|| প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম ও রহমাতুল্লাহি ও বারাকাতুহ, সম্মানিত উস্তাদ
আশা করি আপনি ভালো আছেন। আমি একটি বিষয় জানতে চাই। কেউ যদি তার প্রতিটি ফোনকল রেকর্ড করে, তবে সেই রেকর্ডিং অন্য কাউকে শোনায় না—শুধু নিজের কাছে সংরক্ষণ করে রাখে, এই ভেবে যে, কখনো কেউ নিজের কথা অস্বীকার করলে প্রমাণ হিসেবে তা কাজে লাগবে—তাহলে শরিয়তের দৃষ্টিতে এমন কাজ বৈধ কি না?
|| উত্তর:
ওয়ালাইকুমুস সালাম ও রহমাতুল্লাহি ও বারাকাতুহ,
প্রিয় ও সম্মানিত প্রশ্নকারী!
আপনার উত্থাপিত প্রশ্নের উত্তর দিতে গেলে শরিয়তের আলোকে কয়েকটি মৌলিক দিক বিবেচনা করা প্রয়োজন।
ইসলামের শিক্ষায় আমানত, বিশ্বাসযোগ্যতা ও গোপনীয়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবোধ।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেছেন—
“অঙ্গীকার পূরণ করো; নিশ্চয়ই অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।”
(সূরা আল-ইসরা, আয়াত ৩৪)
নবী করিম ﷺ ইরশাদ করেছেন—
“المجالس بالأمانة”
(সুনান আবু দাউদ)
অর্থাৎ, “আলোচনা ও বৈঠকের কথাবার্তা একটি আমানত।”
এই হাদিস থেকে একটি নীতি স্পষ্ট হয় যে, মানুষ যখন কারো সঙ্গে কথা বলে, তখন সেই কথা আসলে একটি আমানত। আর আমানতের দাবি হলো—তা অনুমতি ছাড়া কারও সামনে প্রকাশ করা বা অন্য কোনোভাবে পৌঁছে দেওয়া যাবে না।
অতএব, কেউ যদি অন্যের সঙ্গে কথা বলার সময় গোপনে তা রেকর্ড করে ফেলে, তবে মূলত সে একপ্রকার গোপনীয়তার লঙ্ঘন করছে। এতে তদন্ত বা নজরদারির (spying) ভাবও থাকে, যা কুরআনে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে—
“وَلَا تَجَسَّسُوا”
(সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১২)
অর্থাৎ, “তোমরা একে অপরের গোপন অনুসন্ধান বা গোয়েন্দাগিরি করো না।”
এই নিষেধাজ্ঞা শুধু ব্যক্তিগত সম্পর্কের জন্য নয়, বরং সামাজিক নীতিমালা হিসেবেও প্রযোজ্য—যাতে মুসলমান তার ভাইয়ের ব্যক্তিগত বিষয় বা অন্তরঙ্গ কথাবার্তায় অনধিকার হস্তক্ষেপ না করে।
তাই কোনো প্রকৃত প্রয়োজন ব্যতীত প্রতিটি ফোনকল রেকর্ড করে রাখা—
যদিও উদ্দেশ্য থাকে, “কখনো দরকার হলে প্রমাণ হিসেবে কাজে লাগবে”—
এটা শালীনতা, সুদৃষ্টি ও ইসলামী চরিত্রের পরিপন্থী।
ইসলামী সমাজের ভিত্তি হলো ভালো ধারণা (حسن الظن) ও পারস্পরিক বিশ্বাস।
কুরআনে বলা হয়েছে—
“হে ঈমানদারগণ! অনেক অনুমান থেকে দূরে থাকো।”
(সূরা আল-হুজুরাত, আয়াত ১২)
অতএব, শুধুমাত্র এই ধারণা নিয়ে যে, “সম্ভবত সে নিজের কথা অস্বীকার করবে,”—
এই সন্দেহে সব কথাই রেকর্ড করে রাখা একজন মানুষের নৈতিক মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্য আচরণের পরিপন্থী কাজ।
তবে যদি পরিস্থিতি বিশেষ প্রকৃতির হয়—
যেমন:
কোনো ব্যক্তি এমন পদে বা দায়িত্বে আছেন যেখানে প্রশাসনিক ন্যায়বিচার, প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা বা আইনগত প্রয়োজনে কথোপকথন সংরক্ষণ অপরিহার্য;
অথবা কেউ সত্যিই প্রতারণা বা ক্ষতির আশঙ্কায় থাকে, এবং নিজের অধিকার বা জীবনের সুরক্ষার জন্য রেকর্ড রাখতে চায়—
তবে এ অবস্থায় প্রয়োজনে সীমিতভাবে এবং সৎ উদ্দেশ্যে রেকর্ড করা শরিয়তের দৃষ্টিতে অনুমোদিত হতে পারে।
এই বৈধতার কিছু শর্ত রয়েছে:
রেকর্ডিং কেবল ন্যায় প্রতিষ্ঠা বা আত্মরক্ষার উদ্দেশ্যে হবে—কখনোই কাউকে হেয়, অপমান বা প্রতিশোধের জন্য নয়।
রেকর্ড গোপন রাখা হবে; অপ্রাসঙ্গিক কাউকে শোনানো বা ইন্টারনেটে প্রকাশ করা যাবে না।
প্রয়োজনে শুধুমাত্র দলিল বা সাক্ষ্য হিসেবে তা ব্যবহার করা যাবে, বিনোদন বা সন্দেহের ভিত্তিতে নয়।
সারকথা:
অপ্রয়োজনীয়ভাবে প্রত্যেক কথোপকথন রেকর্ড করা ইসলামী শিষ্টাচার ও আমানতদারির পরিপন্থী, এবং এমন ব্যক্তি সম্পর্কে বলা যায় যে, সে একধরনের অবিশ্বাস ও সন্দেহের মানসিকতা পোষণ করছে।
তবে যদি কেউ এমন অবস্থায় থাকে যেখানে ন্যায়বিচার, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বা নিজের বৈধ অধিকার রক্ষার স্বার্থে রেকর্ড রাখা অনিবার্য হয়, তাহলে সীমিত পরিসরে, ন্যায়নিষ্ঠ ও গোপনীয়তার শর্তে তা করা যাবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সৎ উদ্দেশ্য, বিশুদ্ধ আচরণ ও আমানতদার চরিত্র দান করুন,
এবং আমাদের তাঁদের অন্তর্ভুক্ত করুন, যারা ন্যায় ও আন্তরিকতার সঙ্গে মানুষের মঙ্গল চায়, সন্দেহ ও কৌতূহলের বশে সমাজে অশান্তি নয়, শান্তি প্রতিষ্ঠা করে।
والله تعالى أعلم بالصواب، وهو الهادي إلى سواء الصراط۔
——————–
ক্যাটাগরি : ফাতাওয়া, ফিকহ, আখলাক।
—
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7536