শিরোনাম : মেয়েদের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ শিক্ষাক্রমের বিন্যাস
|২৭|০৩|২০২৬|
❖ প্রশ্ন:
সম্মানিত ও মহোদয় মাওলানা আকরম নদভী সাহেব,
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপনার দিকনির্দেশনা কামনা করছি। আমি একটি প্রতিষ্ঠানের সাথে যুক্ত, যেখানে ছোট ছোট মেয়েরা পড়াশোনা করে। তাদের বয়স আনুমানিক ছয় থেকে চৌদ্দ বছরের মধ্যে। এখানে পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কোর্স রয়েছে, যার মাধ্যমে তারা অন্তত কুরআন ও উর্দু পড়তে শেখে, দ্বীনের মৌলিক বিষয়গুলো জানে এবং কিছু প্রয়োজনীয় মাসআলার সাথে পরিচিত হয়।
প্রাথমিক স্তরে আমরা তাদের ‘নূরানী কায়েদা’, পারা ‘আম্মা’, নাযেরা কুরআন মাজীদ, ‘তালিমুল ইসলাম’, ইসমাঈল মীরাঠীর প্রাথমিক বইসমূহ এবং মাসনূন দো‘আ ইত্যাদি পড়াই। আর শেষ পর্যায়ে, যখন তারা উর্দু পড়া ও বোঝার যোগ্যতা অর্জন করে, তখন ‘বেহেশতী জেওর’ পড়ানো হয়, যাতে তারা কিছু মৌলিক মাসআলা জানতে পারে।
আমরা এই শিক্ষাক্রমকে আরও উন্নত করতে চাই এবং এক-দুটি নতুন স্তর সংযোজনের কথাও ভাবছি, যেন মেয়েরা আরবি ও ইংরেজি ভাষার সাথেও কিছুটা পরিচিত হতে পারে। অনুগ্রহ করে দিকনির্দেশনা দিলে কৃতজ্ঞ থাকব, কীভাবে এই পাঠ্যক্রমে উন্নতি আনা যায়, কী সংযোজন বা সংশোধন প্রয়োজন, এবং আরবি ও ইংরেজির একেবারে প্রাথমিক স্তরের উপযোগী কয়েকটি বইয়ের পরামর্শ দিলে তা আমাদের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে।
মুহাম্মদ নাসির নদভী
❖ উত্তর:
ওয়ালাইকুম সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
মেয়েদের শিক্ষা ও তরবিয়ত নিয়ে আপনার যে আন্তরিক উদ্বেগ ও দায়িত্ববোধ প্রকাশ পেয়েছে, তা নিঃসন্দেহে অত্যন্ত প্রশংসনীয়। এটি আনন্দের বিষয় যে আপনি শুধু একটি প্রতিষ্ঠান পরিচালনাই করছেন না, বরং তার পাঠ্যক্রমকে আরও উন্নত করার জন্য গভীরভাবে চিন্তাভাবনাও করছেন। প্রকৃতপক্ষে, এখানেই নির্ধারিত হয় একটি শিক্ষাপ্রচেষ্টার সাফল্য কিংবা ব্যর্থতার ভবিষ্যৎ। আল্লাহ তাআলা আপনার এই প্রয়াসকে কবুল করুন।
শিক্ষাক্রম কেবল কিছু বইয়ের সমষ্টি নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক গঠনপ্রক্রিয়া—যার মাধ্যমে একটি নতুন প্রজন্মের মানসিকতা, চরিত্র ও জীবনদৃষ্টি নির্মিত হয়। এর মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত, শিক্ষার্থীদের শুধু পড়তে-লিখতে সক্ষম করা নয়, বরং তাদের এমন সচেতন, চরিত্রবান ও দায়িত্বশীল মানুষে পরিণত করা, যারা নিজেদের দ্বীনকে বুঝবে এবং সমাজে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারবে।
যদি এই বিস্তৃত লক্ষ্য সামনে রেখে পাঠ্যক্রম সাজানো না হয়, তবে শিক্ষা সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে, কার্যকারিতা হারায়, কখনো কখনো দিকহীনও হয়ে যায়।
আপনার বর্ণিত বর্তমান পাঠ্যক্রম একটি সুন্দর ভিত্তি তৈরি করে এবং এতে দ্বীনি শিক্ষার মৌলিক কাঠামো বিদ্যমান। তবে এটিও স্পষ্ট থাকা প্রয়োজন যে, কেবল একটি মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করা বা কিছু পরিচিত বই অন্তর্ভুক্ত করাই যথেষ্ট নয়। প্রকৃত প্রয়োজন হলো, একটি সুসংহত ও ব্যাপক শিক্ষাদর্শন, যা শিক্ষার্থীদের পূর্ণাঙ্গ ব্যক্তিত্ব গঠনের লক্ষ্য নিয়ে নির্মিত এবং তাদেরকে নিজ সময় ও পরিবেশের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ করে তোলে।
কারণ, যে শিক্ষা তার যুগের চাহিদা থেকে বিচ্ছিন্ন থাকে, তা বাস্তব জীবনে পথনির্দেশ দিতে ব্যর্থ হয়।
এ কারণেই পাঠ্যক্রমে সমসাময়িক শিক্ষাকে যথাযথ ও মর্যাদাপূর্ণ স্থান দেওয়া অপরিহার্য। মেয়েদের এমন শিক্ষা লাভ করা উচিত, যা সাধারণ বিদ্যালয়গুলোতে দেওয়া হয়, যাতে তারা সমাজের মূলধারার সঙ্গে সংযুক্ত থাকতে পারে। পাশাপাশি এমন উদ্যোগ থাকা দরকার, যাতে তারা স্বীকৃত শিক্ষাবোর্ডের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারে এবং আনুষ্ঠানিক সনদ অর্জন করতে সক্ষম হয়। এতে তাদের জন্য উচ্চশিক্ষার পথ উন্মুক্ত হবে এবং সমাজেও তাদের জ্ঞানগত মর্যাদা স্বীকৃতি পাবে।
ভাষা শিক্ষার গুরুত্ব এখানে অত্যন্ত মৌলিক। উর্দুতে দৃঢ়তা তাদের জ্ঞানের ভিতকে মজবুত করবে, স্থানীয় ভাষা সামাজিক সম্পর্ককে সুদৃঢ় করবে, আর প্রাথমিক ইংরেজি তাদেরকে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত হতে সহায়তা করবে। ইসমাঈল মীরাঠীর বইগুলো ঐতিহাসিক গুরুত্ব বহন করলেও, বর্তমান যুগের শিক্ষাগত ও মনস্তাত্ত্বিক চাহিদা পূরণে তা যথেষ্ট নয়। তাই এর পরিবর্তে আধুনিক, কার্যকর ও শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক পাঠ্যবস্তু গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
দ্বীনি শিক্ষার ক্ষেত্রেও লক্ষ্য রাখা উচিত, এটি যেন কেবল তথ্য সরবরাহে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং বোঝাপড়া, সচেতনতা এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগযোগ্য প্রজ্ঞা সৃষ্টি করে। কুরআন মাজীদের শিক্ষায় নাযেরার পাশাপাশি নির্বাচিত সূরাগুলোর অনুবাদ ও সহজ ব্যাখ্যা অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন, যাতে মেয়েরা আল্লাহর কালামকে বুঝতে পারে।
হাদীসের ক্ষেত্রেও এমন বাছাই করা উচিত, যা তাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং যার মাধ্যমে নৈতিক ও আত্মিক তরবিয়তের দিকটি সুস্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে।