|২৮|০২|২০২৬|
প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
সূরা আল-বাকারায় (২:১০২) আল্লাহ তাআলা হারূত ও মারূতের কথা উল্লেখ করেছেন। যদি তাঁরা ফেরেশতা হয়ে থাকেন, তবে তাঁরা যাদু শিক্ষা দিয়েছেন, এ বিষয়টি আমরা কীভাবে বুঝব? এর পেছনে কী প্রজ্ঞা ও প্রেক্ষাপট রয়েছে?
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
# কারিমাহ সুলাইমান কাজি
উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রিয় কারিমাহ, কুরআনের আয়াত নিয়ে তোমার গভীর চিন্তা-মননের জন্য আল্লাহ তোমাকে উত্তম প্রতিদান দিন। তরুণ বয়সে এমন আন্তরিকভাবে আল্লাহর কালামের অর্থ অনুধাবনের চেষ্টা করা, কেবল তিলাওয়াতেই সীমাবদ্ধ না থেকে তার তাৎপর্য বোঝার প্রয়াস, এ এক বিরাট নিয়ামত। এ ধরনের প্রশ্ন জীবন্ত হৃদয় ও অনুসন্ধিৎসু মনের পরিচায়ক। আল্লাহ তোমাকে উপকারী জ্ঞান দান করুন, ঈমান অটুট রাখুন, এবং তাঁর কিতাব থেকে গভীর উপকার লাভকারীদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
উল্লিখিত আয়াতটি সূরা বাকারায় এসেছে। এখানে এমন এক ঐতিহাসিক ও নৈতিক প্রেক্ষাপটের কথা বলা হয়েছে, যখন কিছু মানুষ আল্লাহর অবতীর্ণ হিদায়াত ছেড়ে ভ্রান্ত পথের অনুসরণ করেছিল। আয়াতের সূচনাতেই রয়েছে কঠোর ভর্ৎসনা, তারা আল্লাহর নাযিলকৃত পবিত্র কিতাব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল এবং শয়তানরা মানুষের মাঝে যা প্রচার করত, তার অনুসরণে লিপ্ত হয়েছিল। “واتبعوا ما تتلو الشياطين” এই বাক্যাংশটি নিন্দা ও তিরস্কারের ভাষা; অর্থাৎ তারা ওহির পথ ছেড়ে মিথ্যা কাহিনি, অপপ্রচার ও অপবাদে বিশ্বাস স্থাপন করেছিল, তা জিন শয়তানদের হোক বা মানব শয়তানদের।
সে সময়ের প্রচলিত মিথ্যাচারের মধ্যে অন্যতম ছিল নবী সুলাইমান আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে অপবাদ, তিনি নাকি যাদু চর্চা করতেন বা কুফরিতে লিপ্ত ছিলেন। কুরআন অত্যন্ত দৃঢ়ভাবে এ অপবাদ খণ্ডন করেছে: “وما كفر سليمان”—সুলাইমান কখনো কুফরি করেননি। এই ঘোষণা তাঁর মর্যাদা রক্ষা করে এবং সুস্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে যাদু ও কুফরের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পর্ক ছিল না। বরং এসব ছিল মানুষকে বিভ্রান্ত করার লক্ষ্যে রটানো বিকৃতি ও অপপ্রচার।
এরপর আয়াতে বলা হয়েছে: “وما أنزل على الملكين ببابل هاروت وماروت।” আয়াতের গঠন ও প্রেক্ষাপট গভীরভাবে লক্ষ্য করলে বোঝা যায়, এখানে পরীক্ষা, জবাবদিহিতা ও জ্ঞানের অপব্যবহারের প্রসঙ্গই অব্যাহত রয়েছে। হারূত ও মারূতকে বাবিলে একটি পরীক্ষার অংশ হিসেবে প্রেরণ করা হয়েছিল। তাঁদের নিকট যে জ্ঞান অবতীর্ণ হয়েছিল, তা পাপাচারের প্রচার ছিল না; বরং ছিল সতর্কবার্তা ও পরীক্ষার কাঠামোর মধ্যে প্রদত্ত জ্ঞান। কুরআন স্পষ্ট করেছে, তাঁরা কাউকে কিছু শেখানোর আগে বলতেন: “إنما نحن فتنة فلا تكفر”—“আমরা তো কেবল একটি পরীক্ষা, সুতরাং কুফরিতে পতিত হয়ো না।” এই সতর্ক উচ্চারণ প্রমাণ করে যে জ্ঞানটি নৈতিক দিকনির্দেশনা ও স্পষ্ট সাবধানবাণীর সঙ্গে যুক্ত ছিল।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে বোঝা যায়, ফেরেশতারা কখনো পাপের প্রতি উৎসাহ দেননি। বরং তাঁদের ভূমিকা ছিল আল্লাহর হিকমতেরই অংশ, কিছু বিষয় উদ্ঘাটন করা, সত্য ও প্রতারণার পার্থক্য স্পষ্ট করা, এবং মানুষের নৈতিক দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠা করা। জ্ঞান নিজে কখনো অশুভ নয়। তা কল্যাণ বা অকল্যাণে রূপ নেয় মানুষের নিয়ত ও প্রয়োগের ওপর নির্ভর করে। ইসলামী চিন্তায় এ নীতি সুপ্রতিষ্ঠিত—ধনসম্পদ, বুদ্ধিমত্তা, দক্ষতা কিংবা বিশেষ জ্ঞান, সবই কল্যাণ বা অকল্যাণের উপকরণ হতে পারে। এমনকি বৈধ বিষয়ও অবাধ্যতায় ব্যবহৃত হলে পাপ হয়ে দাঁড়ায়।
আয়াতে বলা হয়েছে, মানুষ তাঁদের কাছ থেকে এমন কিছু শিখত, যা স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে। কিন্তু এই জ্ঞান ধ্বংসাত্মক উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়নি। তা হয়তো বৈধ বা প্রতিরক্ষামূলক প্রয়োগের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হতে পারত। কিন্তু মানুষ তা অপব্যবহার করেছিল, সীমা লঙ্ঘন করে অন্যায়, বিদ্বেষ ও অশান্তি সৃষ্টির উপকরণে পরিণত করেছিল। ফলে যা ছিল পরীক্ষা ও স্পষ্টীকরণের মাধ্যম, তা তাদের অপব্যবহারের কারণে ফিতনায় পরিণত হলো।
অতএব কুফরির দায় জ্ঞানের ওপর নয়, বরং সেই হৃদয়ের ওপর, যে সতর্কবার্তা অগ্রাহ্য করে অন্যায়ের পথে তাকে ব্যবহার করে। সতর্কতা উচ্চারিত হয়েছিল, পথ স্পষ্ট করা হয়েছিল, তবু যারা বিপথ বেছে নিয়েছে, দায় তাদেরই। এখানেই রয়েছে আয়াতটির গভীর নৈতিক শিক্ষা এবং আল্লাহর প্রজ্ঞার এক অনুপম প্রকাশ।
এই ব্যাখ্যাটি আয়াতগুলোর সামগ্রিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গেও সুস্পষ্টভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। কুরআন এখানে আল্লাহপ্রদত্ত হিদায়াতের বিপরীতে শয়তানি প্রতারণার এক স্পষ্ট তুলনা তুলে ধরেছে। শয়তানদের চর্চিত যাদু ছিল ভ্রান্তি ও কুফরির পথ ওহির বিরোধিতায় গড়ে ওঠা এক বিভ্রান্ত ধারা। পক্ষান্তরে ফেরেশতাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট জ্ঞান ছিল সতর্কবাণীসম্বলিত, আনুগত্য যাচাইয়ের একটি পরীক্ষা। যারা সত্যনিষ্ঠ ছিল, তারা সতর্কবার্তা শুনে বিরত থাকত; আর যারা ক্ষমতা, অনিষ্ট বা বিপর্যয় কামনা করত, তারা সতর্কতা উপেক্ষা করেই এগিয়ে যেত। এভাবেই প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হলো,
কেউ অজ্ঞতার অজুহাত দেখাতে পারল না।
অতএব হারূত ও মারূতের উল্লেখের পেছনে রয়েছে বহুস্তরীয় প্রজ্ঞা। এতে নবী সুলাইমান আলাইহিস সালামের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ খণ্ডন করা হয়েছে; আল্লাহর ওহি ও শয়তানি প্রতারণার পার্থক্য স্পষ্ট করা হয়েছে; দেখানো হয়েছে যে জ্ঞান নিজেই এক পরীক্ষা হতে পারে; এবং সর্বোপরি মানুষের নৈতিক দায়বদ্ধতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আয়াতটি ফেরেশতাদের যাদুর প্রচারক হিসেবে উপস্থাপন করে না; বরং সতর্কতার পরিসরে জ্ঞান পৌঁছে দিয়ে সত্যকে সুস্পষ্ট করে এবং মানুষের পছন্দের দায় তাদের হাতেই ন্যস্ত করে।
আল্লাহ তোমাকে তাঁর বাণী অনুধাবনের স্বচ্ছতা দান করুন, তোমার হৃদয়কে বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করুন, এবং কুরআনকে তোমার জীবনে নূর ও হিদায়াতের উৎস বানিয়ে দিন। আন্তরিক ও গভীর প্রশ্ন করতে থাকো, কারণ অন্বেষণই প্রজ্ঞার পথে এগিয়ে যাওয়ার এক মহৎ সোপান, আর তা মানুষকে আল্লাহর নৈকট্যের দিকে নিয়ে যায়।
————-
ক্যাটাগরি : তাফসির, ইসলামি চিন্তাধারা, কোরআন, উপদেশ,
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8565