: তারা বলল, “আমাদের বলুন—মানুষ পরস্পরের মাঝে যে ভালোবাসা বিনিময় করে, তার মধ্যে সবচেয়ে পবিত্র ও মর্যাদাসম্পন্ন কোনটি?”
: আমি বললাম, “সেটি হলো—সন্তানের তার মায়ের প্রতি ভালোবাসা, যখন মা বার্ধক্যে উপনীত হন, বয়সে নুইয়ে পড়েন, দুর্বল ও অসহায় হয়ে পড়েন, এবং তখন তাঁর যত্ন নেওয়ার জন্য কাউকে প্রয়োজন হয়। তাঁর এই বয়সে তাঁকে সত্যিকারভাবে ভালোবাসবে শুধু সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর জন্য নিষ্ঠাবান, অথবা যে চরিত্রের মর্যাদার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছে।”
: তারা বলল, “তাহলে মায়ের সন্তানদের প্রতি ভালোবাসা সম্পর্কে আপনার মত কী?”
: আমি বললাম, “ভালোবাসারও নানা রূপ আছে—কোনোটা খাঁটি সোনা ও মণিমাণিক্যের মতো, আবার কোনোটা রূপা, তামা কিংবা মাটির পাত্রের মতো। ভালোবাসা একপ্রকার জাদু—যা সত্তার রূপ বদলে দেয়, বাস্তবতাকে উল্টে দেয়। কোনো বিশুদ্ধ উপাদানের সঙ্গে মিশলে এটি আরও মূল্যবান হয়ে ওঠে। ভালোবাসা সব সময় উচ্চ ও মর্যাদাপূর্ণ; এটি গুণ ও মহত্ত্বে দৃষ্টিশীল, ত্রুটি ও দুর্বলতাকে উপেক্ষা করে।
তবে ভালোবাসারও স্তরভেদ আছে—কিছু ভালোবাসা আরও মহান। মাতৃস্নেহ স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক; কিন্তু জ্ঞান ও বিবেচনাপ্রসূত ভালোবাসা—যা ইচ্ছায় বেছে নেওয়া হয়—তা ভালোবাসার শ্রেষ্ঠতম রূপ। এটি সেই ভালোবাসা, যা মহান আত্মা ও উন্নত চরিত্রের পরিচায়ক। এ ভালোবাসা এমন দৃঢ় বন্ধনে যুক্ত করে, যা সময় ও মৃত্যুও আলগা করতে পারে না। মানুষ এতে সান্ত্বনা ও স্থিরতা খুঁজে পায়, জীবন যতই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ হোক।”
: তারা আবার জিজ্ঞেস করল, “আর শিশুদের মায়ের প্রতি ভালোবাসা?”
: আমি বললাম, “শৈশবের ভালোবাসা সাধারণত মিশ্রিত থাকে দুর্বলতা, নির্ভরতা ও অক্ষমতার সঙ্গে। কিন্তু যখন সন্তান বড় হয়ে শক্তিশালী ও স্বনির্ভর হয়েও মায়ের প্রতি সেই ভালোবাসা অটুট রাখে, তখনই সেটি প্রকৃত ভালোবাসা—যার কথা আমি বলেছি।”
: তারা বলল, “আপনার জীবনে দেখা সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী গল্পটি বলুন—যেখানে কেউ বৃদ্ধা মাকে ভালোবেসেছে।”
: আমি বললাম:
একটি গল্প প্রচলিত আছে—পাঞ্জাবের এক ছোট্ট গ্রামে এক বৃদ্ধা মা বাস করতেন। বয়স নব্বই ছুঁয়েছে তাঁর। তাঁরও বৃদ্ধ সন্তানরা ছিল—কারও বয়স সত্তর, কারও পঁয়ষট্টি, কারও ষাট। তারা সবাই মায়ের যত্ন নিত, ভালোবাসত, তাঁকে ঘিরে থাকত যেন তিনি তাদের শৈশবের মা-ই আছেন এখনো।
একদিন হঠাৎ সেই মায়ের মাথায় পক্ষাঘাত আঘাত হানে। সন্তানরা ভীষণ ঘাবড়ে যায়। তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে মস্তিষ্করোগ বিশেষজ্ঞ এক প্রবীণ চিকিৎসক তাঁকে পরীক্ষা করে দেখলেন। তিনি বুঝলেন—অপারেশন দরকার, কিন্তু এই বয়সে তা জীবননাশের কারণও হতে পারে। তাই তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, ওষুধ ও খাদ্যনিয়ন্ত্রণেই চিকিৎসা করা হবে।
চিকিৎসক যখন কক্ষ থেকে বেরোলেন, দেখলেন সন্তানরা তাঁর চারপাশ ঘিরে আছে, ব্যাকুলভাবে জিজ্ঞেস করছে—“আমাদের মায়ের অবস্থা কেমন?”
চিকিৎসক বললেন, “তাঁর আর সুস্থ হওয়ার আশা নেই।”
এই কথা শুনে সন্তানদের কান্নার ধ্বনি চারদিক ভরিয়ে দিল। চোখের পানি ঝরতে লাগল অঝোরে। চিকিৎসক কোমল স্বরে সান্ত্বনা দিতে চাইলেন, তাদের মন শান্ত করতে চাইলেন, কিছুটা আশা জাগাতে চাইলেন।
: তারা আবার বলল, “ডাক্তার সাহেবা, কোনো উপায় নেই কি? কোনো চিকিৎসা যা তাঁকে কিছুটা ভালো করতে পারে?”
তিনি বললেন, “অস্ত্রোপচার ছাড়া উপায় নেই, কিন্তু তাঁর বয়স এত বেশি যে সফল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ।”
এ কথা শুনে তারা একসাথে আর্তনাদ করে উঠল। আত্মীয়স্বজনেরাও কান্নায় যোগ দিল। চিকিৎসক বিস্মিত হলেন—এই বৃদ্ধ সন্তানদের এমন আকুল ক্রন্দন কেন, যারা নিজেরাও মৃত্যুর দোরগোড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে!
তিনি বললেন, “তোমরা এত কাঁদছ কেন? তোমরা তো আর ছোট নও। তোমাদের মা এত বৃদ্ধ, এখন তাঁর জীবনের সময়ও পূর্ণ। তোমরা তো তাঁকে ছাড়াই বাঁচতে পারবে! এত আকুল হওয়ার কারণ কী?”
তখন তারা যে উত্তর দিল, তা চিকিৎসকের হৃদয় স্পর্শ করল—
: তারা বলল, “মা তো মা-ই থাকেন—সন্তান যতই বড় হোক না কেন, সে কখনো মায়ের প্রয়োজন থেকে মুক্ত হয় না। আমাদের মা যদিও শয্যাশায়ী, তবুও তিনি আমাদের ঘরে বরকতের উৎস। তাঁর জিকির ও দোয়ার ছায়ায় আমরা শান্তি পাই। তাঁর দোয়া আমাদের সব চেষ্টা ও সাধনার চেয়েও বেশি ফলপ্রসূ। তাঁর উপস্থিতিই আমাদের জীবনের আশ্রয়।”
: তারা বলল, “এত বৃদ্ধ সন্তানদের মায়ের প্রতি এমন মমত্ব আমাদের বিস্মিত করে!”
: আমি বললাম, “ভালোবাসা এক বিস্ময়কর জিনিস—এর আশ্চর্য কখনো ফুরায় না।”
: তারা বলল, “আর পিতার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা সম্পর্কে আপনার মত কী?”
: আমি বললাম, “তা মায়ের ভালোবাসার সমানই মর্যাদার।”
: তারা জিজ্ঞেস করল, “তবু আপনি কেন তা উল্লেখ করলেন না?”
: আমি বললাম, “কারণ, তোমরা জিজ্ঞেস করেছিলে সবচেয়ে পবিত্র ও উচ্চতম ভালোবাসা সম্পর্কে। পিতার প্রতি ভালোবাসা কখনো কখনো উত্তরাধিকার বা পার্থিব স্বার্থের সঙ্গে মিশে যায়—যা সেই ভালোবাসার নির্মলতা নষ্ট করে।”
: তারা বলল, “তাহলে আমাদের কিছু উপদেশ দিন।”
: আমি বললাম,
“আল্লাহ তাআলার বাণী স্মরণ রাখো—
যখন তাদের কেউ একজন বা উভয়েই তোমার কাছে বার্ধক্যে পৌঁছায়, তখন তাদের ‘উফ’ পর্যন্ত বলো না, ধমক দিয়ো না; তাদের সঙ্গে সম্মানজনকভাবে কথা বলো।’
(সূরা আল-ইসরা ২৩)
জেনে রাখো, ভালোবাসা একটি অমূল্য ধন, এক নির্মল শক্তি—যা দুনিয়ার কোনো আনন্দ কিংবা লোভ করতে পারে না। এটি তখনও উপকার দেয়, যখন অর্থ ও ক্ষমতা সব ব্যর্থ হয়ে যায়।
তবুও জেনে রেখো—সৃষ্টির সব ভালোবাসা কিছু না কিছু তিক্ততার সঙ্গে মিশ্রিত; এর আনন্দে রয়েছে কষ্টের ছায়া। ভাই ভাইকে ভালোবেসেও প্রতারণা করতে পারে। তাই সর্বোচ্চ ভালোবাসা স্মরণ রাখো—তোমার রবের ভালোবাসা।
তিনি ধনী, অমুখাপেক্ষী, করুণাময়, সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান। তিনি শুধু তোমাদের জন্য দোয়া করেন না, তোমাদের ডাকে সাড়া দেন; বিপদগ্রস্তের আর্তনাদ শোনেন, কষ্ট দূর করেন, নিরুপায়দের সাহায্য করেন।
তাঁর ভালোবাসা সৃষ্টির সব ভালোবাসার চেয়ে ঊর্ধ্ব, বিশুদ্ধ ও নিখুঁত—যার সঙ্গে কোনো মলিনতা নেই। তাঁর অনুগ্রহ ও দান সীমাহীন।
তাই তাঁর প্রতি ভালোবাসাই সর্বোচ্চ অধিকার রাখে—
‘তোমার প্রভু আদেশ করেছেন যে, তুমি তাঁরই ইবাদত করবে এবং পিতা-মাতার সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।’ (সূরা আল-ইসরা ২৩)
আমি তাঁর প্রশংসা করি তাঁর অনুগ্রহ ও দানের জন্য; কিন্তু স্বীকার করি—তাঁর অনুগ্রহের কৃতজ্ঞতা প্রকাশে আমি অক্ষম।
ভালোবাসার ওপর আল্লাহর অসংখ্য শান্তি ও রহমত বর্ষিত হোক—
যত বালুকণা আছে পৃথিবীতে, ততবার, এবং যতটা তিনি নিজে চান ততটাই।
তিনি-ই পরম দয়ালু, পরম করুণাময়।
——————–
ক্যাটাগরি : পারিবারিক জীবন, আখলাক, তাজকিয়াহ, উপদেশ, কোরআন।
— মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
— অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক:
https://t.me/DrAkramNadwi/7461