ষতি, অস্থিরতা এবং মর্যাদাহানির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এই ধরনের ক্ষতি প্রতিরোধ করা শরিয়তের পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ, বিশেষ করে জীবন সংরক্ষণ, পরিবার সংরক্ষণ এবং সুরক্ষামূলক অর্থে সম্পদ সংরক্ষণের মৌলিক উদ্দেশ্যের সঙ্গে।
সুতরাং, যদি সমবায়ভিত্তিক তাকাফুল, পর্যাপ্ত সঞ্চয় বা পারিবারিক সহায়তার মতো শরিয়তসম্মত বিকল্পগুলো বাস্তবসম্মতভাবে বিদ্যমান না থাকে, তাহলে প্রয়োজনের পরিসরে লাইফ ইনশুরেন্সে অংশগ্রহণের অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। তবে এই অনুমতি শর্তহীন নয়; বরং এটি একটি সুপ্রতিষ্ঠিত সূত্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যা প্রয়োজনের কারণে বৈধ করা হয়, তা প্রয়োজনের সীমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। উদ্দেশ্য হতে হবে ক্ষতি থেকে সুরক্ষা লাভ, লাভ বা অনুমাননির্ভর সুবিধা অর্জন নয়। আর পরিস্থিতি পরিবর্তিত হলে কিংবা বৈধ বিকল্প সহজলভ্য হয়ে উঠলে এই ব্যবস্থাটি পুনর্মূল্যায়ন করা আবশ্যক।
এটি স্পষ্টভাবে বলা উচিত যে, যদি কোনো ইনশুরেন্স মডেল প্রকৃতপক্ষে গরর, মাইসির এবং রিবা এড়িয়ে চলে, তাহলে এর বৈধতা নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কারণ শরিয়ত নিজে সুরক্ষা, পারস্পরিক সহযোগিতা বা পরিকল্পনার ধারণাকে নিষিদ্ধ করে না। চ্যালেঞ্জটি হলো, অধিকাংশ প্রচলিত লাইফ ইনশুরেন্স পলিসি, এমনকি যেগুলো শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের সঙ্গে যুক্ত, বাস্তবে খুব কম ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত অনিশ্চয়তা এবং কাঠামোগত ভারসাম্যহীনতা থেকে মুক্ত থাকে।
সংক্ষেপে, যেসব লাইফ ইনশুরেন্সে গরর, মাইসির বা রিবা বিদ্যমান, সেগুলো নীতিগতভাবে অবৈধ। তবে যেখানে এই উপাদানগুলো প্রকৃতপক্ষে অনুপস্থিত, সেখানে বৈধতা স্পষ্ট। এছাড়া, প্রকৃত প্রয়োজন বা তীব্র সংকটের ক্ষেত্রে, বিশেষ করে স্ত্রী, সন্তান বা অন্য নির্ভরশীলদের কল্যাণ গুরুতর ঝুঁকিতে থাকলে, এমন ইনশুরেন্স প্রয়োজনীয় পরিসরে অনুমোদিত হতে পারে, প্রতিষ্ঠিত আইনগত সূত্র, নৈতিক উদ্দেশ্য এবং শরিয়তের দয়া ও মমত্ববোধের সর্বজনীন নীতির আলোকে।
————–
ক্যাটাগরি : ফাতাওয়া, ফিকাহ, ইসলামি চিন্তাধারা, উপদেশ
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8267