AkramNadwi

যাকাত বণ্টনে বিলম্ব: শরিয়তের নির্দেশনা।

যাকাত বণ্টনে বিলম্ব: শরিয়তের নির্দেশনা।

|২৮|০২|২০২৬|

❖ প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম শাইখ,
আমরা একটি নিবন্ধিত মানবিক সহায়তা সংস্থা পরিচালনা করি, যা অভাবী মানুষের সেবায় নিয়োজিত । আলহামদুলিল্লাহ, রমযান মাসে আমরা উল্লেখযোগ্য পরিমাণ যাকাত পাই।

যাকাতের অর্থ হাতে আসার পর, কি আমাদের তা সঙ্গে সঙ্গেই হকদারদের মধ্যে বিতরণ করা বাধ্যতামূলক? নাকি কৌশলগত প্রয়োজনের কারণে (যেমন—উপকারভোগীদের নিয়মিত মাসিক সহায়তা প্রদান) আমরা এক চন্দ্র বছর পর্যন্ত সেই অর্থ সংরক্ষণ করতে পারি?

আমার সংশয় এই যে, সাধারণভাবে জানা আছে, যাকাতের দায়িত্ব ততক্ষণ পর্যন্ত সম্পূর্ণ আদায় হয় না, যতক্ষণ না তা প্রকৃত প্রাপকের হাতে পৌঁছে। কিন্তু একটি সংস্থা হিসেবে আমাদের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সুসংগঠিতভাবে পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়ানো অনেক বেশি কার্যকর।

আরও একটি প্রশ্ন :
প্রশাসনিক প্রক্রিয়া বা লজিস্টিক পরিকল্পনার কারণে কি বিতরণে বিলম্ব করা জায়েয? কখনও নির্দিষ্ট কোনো গ্রামে পৌঁছাতে তিন সপ্তাহ বিলম্ব হয়। আবার কখনও বিদেশে অর্থ প্রেরণে দেরি হয়ে যায়।

আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন।

❖ উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

আল্লাহ তাআলা আপনাদের এই আন্তরিক প্রচেষ্টাকে কবুল করুন এবং আপনাদের সংস্থার হাতে অর্পিত যাকাতকে বরকতময় করুন। যাকাত ব্যবস্থাপনা এক মহৎ দায়িত্ব, একটি ভারী আমানত। সেই আমানত সঠিকভাবে আদায়ের জন্য স্পষ্ট দিকনির্দেশনা খোঁজা সত্যিই প্রশংসনীয়।

মৌলিকভাবে, যখন নিসাব পূর্ণ হয় এবং যাকাতের বছর অতিক্রান্ত হয়, তখন যাকাত ফরজ হয়ে যায়। সেই যাকাত কুরআনে নির্ধারিত হকদার শ্রেণির এক বা একাধিকের নিকট পৌঁছে দেওয়া আবশ্যক। যাকাতের মূল উদ্দেশ্য হলো, অধিকারপ্রাপ্ত মানুষের হক দ্রুত আদায় করা।

এই কারণেই ফকিহগণ সাধারণত বলেছেন, যাকাত ফরজ ও সংগৃহীত হওয়ার পর অযথা বিলম্ব না করে তা বিতরণ করা উচিত। বৈধ কারণ ছাড়া বিলম্ব করা অনুচিত। কারণ, একবার যাকাতের অর্থ পৃথক করা হলে, কার্যত তা হকদারদের সম্পদে পরিণত হয়।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, প্রতিটি ক্ষেত্রে তা মুহূর্তের মধ্যেই পৌঁছে দিতে হবে। ইসলামী শরিয়ত বাস্তবতা, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও সংগঠনিক প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দেয়। যখন যাকাত একটি বৈধ প্রতিনিধি সংস্থার নিকট অর্পিত হয়, যেমন- একটি নিবন্ধিত সংস্থা যা সংগ্রহ ও বিতরণের অনুমোদিত দায়িত্ব পালন করে, তখন সেই সংস্থা শরিয়তসম্মতভাবে হকদারদের কাছে অর্থ পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করে।

এ অবস্থায়, যদি সংস্থা যথাযথ নিয়ম মেনে দায়িত্ব পালন করে, তবে দাতার যাকাত আদায় হয়ে যায়, অর্থ সংস্থার নিকট সঠিকভাবে জমা ও নির্ধারিত খাতে বরাদ্দ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই।

কৌশলগত প্রয়োজনের কারণে এক চন্দ্র বছর পর্যন্ত যাকাত সংরক্ষণ করার প্রসঙ্গে বলা যায়, যদি এতে প্রকৃত হকদারদের স্পষ্ট উপকার সাধিত হয়, তবে তা বৈধ হতে পারে। যেমন—মাসিক ভাতা, ধাপে ধাপে সহায়তা, অথবা দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা কর্মসূচি, যদি এসব পদ্ধতি দরিদ্রদের জীবনে অধিক স্থিতি ও কল্যাণ নিশ্চিত করে, তাহলে অনেক সমকালীন আলিম এ ধরনের পরিকল্পনাকে অনুমোদন করেছেন; শর্ত এই যে, নির্দিষ্ট কিছু বিধান মানা হবে।

যাকাতের অর্থ সম্পূর্ণরূপে হকদারদের জন্য নির্ধারিত থাকতে হবে; তা অন্য কোনো প্রকল্পে স্থানান্তর করা যাবে না; এবং অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকির মধ্যে ফেলা যাবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বিলম্ব যেন স্বীকৃত কল্যাণের জন্য হয় এবং জরুরি প্রয়োজনগ্রস্ত মানুষের কোনো ক্ষতির কারণ না হয়।

যাকাতের উদ্দেশ্য কষ্ট লাঘব করা। অতএব, যদি অসহায় ও ঝুঁকিপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য তাৎক্ষণিক সহায়তা প্রয়োজন হয়, তবে প্রশাসনিক সুবিধা বা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপর তাদের প্রয়োজনকেই অগ্রাধিকার দিতে হবে।

প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, যাচাই-বাছাই, প্রকৃত হকদার চিহ্নিতকরণ, লজিস্টিক প্রস্তুতি কিংবা আন্তর্জাতিক অর্থ স্থানান্তরের মতো কারণে যে স্বল্পমেয়াদি বিলম্ব ঘটে তা সাধারণভাবে অনুমোদনযোগ্য। উদাহরণস্বরূপ, নির্দিষ্ট কোনো গ্রামে সুষ্ঠুভাবে বণ্টনের ব্যবস্থা করতে যদি প্রায় তিন সপ্তাহ সময় লাগে, তবে তা স্বাভাবিক কার্যপরিধির মধ্যেই গণ্য হবে, শর্ত এই যে, সেখানে এমন কেউ না থাকেন যিনি তাৎক্ষণিক বিপদের মধ্যে আছেন এবং জরুরি সহায়তার প্রয়োজন রয়েছে।

একইভাবে, বৈধ ব্যাংকিং বা অর্থ প্রেরণের প্রক্রিয়াগত বিলম্বও যাকাতকে বাতিল করে না; যতক্ষণ পর্যন্ত অর্থ নিরাপদভাবে সংরক্ষিত থাকে, নির্ধারিত খাতেই বরাদ্দ থাকে এবং ওই সময়ের মধ্যে অন্য কোনো কাজে ব্যবহার না করা হয়।

যা অবশ্যই পরিহার করতে হবে তা হলো, স্পষ্ট কল্যাণ ছাড়া অযৌক্তিক বিলম্ব, অথবা এমনভাবে যাকাত আটকে রাখা যাতে হকদাররা প্রয়োজনের মুহূর্তে বঞ্চিত হন। যাকাত নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের প্রাপ্য অধিকার; আর তা ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে থাকা সংস্থা কেবল একজন আমানতদার। তাদের কর্তব্য হলো, এই অধিকার যথাযথভাবে পৌঁছে দেওয়া।

অতএব মূলনীতি হলো ভারসাম্য: বণ্টনে দ্রুততা, আর পরিকল্পনায় প্রজ্ঞা। যদি সুসংগঠিত ও কাঠামোবদ্ধ সহায়তা যাকাতের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতা বৃদ্ধি করে এবং উপকারভোগীদের জীবনে বাস্তব উন্নতি আনে, তবে তা শরিয়তের সীমারেখার ভেতরে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু যখনই দুঃখ-কষ্ট প্রতিরোধে তাৎক্ষণিক বণ্টন প্রয়োজন হবে, তখন সেটিই অগ্রাধিকার পাবে।

আল্লাহ তাআলা আপনাদের কাজে বরকত দান করুন, একে সদকায়ে জারিয়াহ হিসেবে কবুল করুন এবং এই মহান আমানত উত্তমরূপে আদায়ের তাওফিক দান করুন।

————-

ক্যাটাগরি : ফিকাহ, পরামর্শ , ইসলামি চিন্তাধারা, শিক্ষা

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8563

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *