শিরোনাম : রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নামাজের বর্ণনা
——————–
তারা বলল: আমাদের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নামাযের বর্ণনা এমনভাবে দিন, যেন তা আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়, কোনো জটিলতা বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি না করে।
আমি বললাম: তোমাদের ধর্মের ব্যাপারে কী এত ধীরগতি? কেন এত অবহেলা করছ এর প্রতি? নামায কি প্রথম ফরয নয়, যা একজন মুসলিম ফিকহ ও আমলের মাধ্যমে শিখে এবং এর প্রতি গভীর দৃষ্টি দিয়ে নিজেকে সংশোধন করে? এটাই তো তার ধর্মের স্তম্ভ, তার সঙ্গে তার রবের সংযোগের মাধ্যম, যার দ্বারা সে তার কাছে নিকটবর্তী হয় এবং তার সঙ্গে মুনাজাত করে।
তারা বলল: হ্যাঁ, তবে ফকিহদের মধ্যে নামাজের ভঙ্গি নিয়ে মতভেদের কারণে আমরা বিভ্রান্ত হয়েছি, আতঙ্কিত হয়েছি।
আমি বললাম: কোন মতভেদকে বোঝাতে চাইছ?
তারা বলল: তাদের মতভেদ ছিল এ নিয়ে—নামাজে হাত তোলার সময় কি কাঁধের সমান তোলা হবে, নাকি কান পর্যন্ত? এর পর প্রশ্ন হলো, শুধু কি তাকবিরে তাহরিমার সময়ই হাত তুলবে, নাকি প্রতিটি রুকু ও সিজদার ওঠা-নামায়ও তুলবে? হাত কি বুকে রাখা হবে, নাকি নাভির নিচে, নাকি একেবারেই ছেড়ে দেওয়া হবে? নামাজ কি শুরু হবে “আলহামদু লিল্লাহি রব্বিল আলামিন” দ্বারা, নাকি কোনো দোয়ার মাধ্যমে শুরু করা হবে? রুকু ও সিজদা কিভাবে আদায় করবে? দুই সিজদার মাঝখানে কিভাবে বসবে? তাশাহহুদ কি ইবনে মাসউদের বর্ণনা অনুযায়ী পড়বে, নাকি ইবনে আব্বাসের বর্ণনা অনুযায়ী, নাকি আহলে মাদিনার বর্ণনা অনুযায়ী? বিতর কি এক রাকাত হবে, নাকি তিন রাকাত? আর তা কি এক সালামের মাধ্যমে শেষ হবে, নাকি দুই সালামের মাধ্যমে?
আমি বললাম: তোমরা খুব ভুল করলে —কারণ নামাজকে তোমরা সীমাবদ্ধ করেছ এর ক্ষুদ্র অংশগুলোতে, আটকে রেখেছ গৌণ বিষয়ে। অথচ এগুলো কেবল নামাজের সৌন্দর্য ও শোভা, যেমন ভাস্কর্য বা ছবির শেষ স্পর্শ।
তারা বলল: তাহলে আমাদের কাছে যা অস্পষ্ট, তা আমাদের জন্য পরিষ্কার করে দিন।
আমি বললাম: আমি তোমাদের জন্য একটি উদাহরণ দিচ্ছি।
তারা বলল: দিন, যদি তা আমাদেরকে এ ব্যাপারে গভীরভাবে বোঝায়।
আমি বললাম: তোমরা কল্পনা করো, তোমাদের সামনে দুটি নারী—একজন সুন্দরী, লাবণ্যময়ী, আকর্ষণীয় চেহারা ও হাসিখুশি স্বভাবের, দেহে-মননে স্নিগ্ধ ও মনোরম; আরেকজন বৃদ্ধা, কুৎসিত, বিকৃত, প্রাণহীন ও জীর্ণ। দুজনেরই পরিচর্যা করেছে একজন রূপবিশারদ, তাদের সাজিয়েছে-গুজিয়েছে। বলো তো, তোমরা কাকে বেশি কামনা করবে, কার জন্য প্রতিযোগিতা করবে?
তারা বলল: অবশ্যই প্রথমজনকে।
আমি বললাম: উভয়কেই তো একই রূপবিশারদ সাজিয়েছে?
তারা বলল: হ্যাঁ, তবে প্রথমজনের সঙ্গে দ্বিতীয়জনের পার্থক্য দুটি বিষয়ে—প্রথমজন জীবন্ত, দ্বিতীয়জন মৃত; প্রথমজনের দেহ কোমল ও সতেজ, দ্বিতীয়জন কুৎসিত ও বিকৃত।
আমি বললাম: তাহলে সাজসজ্জার ভূমিকা কোথায় থাকে?
তারা বলল: এটি আমাদের চিন্তায় সর্বশেষে আসে।
আমি বললাম: ঠিক তেমনি নামাজেরও দেহ, আত্মা ও সৌন্দর্য আছে। কুরআন বর্ণনা করেছে এর দেহ ও আত্মা, আর সুন্নাহ এনেছে এর সৌন্দর্য। যেমন কুরআন আমাদেরকে ওযুর দেহ ও আত্মা শিখিয়েছে, আর নবী ﷺ শিখিয়েছেন এর সৌন্দর্য ও পূর্ণতা।
তারা বলল: তাহলে নামাজের দেহ কী?
আমি বললাম: এর বাহ্যিক রূপ হলো—মুসলিম পাক-সাফ হয়ে কিবলামুখী দাঁড়াবে, কুরআনের কিছু অংশ তিলাওয়াত করবে, রুকু করবে, সিজদাহ করবে, সময়মতো নামাজ আদায় করবে, আল্লাহর ঘরে তাঁর বান্দাদের সঙ্গে মিলিত হয়ে নামাজ পড়বে।
তারা বলল: নামাজের আত্মা কী?
আমি বললাম: বিনয়, খুশু, আল্লাহর স্মরণ, তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনের উদ্দেশ্যে তা আদায় করা এবং মনোযোগ দেওয়া। যেমন আল্লাহ বলেন:
“ওয়া ক্বুমু লিল্লাহি ক্বানিতীন”
“قد أفلح المؤمنون الذين هم في صلاتهم خاشعون”
“وأقم الصلاة لذكري”
“فصل لربك”
তারা বলল: আর মনোযোগ বলতে কী বোঝাতে চাইছেন?
আমি বললাম: আল্লাহ বলেন—
“হে ঈমানদারগণ! তোমরা মাতাল অবস্থায় নামাজের কাছে যেও না, যতক্ষণ না বুঝতে পারো যা বলছ।”
“অতএব দুর্ভোগ সেসব নামাজিদের জন্য, যারা তাদের নামাজ থেকে গাফিল।”
আমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ -এর সাহাবাদের কাছ থেকে পেয়েছি—তাদের একজন বলেছেন: “কেবল সেই অংশটুকুই বান্দার নামাজ থেকে লিখে রাখা হয়, যতটুকুতে সে মনোযোগী থাকে।” একই রকম বাণী পরবর্তী সালাফদের থেকেও এসেছে। কেউ কেউ এটিকে মারফু করে রাসূল ﷺ -এর দিকে সম্বন্ধ করেছেন, তবে তা সহীহ নয়।
তারা বলল: তাহলে এর পূর্ণতা ও সৌন্দর্য কী?
আমি বললাম: তা সাহাবারা বর্ণনা করেছেন, আর তাতে তাদের ভিন্নমতও হয়েছে। পরে যারা এসেছেন তারাও ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। যদি এগুলো নামাজের মৌলিক ও অপরিহার্য অংশ হতো, তবে তারা অভিযুক্ত হতেন যে, তারা রাসূল ﷺ থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফরজকে সংরক্ষণ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। অথচ তারা তাঁর কাছ থেকে নামাজের বাহ্যিক ও অন্তর্নিহিত দিক সম্পূর্ণরূপে সংরক্ষণ করেছেন। এ-ই সেই নামাজ, যার ওপর নির্ভর করে আল্লাহর বান্দাদের ফালাহ বা কল্যাণ।
তবে যেসব বিষয়ে ভিন্নমত হয়েছে, সেগুলো মূলত পূর্ণতা ও সৌন্দর্যের অন্তর্ভুক্ত। বিভিন্ন রূপ ও ভিন্ন ভিন্ন ভঙ্গি এখানে ক্ষতি করে না, বরং এটি সহজতা ও রহমত। যেমন একজন নারী সুন্দরী হলে, তার কাছে গুরুত্ব পায় না, কীভাবে তার চুল আঁচড়ানো হলো বা কীভাবে সাজানো হলো—কারণ রূপবিশারদ তার কাজে দক্ষ। তেমনি একজন নামাজি যদি নামাজের বাহ্যিক রূপ ও আত্মা ঠিকভাবে ধারণ করে, তবে কোনো দোষ নেই যে, সে এর পূর্ণতা ও সৌন্দর্য নেবে ইমাম আবু হানিফা, মালিক, শাফেয়ি, আহমদ ইবনু হাম্বল বা অন্য কোনো আলেমের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, যারা রাসূল ﷺ -এর সুন্নাহ ও আদবের অনুসারী।
আমি বললাম: এ-ই সেই নামাজ, যা চোখকে শীতল করে, প্রাণকে প্রশান্তি দেয়, অন্তর ও বক্ষকে আরোগ্য দান করে। এ নামাজের মাধ্যমেই হৃদয় সমৃদ্ধ হয়, বিপদগ্রস্ত মানুষ স্বস্তি পায়। এ নামাজই তাকওয়াবান ভীত-সন্ত্রস্তদের আশ্রয়স্থল, আকুলপ্রাণ বন্ধুদের মিলনকেন্দ্র, আর অন্তঃশুদ্ধ প্রেমিকদের নিরাপদ আশ্রয়। তুমি তাদেরকে দেখবে রুকু ও সিজদায় মগ্ন, তাদের পার্শ্ব বিছানা থেকে দূরে থাকে—তারা তাদের রবকে ডাকতে থাকে ভয়ে ও আশায়। তারা কান্নাভেজা মুখে সিজদায় লুটিয়ে পড়ে, যা তাদের বিনয়কে আরও বাড়িয়ে দেয়।
এটি হলো নবী ও রাসূলদের নামাজ, সেই নামাজ যার জন্য নবীদের পিতা ও রাব্বুল আলামিনের খলিল ইবরাহিম আ. দোয়া করেছিলেন: “হে আমার রব! আমাকে নামাজ প্রতিষ্ঠাকারী বানান, এবং আমার বংশধরদের মধ্য থেকেও।”
এই নামাজেই জাকারিয়া আ. দাঁড়িয়েছিলেন, তখন ফেরেশতারা তাঁকে ডাক দিয়েছিল। এ নামাজের আদেশই দেওয়া হয়েছিল সেই নারীকেও, যাকে আল্লাহ মুমিনদের জন্য উদাহরণ করেছেন: “হে মারইয়াম! তোমার রবের প্রতি বিনয়ী হও, সিজদা করো এবং রুকু করো রুকুকারীদের সঙ্গে।”
আমাদের নবী ﷺ -এর অবস্থা ছিল—যখনই কোনো কঠিন বিষয় তাঁকে ঘিরে ধরত, তিনি নামাজের দিকে ছুটে যেতেন। তিনি ﷺ নামাজে দাঁড়াতেন, আর তাঁর বুক থেকে কান্নার শব্দ উঠত—যেন ফুটন্ত হাঁড়ির শব্দ।
এই নামাজ সম্পর্কেই আমাদের রাব্বে কারীম বলেছেন: “সিজদা করো এবং নৈকট্য লাভ করো।”
তারা বলল: আমরা তো সারাজীবন নামাজ পড়েছি, অথচ এই নামাজের স্বাদ পাইনি, এভাবে কখনো খেয়াল করিনি, কখনো এ থেকে আনন্দও পাইনি।
আমি বললাম: তোমরা যাও, নতুন করে নামাজ পড়ো—কারণ এতদিনে যে নামাজ পড়েছ, তা আসলে নামাজই হয়নি।
———- —-
ক্যাটাগরি : নামাজ, আত্মশুদ্ধি, শিক্ষা, ইসলামি চিন্তাধারা।
—
✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7086