শিরোনাম : যেদিন প্রত্যেক দুধপান করানো মা নিজের শিশুর কথা ভুলে যাবে
( يوم تذهل كل مرضعة عما أرضعت)
|২৪ |জানুয়ারি |২০২৬|
গতকাল আমি কুরআনের এই মহিমান্বিত আয়াতের আলোকে সম্মানিত ভাই মাওলানা আফতাব আলম ধনবাদী সাহেবের একটি প্রশ্নের উত্তর পেশ করেছিলাম:
“হে মানুষ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো। নিঃসন্দেহে কিয়ামতের কম্পন এক ভয়াবহ ঘটনা। যেদিন তোমরা তা দেখবে, সেদিন প্রত্যেক দুধপান করানো মা নিজের দুধপান করানো শিশুর কথা ভুলে যাবে।”
এরপর তাঁর পক্ষ থেকে আরেকটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়। প্রশ্নটির সারকথা হলো, এখানে “أرضعت” শব্দটি অতীতকালের রূপে কেন এসেছে? আর এখানে “ما” কি মাসদরিয়্যা হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে?
এই প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ সাধারণভাবে মুফাসসিরগণ যে ব্যাখ্যা উল্লেখ করেছেন, তার সারাংশ এই যে, উক্ত আয়াতে “تَذْهَلُ كُلُّ مُرْضِعَةٍ عَمَّا أَرْضَعَتْ ” বাক্যে “مرضعة” শব্দটি বিশেষ তাৎপর্যের সঙ্গে ব্যবহৃত হয়েছে। আরবি ব্যাকরণ অনুযায়ী যেসব বিশেষণ কেবল নারীর সঙ্গেই ব্যবহৃত হয়, সেগুলোতে সাধারণত তায়ে তানিস যুক্ত হয় না, যেমন حائض، حامل، مرضع। কিন্তু এখানে “مرضعة” বলা হয়েছে এই কারণে যে, এখানে সেই নারীকে বোঝানো হয়েছে, যে ঠিক এই মুহূর্তে দুধপান করানোর কাজে নিয়োজিত, অর্থাৎ সে বাস্তব ও প্রত্যক্ষভাবে তার শিশুকে দুধ পান করাচ্ছে।
এই অবস্থায় মায়ের মমতা, ভালোবাসা ও সম্পর্ক সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে থাকে। তবু যদি সে তার শিশুর কথাও ভুলে যায়, তাহলে তা কিয়ামতের ভয়াবহতা ও সেই মহাকম্পনের তীব্রতাকে অত্যন্ত গভীর ও প্রভাবশালীভাবে প্রকাশ করে। এজন্যই পরের অংশে বলা হয়েছে “عَمَّا أَرْضَعَتْ”, অর্থাৎ যাকে সে তখনই দুধ পান করাচ্ছিল। যদি এখানে “مرضعة” বলা হতো, তবে এই সূক্ষ্ম অর্থ প্রকাশ পেত না। কারণ “مرضعة” এমন নারীকে বলা হয়, যার দুধ পান করানোর সামর্থ্য আছে, সে তখন বাস্তবে দুধ পান করাচ্ছে কি না, তা এতে অপরিহার্য নয়। এভাবে কুরআন অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও উদ্দেশ্যপূর্ণ শব্দচয়নের মাধ্যমে কিয়ামতের ভয় ও আতঙ্ককে অসাধারণ বাগ্মিতায় ফুটিয়ে তুলেছে।
এটাই সাধারণত প্রচলিত ব্যাখ্যা। কিন্তু এখানে একটি আপত্তি উত্থাপিত হয়, যদি উদ্দেশ্য বাস্তব ও চলমান দুধপান করানোর অবস্থাকেই বোঝানো হতো, তাহলে “أرضعت” অতীতকালের পরিবর্তে “ترضع” বর্তমানকালের রূপ ব্যবহার করা অধিক উপযুক্ত হতো।
মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহী রাহিমাহুল্লাহ এই স্থানে বর্তমানকালের অর্থেই অনুবাদ করেছেন,
“সেদিন প্রত্যেক দুধপান করানো নারী তার দুধপানরত শিশুকে ভুলে যাবে।”
অনুরূপভাবে মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আ‘লা মওদূদী রাহিমাহুল্লাহর অনুবাদেও এসেছে,
“যেদিন তোমরা তা দেখবে, সেদিন অবস্থা এমন হবে যে প্রত্যেক দুধপান করানো মা তার দুধপানরত শিশুর প্রতি উদাসীন হয়ে যাবে।”
কিন্তু “أرضعت” শব্দটির দিকে গভীরভাবে তাকালে স্পষ্ট হয় যে, এটি সরাসরি চলমান দুধপান করানোর অবস্থার ওপর সুস্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে না। এই প্রেক্ষাপটে মাওলানা আফতাব আলম সাহেবের এই বক্তব্য অধিক শক্তিশালী মনে হয় যে, এখানে “ما” শব্দটিকে মাসদরিয়্যা হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। বহু নাহবিদও এই মতকে সমর্থন করেছেন। যেমন তাফসিরে কুরতুবিতে এসেছে,
মুবাররাদ বলেন, এখানে “ما” মাসদারের অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে; অর্থাৎ সে দুধপান করানোর কাজটাই ভুলে যাবে।
এই ব্যাখ্যার ওপর আবার আরেকটি প্রশ্ন ওঠে, যখন “ما” মাসদারিয়্যা বর্তমানকালেও প্রবেশ করতে পারে, তখন এখানে অতীতকালের রূপ ব্যবহারের কারণ কী?
এর দুটি সম্ভাব্য জবাব দেওয়া যায়।
প্রথমত, কুরআনে সাধারণত “ما” মাসদারিয়্যা অতীতকালের সঙ্গেই ব্যবহৃত হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, যে অবস্থা ও বাস্তবতাকে এখানে তুলে ধরা উদ্দেশ্য, তার সর্বাধিক জীবন্ত ও প্রভাবশালী চিত্রায়ন অতীতকালের মাধ্যমেই সম্ভব। অর্থাৎ এই দুধপান করানো নারী তার শিশুর সঙ্গে গভীরভাবে অভ্যস্ত, কারণ সে আগেও তাকে দুধ পান করিয়েছে। তার অন্তরে রয়েছে প্রবল মমতা, অস্বাভাবিক স্নেহ ও গভীর মানসিক টান। সে জানে, কখন কখন শিশুটিকে দুধ পান করাতে হয়। তবু কিয়ামতের ভয়াবহতা এমন তীব্র হবে যে, এই স্বাভাবিক ভালোবাসা, অন্তরের আকর্ষণ ও গভীর সখ্য থাকা সত্ত্বেও সে দুধপান করানোর সেই কাজটিই ভুলে যাবে।
————–
ক্যাটাগরি : তাফসির, লুগাহ, কোরআন
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8263