بسم الله الرحمن الرحيم
|৮ |মার্চ |২০২৬|
❖ প্রশ্ন:
মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ সিদ্দীকী নাদভী (মাদ্দা জিল্লাহু)-এর পক্ষ থেকে নিম্নোক্ত প্রশ্ন এসেছে:
সম্মানিত শায়েখ ,
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
একটি প্রশ্নের উত্তর জানতে চাই। মাদরাসার পক্ষ থেকে যারা সফর করে চাঁদা সংগ্রহ করেন, তারা কি “আমিলীনুয যাকাত” (যাকাতের কর্মী)-এর অন্তর্ভুক্ত গণ্য হবেন? কমিশন নিয়ে চাঁদা সংগ্রহ করা কি বৈধ? এ বিষয়ে শরিয়তের বিধান কী? অনেক সফরকারী ২৫-৩০ শতাংশ পর্যন্ত যাকাতের অর্থ থেকে কমিশন নিয়ে থাকেন, এটা কি জায়েজ? মাদরাসা কর্তৃপক্ষ বলেন, যদি তাদের কমিশন না দেওয়া হয় তবে তারা কেন চাঁদা সংগ্রহ করবে?
❖ উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
যাকাত ও সদকা আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত এমন পবিত্র আর্থিক অধিকার, যা সরাসরি প্রাপ্যদের, অর্থাৎ দরিদ্র, মিসকিন, অভাবগ্রস্ত ও অন্যান্য হকদার মানুষের জন্য নির্দিষ্ট। এটি সাধারণ দান বা অনুদান নয়; বরং ফকীহদের দৃষ্টিতে এটি একটি ফরজ ও শরয়ি দায়িত্ব। প্রত্যেক মুসলমানের ওপর কর্তব্য, আল্লাহ নির্ধারিত সীমারেখা মেনে তার সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ প্রকৃত প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
এই সম্পদ মূলত দরিদ্র ও অভাবী মুসলমানদের অধিকার। তাদের জন্য এটি নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, এটাই প্রমাণ করে যে, যারা এটি সংগ্রহ বা বণ্টনের দায়িত্বে থাকবেন, তাদের জন্য এতে ব্যক্তিগত স্বার্থ গ্রহণ করা সমীচীন নয়। যাকাত ও সদকার প্রকৃত উদ্দেশ্য হলো সমাজে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা, দারিদ্র্য হ্রাস করা এবং সমাজের দুর্বল শ্রেণির দায়িত্ব গ্রহণ করা।
দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, বর্তমান সময়ে ভারতে এমন কোনো শক্তিশালী ইসলামী ব্যবস্থা নেই যা যাকাত ও সদকার সংগ্রহ ও বণ্টনের দায়িত্ব গ্রহণ করবে। এই শূন্যতার কারণে বড়-ছোট বহু মাদরাসা নিজেরাই যাকাত ও সদকা সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু এ ব্যবস্থাটি অনেক সময় অস্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক রূপ ধারণ করে। বহু ছোট মাদরাসা ও যাকাত সংগ্রহকারী ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিশন নিয়ে চাঁদা সংগ্রহ করেন।
এই প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এর ফলে প্রকৃত হকদারদের অধিকার ক্ষুণ্ন হয়। কমিশনের ভিত্তিতে যাকাত ও সদকা সংগ্রহ করা আসলে প্রাপ্যদের সম্পদকে ব্যক্তিগত স্বার্থে ব্যবহার করার শামিল, যা শরিয়তের দৃষ্টিতে নাজায়েজ এবং নৈতিকতার দিক থেকেও অনুচিত। যাকাতের কর্মীদের কাজ হলো নিষ্ঠা ও খেদমতের মনোভাব নিয়ে সম্পদ প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া—এ থেকে ব্যক্তিগত লাভ গ্রহণ করা নয়।
আরও লক্ষণীয় বিষয় হলো, বর্তমান মাদরাসা ব্যবস্থায় চাঁদা সংগ্রহের জন্য অত্যন্ত সুসংগঠিত ও কার্যকর কাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে; কিন্তু সেই ব্যবস্থায় দরিদ্র মানুষের সরাসরি পৌঁছানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষ নিজের প্রাপ্য যাকাত গ্রহণের জন্য সহজে এগোতে পারেন না, কারণ মাদরাসার সফরকারী ও সংগ্রাহকেরাই সংগৃহীত অর্থের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখেন।
মাদরাসাগুলোর পারস্পরিক প্রতিযোগিতা ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার কারণেই কমিশনের এই পদ্ধতি চালু হয়েছে, যাতে আরও বেশি চাঁদা সংগ্রহ করা যায়। এই ব্যবস্থায় প্রকৃত প্রাপকদের অধিকার আড়ালে পড়ে যায় এবং আর্থিক সুবিধা মূলত মাদরাসা বা সংগ্রাহকদের কাছেই কেন্দ্রীভূত হয়। ফলে যারা বাস্তবে যাকাত ও সদকার হকদার তারা নিজেদের ন্যায্য প্রয়োজনও পূরণ করতে পারেন না।
এই পরিস্থিতিতে আলেমসমাজ ও বড় মাদরাসাগুলোর দায়িত্ব হলো—এই ব্যবস্থাকে শরিয়তের ন্যায়সঙ্গত ও ন্যায়পরায়ণ নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তোলা। বড় ও নির্ভরযোগ্য মাদরাসা (যেমন দারুল উলুম দেওবন্দ ও দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা) এর উচিত কেবল সেই পরিমাণ যাকাত ও সদকা সংগ্রহ করা, যা প্রকৃত শরয়ি যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
সংগৃহীত অর্থের অন্তত অর্ধেক সরাসরি দরিদ্র ও মিসকিন মুসলমানদের মধ্যে বণ্টন করা উচিত, যাতে তাদের অধিকার যথাযথভাবে আদায় হয়। বাকি অংশ, যা মাদরাসা বা অন্যান্য বৈধ খাতে ব্যয়যোগ্য, তা সেখানেই ব্যবহার করা যেতে পারে। ছোট মাদরাসা বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে যাকাত সংগ্রহের অনুমতি না দেওয়াই উত্তম, তাহলে সম্পদের সঠিক ও স্বচ্ছ ব্যবহার নিশ্চিত হবে এবং প্রাপকদের অধিকার সুরক্ষিত থাকবে।
যাকাতের কর্মীদের জন্য কোনো ধরনের কমিশন বা ব্যক্তিগত লাভ গ্রহণ শরিয়তের দৃষ্টিতে বৈধ নয়। তাদের কাজ হওয়া উচিত কেবল আন্তরিকতা ও সেবার মানসিকতা নিয়ে যাকাত সংগ্রহ করা এবং তা প্রকৃত প্রাপকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া।
সবশেষে মনে রাখা দরকার, যাকাত ও সদকার প্রকৃত উদ্দেশ্য মাদরাসার আর্থিক চাহিদা পূরণ করা নয়; বরং এটি প্রাপ্য মানুষের অধিকার আদায়ের মাধ্যম। কমিশন গ্রহণ করা বা সংগ্রাহকদের ব্যক্তিগত লাভ করা আসলে সেই অধিকার লঙ্ঘনেরই শামিল।
বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক চাঁদা সংগ্রহের ব্যবস্থাকে পরিহার করে বড় ও নির্ভরযোগ্য মাদরাসাগুলোর হাতে দায়িত্ব অর্পণ করাই সবচেয়ে যুক্তিসঙ্গত ও শরয়ি সমাধান। এর মাধ্যমে যেমন প্রাপ্যদের অধিকার সুরক্ষিত হবে, তেমনি ইসলামী সমাজে ন্যায় ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে, এবং মাদরাসাগুলোও তাদের শরয়ি দায়িত্ব স্বচ্ছ ও কার্যকরভাবে পালন করতে পারবে।
————-
ক্যাটাগরি : ফিকাহ, ফাতাওয়া, ইসলামি চিন্তাধারা, সমালোচনা
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8633