AkramNadwi

শিরোনাম : যদি কেউ তোমার জামা নিতে চায় তবে তাকে চা

শিরোনাম : যদি কেউ তোমার জামা নিতে চায় তবে তাকে চাদরটাও দিয়ে দাও।
——————–

হযরত ঈসা (আ.)-এর একটি সুপরিচিত প্রজ্ঞাময় উপদেশ হলো—
“যদি কেউ তোমার বিরুদ্ধে মামলা করে তোমার জামা নিতে চায়, তবে তাকে তোমার চাদরটাও দিয়ে দাও।” (ইঞ্জিল, মথি ৫:৪০)

একই অর্থে তাঁর আরেকটি উপদেশ হলো—
“যদি কেউ তোমার ডান গালে চড় মারে, তবে বাম গালটাও তার দিকে ফিরিয়ে দাও।” (ইঞ্জিল, মথি ৫:৩৯)

এ উপদেশ নিঃসন্দেহে এক অসাধারণ প্রজ্ঞা ও প্রখর জ্ঞানের পরিচায়ক। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটিকে সঠিকভাবে বোঝার চেষ্টা করা হয়নি। এর অর্থ এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে যেন—যদি কেউ তোমার জামা ছিনিয়ে নেয়, তবে তার পেছনে দৌড়ে গিয়ে চাদর বা আলখাল্লাটাও তাকে দিয়ে আসতে হবে; আর যদি কেউ তোমার এক গালে চড় মারে, তবে তৎক্ষণাৎ আরেক গাল বাড়িয়ে দিতে হবে যেন সে তাতেও চড় মারতে পারে।

এভাবে বোঝালে এটি এক ধরনের নিষ্ক্রিয়তা (passivism) শেখায়, আর সেই কারণে এ কথার তীব্র সমালোচনা হয়ে আসছে। খোদ খ্রিস্টান সমাজেই এর উপর আমল নেই। কোনো ধার্মিক খ্রিস্টানকে যদি কেউ ক্ষতি করে, তবে সে প্রতিশোধ নিতেই এগিয়ে আসে, বরং অনেক সময় সে নিজেই আগ্রাসন চালায়। খ্রিস্টান বিশ্বের অগণিত যুদ্ধই প্রমাণ করে যে এ শিক্ষা তাদের জীবনচর্চায় কার্যকর হয়নি।

মুসলমানেরাও নিত্যই নতুন নিয়মপত্রের এ উপদেশের সমালোচনা করে থাকে, বরং এটিকে বিদ্রূপ করেও তুলে ধরে। তারা মনে করে এরকম উপদেশ দেখিয়ে দুনিয়াকে বোঝানো যাবে যে ইসলামই প্রকৃত ধর্ম—কারণ এতে এমন অপ্রাকৃত ও অযৌক্তিক শিক্ষা নেই।

কিন্তু এ ধরনের তুলনা মোটেই ইসলামী নয়। সমস্ত নবী-রাসূলই আল্লাহর প্রেরিত, তাঁদের শিক্ষা প্রত্যেকটি ওয়াহীভিত্তিক। কুরআন বারবার মানুষকে নবীদের অনুসরণের জন্য উদ্বুদ্ধ করেছে—তাঁদের সকলের প্রতি আমাদের ঈমান ও শ্রদ্ধা রয়েছে, عليهم السلام।

দুঃখজনক হলো—হযরত ঈসা (আ.)-এর এ প্রজ্ঞাময় উক্তির আসল মর্ম উপলব্ধির চেষ্টা করা হয়নি। তাঁর উদ্দেশ্য এই ছিল যে—আল্লাহ মানুষকে নানা সামর্থ্য ও সুযোগ দিয়ে রেখেছেন, আর সেসব সামর্থ্য ও সুযোগের সীমার মধ্যেই তিনি বান্দাদের ইবাদত ও আনুগত্যের নির্দেশ দিয়েছেন। হতে পারে, মানুষ কিছু সুযোগ হারাবে, কিছু সামর্থ্য তাদের কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হবে; তবু তাদের হাতে এমন অনেক সুযোগ-সুবিধা থেকে যাবে যার মাধ্যমে তারা আল্লাহর ইবাদতে অটল থাকতে পারবে।

যদি তারা ইবাদতে সত্যনিষ্ঠ হয়, তবে তারা ধীরস্থিরভাবে নিজের বুদ্ধি ব্যবহার করবে। আল্লাহ তাঁদের পথপ্রদর্শন করবেন, তারা নতুন সুযোগ খুঁজে নেবে, মালিকের রশি শক্ত করে ধরে রাখবে, ইবাদতের পথে অবিচল থাকবে—এবং শেষ পর্যন্ত সাফল্য তাদের হাতেই আসবে।

অতএব, যদি কেউ জোর করে তোমার জামা কেড়ে নেয়, আর তুমি তা ফেরত পাওয়ার ক্ষমতা না রাখো, কিংবা ক্ষমতার অঙ্গনেও তোমার প্রবেশাধিকার না থাকে—তাহলে নিজের দায়িত্ব থেকে বিমুখ হয়ে কান্নাকাটি ও অভিযোগে পড়ে থেকো না। এতে করে তোমার মূল কাজের ক্ষতি হবে। বরং ভাবো—জামা গেছে, তবু আমার কাছে চাদর আছে। যদি চাদরটাও চলে যায়, তবুও আমার কাছে অন্য কিছু রয়ে যাবে। তখন মন-প্রাণ ঢেলে নিজের কাজেই লেগে পড়ো।

দুনিয়ার অত্যাচারী শক্তিগুলো বরাবরই অসহায়দের কাছ থেকে কিছু না কিছু ছিনিয়ে নিতে চায়। তাদের উদ্দেশ্য দুটো—প্রথমত, এটিকে নিজেদের জয় বলে মনে করে উল্লাস করা; দ্বিতীয়ত, অসহায়দের অসহায়ত্বে তারা আনন্দ খুঁজে নেয়। কিন্তু হযরত ঈসা (আ.)-এর এ উপদেশে আমল করলে অত্যাচারীদের উভয় পরিকল্পনাই ভেস্তে যাবে।

অত্যাচারী যখন জামা কেড়ে নেয়, তখন নিপীড়িত ব্যক্তি এ প্রমাণ করে যে সে একেবারেই অসহায় নয়। যদি একটি জিনিস চলে যায়, তাতে কিছু আসে যায় না—সে নিজের মস্তিষ্ক কাজে লাগিয়ে অনেক বিকল্প খুঁজে নিতে পারে, আর মন-প্রাণ ঢেলে নিজের কর্তব্য পালন করে যেতে পারে। তখন অত্যাচারীর বিজয় মাটিতে মিশে যায়, আর নিপীড়িত ব্যক্তি আত্মমর্যাদা ও সম্মান নিয়ে জীবন কাটায়।

ফিরাউন তার শক্তির জোরে বনী ইসরাঈলের বহু সুযোগ-সুবিধা কেড়ে নিয়েছিল, তাদের সম্মিলিত ইবাদতের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। কিন্তু হযরত মূসা (আ.) তাঁর জাতিকে সেই বঞ্চনা থেকে বের করে আনলেন এবং শিক্ষা দিলেন যে—প্রভুর ইবাদতই সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ, আর এটিকে কেউ ছিনিয়ে নিতে পারে না। এজন্য তিনি তাঁদের ঘরে ঘরে নামাজের জায়গা তৈরি করতে বললেন এবং সেখানে ব্যক্তিগত ও সম্মিলিত ইবাদতে লেগে যেতে বললেন।

আজও যদি কোথাও জনসমক্ষে ইবাদতের স্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয়, তবুও মুসলমানেরা মসজিদে গিয়ে ইবাদত করতে পারে। বাজারে গেলে এমন জায়গা বেছে নাও, যেখানে কাছেই কোনো মসজিদ আছে। আর যদি অসুবিধা হয়, তবে এমন সময়ে যাও যখন নামাজের সময় নয়। যদি কেনাবেচার মাঝেই নামাজের সময় এসে পড়ে এবং নামাজ মিস হওয়ার আশঙ্কা হয়, তবে কেনাবেচাকে দুই বা ততোধিক ভাগে ভাগ করে নাও। এভাবে বুদ্ধি ব্যবহার করতে করতে বুঝতে পারবে—তোমার হাতে আসলে বহু সুযোগই রয়েছে।

যদি আপনি সফরে থাকেন:

যদি আপনি সফরে থাকেন, তবে সফরকে কয়েক ভাগে ভাগ করে নিন। চেষ্টা করুন—যদি যোহর ও আসর আলাদা সময়ে পড়তে না পারেন, তবে একসাথে পড়ুন (جمع بین الصلاتین)। আর যদি মাগরিব ও এশা আলাদা সময়ে পড়তে না পারেন, তবে সেগুলোও একসাথে পড়ুন। তবে কোনো অবস্থাতেই নামাজ কাজা হতে দেবেন না। নামাজের কারণে যদি আপনার সফর দীর্ঘ হয়ে যায়, তাতে দুঃখ করবেন না। প্রাচীনকালে মানুষ তো দিনের পর দিন দীর্ঘ সফর করত। আজ আপনার উপর আল্লাহর কত বড় অনুগ্রহ যে আপনার সময় অনেক বাঁচানো আছে। যদি এক দিনের সফর দেড় দিনে শেষ হয়, তাতেও দুঃখ নেই—আপনি কি আপনার প্রভুর জন্য এতটুকু কোরবানিও দিতে পারবেন না?

আমার কাছে এখন এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আছে। আপনি বলুন তো—জনসমক্ষে ইবাদতের কিছুটা অসুবিধার কারণে এত অভিযোগ করছেন, অথচ আপনার নব্বই শতাংশেরও বেশি জনসংখ্যা মসজিদ ও ঘরের সুবিধা থাকা সত্ত্বেও নামাজই পড়ে না। প্রতিটি গ্রামে, প্রতিটি শহরের মহল্লায় অসংখ্য মসজিদ রয়েছে, অথচ সেগুলো বেশিরভাগ সময় ফাঁকা থাকে। মানুষ নামাজই পড়ে না। এ গোনাহের দায়ও কি কোনো সরকারের উপর বর্তায়?

আমরা কেন সেই মুসলমানদের মাঝে দাওয়াত ও সংশোধনের কাজ করি না, যারা সমস্ত সুযোগ-সুবিধা থাকার পরও ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর ইবাদত করে না?

এটা মনে রাখবেন—আল্লাহর নিয়ম হলো, তাঁর বান্দারা যদি প্রদত্ত সুযোগগুলো কাজে না লাগায়, তবে তিনি তাদের জন্য সুযোগের দ্বার সংকুচিত করতে থাকেন—যতক্ষণ না তাদের উপর অপমান চাপিয়ে দেওয়া হয়। আর যদি তাঁর বান্দারা সুযোগগুলো ব্যবহার করে, তবে তিনি তাদেরকে আরও বেশি সুযোগ দান করেন।

অতএব আমাদের দায়িত্ব হলো—আমরা নিজেদের গোনাহ থেকে তাওবা করি, আল্লাহর ইবাদতে কখনোই গাফিল না হই, যত কষ্টই আসুক না কেন নামাজে শৈথিল্য না করি। আর আন্তরিকভাবে চেষ্টা করি যেন যারা নামাজ পড়ে না, তাদের ভেতরে নামাজের প্রতি ভালোবাসা ও আগ্রহ জাগে।

যদি এ পরিস্থিতিতেই নামাজ আদায়কারীর সংখ্যা বেড়ে যায়, তবে বাস্তবিক অর্থেই আমরা সফল, এবং আমাদের রবের দরবারে সম্মানিত হব।

আল্লাহ আমাদেরকে বুদ্ধি ও চিন্তাশক্তি ব্যবহারকারী বানান, আমাদের অন্তরে নামাজ ও ইবাদতের মহত্ত্ব গেঁথে দিন, এবং পরিস্থিতি যাই হোক না কেন আমাদেরকে সময়মতো নামাজ আদায়কারী বানান।
আমীন।

——————–
ক্যাটাগরি : উপদেশ, ইসলামি চিন্তাধারা।
—-
✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ

🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7078

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *