بسم الله الرحمن الرحيم.
প্রশ্ন:
সম্মানিত ও স্নেহাশীল জনাব হাফেজ মাহমুদ করীমের পক্ষ থেকে নিম্নোক্ত প্রশ্নটি এসেছে :
মাননীয় ড. মুহাম্মদ আকরম নাদভী সাহেব (দা.বা.)
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আশা করি আপনি সুস্থ ও নিরাপদে আছেন। একটি ফিকহি ও বাস্তবধর্মী বিষয়ে আপনার দিকনির্দেশনা কামনা করছি।
বর্তমান যুগে সোনা ও রুপার নেসাবমূল্যের মধ্যে প্রায় সাত-আট গুণ স্পষ্ট ব্যবধান সৃষ্টি হয়েছে। রুপার নেসাবের মূল্য সোনার নেসাবের তুলনায় অত্যন্ত কম, আর সোনার নেসাবের মূল্য তার তুলনায় অনেক বেশি। এমন অবস্থায় নেসাবের মানদণ্ড হিসেবে যদি রুপাকে গ্রহণ করা হয়, তবে বহু এমন ব্যক্তি ‘সাহেবে নেসাব’ বলে গণ্য হয়ে যায়, যারা প্রকৃতপক্ষে গরিব বা মিসকিন; অথবা অন্তত তাদের আর্থিক অবস্থা এমন নয় যে তারা স্বচ্ছন্দে যাকাত আদায় করতে পারে।
= আনিস আহমদ, খায়রাবাদি, মউ।
|| উত্তর:
এ প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, সূক্ষ্ম এবং সমকালীন আর্থিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে সংশ্লিষ্ট। সত্য কথা হলো, এখানে যে আপত্তিটি উত্থাপিত হয়েছে, তা পুরোপুরি যৌক্তিক, বোধগম্য এবং গভীর চিন্তা-ভাবনার দাবি রাখে।
শরিয়তে যাকাত ফরজ হওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো, ধনীদের সম্পদ থেকে অভাবগ্রস্তদের সহায়তা করা, গরিব ও মিসকিনদের ভরণপোষণ নিশ্চিত করা এবং সমাজে আর্থিক ন্যায় ও ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করা। যাকাত কখনোই এ জন্য বিধিবদ্ধ করা হয়নি যে, প্রকৃত অর্থে যে ব্যক্তি অভাবী, তার ওপর আর্থিক বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হবে; কিংবা কেবল বাহ্যিক হিসাব-নিকাশের ভিত্তিতে তাকে সাহেবে নেসাব ঘোষণা করা হবে, যদিও বাস্তবে তার যাকাত আদায়ের সামর্থ্য নেই।
এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে এবং সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের সময়ে সোনা ও রুপার মূল্য একে অপরের খুব কাছাকাছি ছিল। উভয় নেসাব, বিশ মিসকাল সোনা এবং দুইশ দিরহাম রুপা, অর্থনৈতিক দিক থেকে প্রায় সমান মর্যাদা বহন করত। এ কারণেই প্রাচীন ফকিহদের যুগে এ বিষয়ে কোনো বড় ধরনের বাস্তব সমস্যা দেখা দেয়নি এবং উভয় নেসাবকেই সমানভাবে কার্যকর বলে গণ্য করা হতো।
কিন্তু বর্তমান যুগে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। আজ সোনা ও রুপার মূল্যের ব্যবধান সাত-আট গুণ, কখনো তারও বেশি হয়ে গেছে। রুপার নেসাবের মূল্য এতটাই কমে গেছে যে, বহু মানুষ, যারা বাস্তবে গরিব কিংবা আর্থিকভাবে দুর্বল, মাত্র কয়েকটি গয়না বা সামান্য সঞ্চয়ের কারণেই সাহেবে নেসাব বলে বিবেচিত হয়ে যাচ্ছে। অথচ তাদের কাছে যাকাত আদায়ের প্রকৃত সামর্থ্য নেই, তাদের জীবনে আর্থিক স্বচ্ছলতার কোনো চিহ্নও দেখা যায় না।
এই মৌলিক সমস্যার প্রেক্ষিতে সমকালীন যুগের বহু নির্ভরযোগ্য ও গবেষণামুখী আলেমের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এ মতের দিকে ঝুঁকেছেন যে, বর্তমান সময়ে নগদ অর্থ এবং খনিজ নয় এমন সম্পদ (যেমন কাগুজে মুদ্রা)এর নেসাব নির্ধারণে সোনাকেই মানদণ্ড করা অধিক উপযুক্ত, অধিক যুক্তিসংগত এবং শরিয়তের উদ্দেশ্যের সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ।
শাইখ ইউসুফ আল-কারযাভি রাহিমাহুল্লাহ বিষয়টি অত্যন্ত ভারসাম্যপূর্ণ ও প্রজ্ঞাময় ভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলেন, বহু আলেম সোনার নেসাবকে এ কারণে বেশি উপযুক্ত মনে করেন যে, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সোনার মূল্য তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল থেকেছে, অথচ রুপার মূল্যে অস্বাভাবিক ও ধারাবাহিক পতন ঘটেছে। এ মতের সমর্থকদের মধ্যে আল্লামা মুহাম্মদ আবু জাহরা, আব্দুল ওয়াহহাব খাল্লাফ এবং শাইখ হাসানের মতো নির্ভরযোগ্য ও সম্মানিত আলেমগণ অন্তর্ভুক্ত।
এ মতের পক্ষে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক যুক্তিও রয়েছে। তা হলো, যদি সোনার নেসাবকে অন্যান্য যাকাতযোগ্য সম্পদ, যেমন উট, ছাগল ও কৃষিপণ্যের নেসাবের সঙ্গে তুলনা করা হয়, তবে আজকের বাজারমূল্যের আলোকে সোনার নেসাবই এগুলোর সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রতীয়মান হয়। বিপরীতে, রুপার নেসাব এ আর্থিক ভারসাম্য থেকে সম্পূর্ণ বিচ্যুত হয়ে পড়েছে।
এর পাশাপাশি হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভী রাহিমাহুল্লাহ হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা গ্রন্থে একটি অত্যন্ত মৌলিক নীতিগত দিক তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, রুপার নেসাব পাঁচ উকিয়া এ জন্য নির্ধারিত হয়েছিল যে, সে যুগে তা একটি ছোট পরিবারের এক বছরের মধ্যম ও যুক্তিসংগত ব্যয়ের জন্য যথেষ্ট হতো। আজ এ প্রশ্ন নিজেই নিজের জবাব বহন করে, এমন কোনো দেশ কি বর্তমানে আছে, যেখানে এত পরিমাণ রুপার মূল্য একটি ছোট পরিবারের এক বছরের ব্যয়ের জন্য যথেষ্ট হতে পারে? বাস্তবতা হলো, আজকের যুগে অনেক জায়গায় এ পরিমাণ অর্থ এক মাসের ব্যয় মেটাতেও অক্ষম।
অতএব, শরিয়তের উদ্দেশ্য, যাকাতের আত্মা এবং বাস্তব ন্যায় ও ভারসাম্যের দাবি সামনে রেখে এ কথাই অধিক শক্তিশালী, অধিক ন্যায়সঙ্গত এবং অধিক গ্রহণযোগ্য মনে হয় যে, বর্তমান যুগে নগদ অর্থ ও মুদ্রার যাকাতের নেসাব সোনার নেসাব অনুযায়ী নির্ধারণ করা হবে, রুপার নেসাব অনুযায়ী নয়।
সুতরাং আপনার এই অনুভূতিটি একেবারেই যথার্থ যে, কেবল রুপার নেসাবকে মানদণ্ড বানালে অনেক সময় যাকাতের ব্যবস্থা তার মূল উদ্দেশ্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে। এ কারণেই সমকালীন যুগের বহু গবেষক ফকিহ এ মত পোষণ করেন যে, বর্তমান বাস্তবতায় মানুষের উচিত সোনার নেসাবকে ভিত্তি করে যাকাতের হিসাব করা, যাতে কোনো গরিবের ওপর অন্যায় বোঝা না চাপানো হয় এবং যাকাতের বিধান ও প্রজ্ঞাও ব্যর্থ হয়ে না যায়।
——————–
ক্যাটাগরি : ফিকাহ, ফাতাওয়া, শিক্ষা,
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍️ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7989