AkramNadwi

শিরোনাম : ফারাহির চিন্তা-চেতনা: কোরআন প্রেমের গল্প।

শিরোনাম : ফারাহির চিন্তা-চেতনা: কোরআন প্রেমের গল্প।

২৩/১১/২০২৫

بسم الله الرحمن الرحيم


মওলানা হামিদুদ্দীন ফারাহীর নাম জ্ঞান ও সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হয়। তাঁর ব্যক্তিত্ব এমন ছিল, যার সামনে হৃদয় ও বুদ্ধি স্বতঃস্ফূর্তভাবে নত হয়ে যেত। তিনি ছিলেন কিতাব ও হিকমতের জগতে এক উজ্জ্বল আলো, আর তাঁর স্মৃতি কোরআনের শিক্ষার্থীদের মনে আকাশী নূরের মতো সজীবতা এনে দেয়। তাঁর শ্রেষ্ঠত্ব ছিল, জীবনের সব পরিশ্রম তিনি তুচ্ছ দুনিয়াবি স্বার্থে নষ্ট করেননি; বরং সেই সমগ্র পুঁজি কোরআনের দরবারে অর্পণ করেছিলেন। তাঁর আত্মা গঠিত হয়েছিল কোরআনের আলো দিয়ে, আর তাঁর নিঃশ্বাসে মিশে ছিল এর অর্থের সুগন্ধ।

শুরু থেকেই মওলানা দীনী ইলিম, ভাষা ও সাহিত্য, বুদ্ধিবৃত্তিক শাস্ত্র এবং তাফসিরের ক্ষেত্রে গভীর অনুরাগী ছিলেন। তিনি বিখ্যাত তাফসির গ্রন্থগুলো বহুবার অধ্যয়ন করেন; তাদের প্রমাণসমূহ পরিমাপ করেন, শৈলী অনুধাবন করেন। কিন্তু খুব তাড়াতাড়ি তাঁর হৃদয় সাক্ষ্য দেয়, এই সব বই থাকার পরও তাঁর জ্ঞানতৃষা অপূর্ণ রয়ে গেছে। তিনি নিজেই জানান, এসব গ্রন্থ তাঁর কাছে এমন লাগত যেন তৃষ্ণার্তের সামনে মরীচিকা, দেখতে যেন জলের মতো, কিন্তু তৃষ্ণা মেটে না, আকুলতা কমে না। এই অশান্ত তৃষাই তাঁকে সরাসরি কোরআনের দিকে টেনে নেয়, এক এমন আলো, যা কোনো মানুষের কলম বা কোনো দর্শনের কৌশলের মুখাপেক্ষী নয়।

যখন তিনি গভীর চিন্তা নিয়ে কোরআনের আয়াতগুলো পড়তে শুরু করলেন, তাঁর সামনে এক নতুন বাস্তবতা উদ্ভাসিত হলো। যেন অন্ধকারে হঠাৎ ভোরের সাদা আলোকরেখা ফুটে ওঠে এবং সেই আলো চারপাশের সব দৃশ্য নির্ভুল করে দেয়। তাঁর হৃদয় উজ্জ্বল হয়ে উঠল, দৃষ্টি পরিশুদ্ধ হলো, আর কোরআনের বার্তা ধারাবাহিক শৃঙ্খলা ও সংযোগসহ তাঁর সামনে উন্মোচিত হতে থাকল। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে কোরআনের অভ্যন্তরীণ বিন্যাস ও সামগ্রিক একতার গবেষণায় প্রবেশ করায়।

মওলানা ফারাহীর গবেষণা দাঁড়িয়ে ছিল দুটি দৃঢ় স্তম্ভের ওপর :

* প্রথমত: আরবি ভাষার সূক্ষ্মতা, গভীরতা এবং তার মূল সৌন্দর্যের পূর্ণ উপলব্ধি;

দ্বিতীয়ত: কোরআনের শব্দ, বাক্য এবং বিষয়সমূহের অভ্যন্তরীণ সামঞ্জস্য ও পরস্পর-সংযুক্ত রূপের গভীর অনুধাবন।

তাঁর বিশ্বাস ছিল, কোরআনের সত্যিকারের বোঝাপড়া ভাষার জ্ঞান দিয়ে শুরু হয়; কিন্তু ভাষা যথেষ্ট নয়, দরকার অন্তরের খাঁটি নিঃস্বার্থতা, মনের পবিত্রতা এবং রূহের নম্র আনতভাব। তিনি শুধু শব্দের অর্থ খোলেননি; বরং তাদের অন্তর্নিহিত হিকমত উদঘাটন করেছেন। এজন্য তাঁর লেখায় কঠোর যুক্তির সঙ্গে ছিল এক সূক্ষ্ম রূহানিয়াতের মিষ্টি প্রবাহ।

মওলানা তাঁর সমগ্র জীবন কাটিয়েছেন এই ধারাবাহিক চিন্তা-ভাবনায়। যৌবনের শক্তি হোক বা বার্ধক্যের দুর্বলতা, সুস্থতা হোক বা অসুস্থতা, কোরআনের সেবা থেকে তিনি কখনো পিছিয়ে যাননি। মাঝে মাঝে মানুষ তাঁকে তিরস্কার করত, কখনো বিদ্রূপ করে বলত যে তিনি অত কঠিন এক পথ বেছে নিয়েছেন। কিন্তু মওলানা তাঁর এই পথকে ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা মনে করতেন না; এটিকে তিনি ঐশী দিশা হিসেবে দেখতেন।

তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন, তাদাব্বুর ছাড়া কোরআনের প্রকৃত পরিচয় পাওয়া অসম্ভব। তাদাব্বুর হিদায়াতকে হৃদয়ে বসায়; আর সেই হিদায়াত মানুষের ভেতরে তাকওয়া, পবিত্রতা, চরিত্র ও আমলের আলো জ্বালায়। কোরআন শুধু জ্ঞানই দেয় না, এটি এক পূর্ণ নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কাঠামো নির্মাণ করে, যা জীবনের প্রতিটি দিককে আলোকিত করে।

মওলানা ফারাহী শুধু কোরআনকে বোঝেননি, তিনি কোরআনকে জীবনব্যাপী যাপন করেছেন। তাঁর চোখে ছিল কোরআনের আলো, জিহ্বায় কোরআনের হিকমত, হৃদয়ে কোরআনের প্রেম, চিন্তায় কোরআনের গভীর রাবিতা। তিনি কোরআনের হয়ে গিয়েছিলেন, আর কোরআন তাঁর হয়ে গিয়েছিল। দুনিয়ার কঠোরতা তাঁকে ক্লান্ত করতে পারেনি; বরং তাঁর অন্তরের জগৎকে আরও প্রশস্ত করে তুলেছিল। দেহ দুর্বল হয়েছে, কিন্তু তাঁর রূহ ক্রমশ উন্নততর হতে থাকল।

এই মর্যাদা সবার জন্য নয়, এটি তাদের প্রাপ্তি, যারা আল্লাহর কিতাবের সঙ্গে সত্যিকারের সম্পর্ক গড়ে তোলে। মওলানা ফারাহীর জীবন শেখায়, অন্তরের প্রকৃত প্রশান্তি, সত্যিকারের পরিচয় এবং স্থির হিদায়াত কেবল কোরআনের গভীর অধ্যয়ন ও তাদাব্বুর থেকেই আসে। যে হৃদয় কোরআনের সঙ্গে এই সম্পর্ক স্থাপন করে, সে দুনিয়ার সংকীর্ণতা থেকে মুক্ত হয়ে নিজের ভেতরেই একটি আল্লাহ প্রদত্ত বিশাল জগত আবিষ্কার করে।

এই পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর নিম্নোক্ত বক্তব্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি “نظام القرآن” গ্রন্থের ভূমিকায় লিখেছেন—

“আমি তাফসিরের বইগুলো গভীর মনোযোগে পড়েছি; তাদের প্রতিটি কোণ আমি খুঁজে দেখেছি ও যাচাই করেছি। কিন্তু সেখানে আমি এমন কিছু পাইনি, যা তৃষ্ণার্তের কাছে পানি বলে মনে হয়, বাস্তবে যা কেবল মরীচিকা। আমার তৃষ্ণা নিবারণ হয়নি; বরং আরও বেড়েছে। হৃদয়ের জ্বালা আরও তীব্র হয়েছে, এবং অন্তর আগুনের মতো জ্বলতে শুরু করেছে।”

তিনি বলেন, “আমি তাই কোরআনের গভীর চিন্তা-ভাবনা এবং তার বিস্তৃত অর্থের দিকে মনোযোগ দিলাম এবং মানুষের কথাবার্তা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলাম। শুরুটা এমন ছিল যে, যখন আমি আয়াতগুলোর নক্ষত্রের মাঝে তাকিয়ে তাকিয়ে চলেছি, হঠাৎ তাদের উঁচু দিগন্তে তাদের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য ও বিন্যাস সাদা সূতার মতো জ্বলজ্বল করে উঠল, আর সেই আলো ক্রমেই বাড়তে থাকল। এর ফলে হৃদয়ের পর্দা সরে গেল, চোখের ধুলো ঝরে পড়ল, আমি আমার লক্ষ্যকে চিনে নিলাম, পথনির্দেশ স্পষ্ট হয়ে গেল, এবং আমি কোরআনের বিন্যাস, তার গঠনপদ্ধতি ও সংযোগের বিস্ময়গুলো নিয়ে গভীরভাবে ভাবতে শুরু করলাম।”

নিজের বয়স ও জীবনের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এই চিন্তা-মননেই আমি জীবনের বড় একটি অংশ কাটিয়ে দিয়েছি; আমার সেরা বয়সও এতে ব্যয় করেছি। এমনকি যখন যৌবন বিদায় নিল, বৃদ্ধাবস্থার তিক্ততা এল, রোগব্যাধি ও কষ্ট আমাকে আক্রমণ করল, তখনও আমি থামিনি। মানুষ আমাকে দোষ দিল, শত্রুরা বিদ্রূপ করল, বলল, আমি কঠিন পথ বেছে নিয়েছি, কঠিন কাজের বোঝা কাঁধে নিয়েছি। কিন্তু তবুও আমি এসব কাজে লেগেই রইলাম এবং কখনো কমতি করিনি; মনে হলো যেন আকাশের কোনো শক্তি আমাকে এ দিকেই টেনে নিচ্ছে।”

হিদায়াত সম্পর্কে তিনি বলেন, “নিয়ম-সংগঠন বুঝার উদ্দেশ্য শুধুই গভীর চিন্তা, আর চিন্তাই এর স্বাভাবিক ফল। আর কোরআনে গভীর চিন্তা-ভাবনা মানুষের জন্য হিদায়াত ও তাকওয়ার মাধ্যম, যা দুটোই মূল ভিত্তি। মানুষ হিদায়াতের মাধ্যমে নিজের নফসকে অন্তর্দৃষ্টি দেয়, আর তাকওয়ার মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি অর্জন করে। ঈমান তার জ্ঞানশাখাসহ হিদায়াতের ভেতরেই অন্তর্ভুক্ত, আর শরিয়ত, চরিত্র ও আচরণ, সবই তাকওয়ার আওতায় আসে।” (دلائل النظام, পৃ. ২১)

মাওলানা ফারাহির সমগ্র জীবনের সারসংক্ষেপ হলো, কোরআন শুধু পড়ার বস্তু নয়; বরং বুঝে পড়া, গভীরভাবে চিন্তা করা, এবং তারপর তার আলোকে জীবন গঠন করার বই। যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে এ পথে এগোতে চায়, তার অন্তরে এমন এক আলো জন্ম নেয় যা তাকে প্রতিটি অন্ধকার থেকে রক্ষা করে।

————–

| ক্যাটাগরি : স্মৃতিচারণ, কোরআন, তাজকিয়াহ, ইসলামি চিন্তাধারা।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍️ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7717

 

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *