AkramNadwi

শিরোনাম : ফতোয়া চাইলে ও ফতোয়া দিলে: দু’জনের দায়িত্ব।

শিরোনাম : ফতোয়া চাইলে ও ফতোয়া দিলে: দু’জনের দায়িত্ব।
——————–

গতকাল আমি “তাকলিদ” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম, যা উপমহাদেশ ছাড়াও ইউরোপ ও আমেরিকার মুসলমানরা অত্যন্ত উপকারী বলে মনে করেছেন। কিছু বন্ধু তা আলাদা করে প্রকাশ করার ইচ্ছাও প্রকাশ করেছেন। আলহামদুলিল্লাহ আলা জালিক।

এই প্রসঙ্গে দূরদর্শী আলিমে দ্বীন মাওলানা মুহিউদ্দীন গাজী সাহেব একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন। তাঁর বক্তব্য হলো:

“তাকলিদের সৌন্দর্য আসলে ইজতিহাদের সাথে মিলেমিশে আছে। একদিকে সাধারণ মানুষ তাকলিদ করবে আর অন্যদিকে আলেমরা ইজতিহাদ করবেন, তাহলে তাকলিদের উপর কোনো আপত্তির অবকাশ থাকে না। সমস্যা হলো, শুধু সাধারণ মানুষ নয়, আলেম এবং বড় আলেমদেরও তাকলিদের বাঁধনে বেঁধে দেওয়া হয়েছে, যার ফলে ইজতিহাদের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে। এখান থেকেই তাকলিদকে ইজতিহাদের বিপরীত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে এবং সমালোচিত করা হয়েছে। অথচ বাস্তবে তাকলিদ ইজতিহাদের বিপরীত নয়, তাকলিদ ইত্তিবার (অনুসরণ)-এরও পরিপন্থী নয়।

যদি তাকলিদকে ওষুধের সাথে তুলনা করা হয়, তবে বলা যায়—সাধারণ ডাক্তার ওষুধের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী ব্যবহার করে, আরেকদিকে চিকিৎসা-গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো ওষুধ নিয়ে গবেষণা ও পরীক্ষা চালিয়ে যায়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে তাকলিদ গবেষণা ও ইজতিহাদের সেই প্রতিষ্ঠানকেই কার্যত বিলুপ্ত করে দিয়েছে। এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আপনার অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ মতামত জানতে চাই, সম্মানিত ড. আকরাম সাহেব।

উত্তর

দ্বীনের ব্যাখ্যায় প্রায়ই খাবার বা ওষুধের উদাহরণ দেওয়া হয়, এবং এই উদাহরণ মোটের ওপর সঠিকও বটে। তবে এটাও জেনে রাখা দরকার যে কোনো উপমা কখনো সর্বাঙ্গীণ হয় না; কিছু ক্ষেত্রে মিল থাকে, আবার কিছু দিক ভিন্নও থেকে যায়।

খাদ্য ও ওষুধের প্রভাব দেখানোর জন্য সচেতন ইচ্ছা বা চাওয়ার প্রয়োজন হয় না। মানুষ যদি অজ্ঞানও থাকে বা উন্মাদও হয়, তবুও খাদ্য ও ওষুধ তার ওপর প্রভাব ফেলে। কিন্তু আল্লাহর ইবাদত এই দিক থেকে ভিন্ন। ইবাদতের আসল সত্যতা নির্ভর করে বুদ্ধি ও ইচ্ছার উপর। যে ইবাদতে চেতনা ও ইচ্ছা নেই, তা ইবাদতই নয়।

যে জ্ঞান অন্বেষণ করে তাকে বলা হয় “তালিব”, আর এ নামটি “শাগরিদ” বা “তালমিজ” থেকে উত্তম; কারণ এতে চাওয়া ও ইচ্ছার তাৎপর্য প্রকাশ পায়। এজন্যই সুফিয়াগণ সলিকের জন্য “মুরিদ” শব্দটি বেছে নিয়েছেন, যাতে ইচ্ছার সুস্পষ্ট অর্থ রয়েছে। যদিও সময়ের সাথে সাথে শব্দটি তার অন্তরের প্রাণশক্তি হারিয়ে কেবল একটি নিষ্প্রাণ পরিভাষা হয়ে গেছে।

তলব (চাওয়া) ও ইরাদা (ইচ্ছা)-এর থেকেও উন্নত শব্দ হলো “নিয়ত”। তলব ও ইরাদা কেবল মানসিক আগ্রহ বোঝায়, কিন্তু নিয়তে যুক্ত হয় বুদ্ধি ও হৃদয় দুটোই। নিয়তের মধ্যে থাকে একমাত্র আল্লাহর জন্য ইখলাস, যা বুদ্ধি ও হৃদয়ের মিলনে কর্মকে চালিত করে। তাই নিয়তই আসলে ইবাদতের প্রাণ।

তাকলিদের সবচেয়ে বড় ক্ষতি এই যে এতে চেতনা ও ইচ্ছার অভাব ঘটে। মানুষ যখন কোনো কথার প্রমাণ না বুঝেই কেবল কারও বক্তব্যকে মেনে নেয়, তখন তার প্রচেষ্টা থাকে না সেই কথা বোঝার বা এর প্রজ্ঞা অনুধাবনের। বরং সে কেবল আনুষ্ঠানিক অনুসরণে সন্তুষ্ট থাকে।

কুরআন কারীম ও হাদিসে নববী (সা.)-এর খিতাব মানবীয় বুদ্ধিকে কেন্দ্র করে এসেছে। কারণ বুঝেশুনে ইচ্ছার গঠন সম্ভব নয়, আর বোঝা মানেই হলো জ্ঞান ও বুদ্ধির সম্মিলন।

যদি কারও মনে দ্বীন সম্পর্কিত কোনো প্রশ্ন আসে, তবে তার কর্তব্য হলো নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী উত্তর বোঝার চেষ্টা করা। এজন্য তাকে একজন নির্ভরযোগ্য আলেমকে খুঁজে বের করতে হবে। এটাই মুস্তাফতির জন্য শর্ত।

একইভাবে মুফতির দায়িত্বও হলো, যখন উত্তর দেবেন, তখন সাইলের স্তরে নেমে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন। তিনি জানাবেন—কুরআনে এ হুকুম সম্পর্কে কী বলা হয়েছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ কীভাবে তার ব্যাখ্যা দিয়েছেন, এবং বুদ্ধির আলোকে এর হিকমত কীভাবে বোঝা যায়। কাজেই মুফতির দায়িত্ব কেবল ফতোয়া দিয়ে থেমে যাওয়া নয়, বরং তা বোঝানোও।

যদি মুস্তাফতি ও মুফতি দুজনই তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেন, তবে উভয়ের জ্ঞান বাড়বে, তাদের নিয়ত ও ইচ্ছা ইবাদত ও আনুগত্যে আরও দৃঢ় ও শক্তিশালী হবে। এর ফলে সাধারণ মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি পাবে, তার ঈমান তরতাজা হবে, আর তার দ্বীনি অবস্থা ক্রমে উন্নত হবে।

এই উদ্দেশ্যেই আমরা “ইত্তিবা” শব্দটিকে অগ্রাধিকার দিই। কারণ “তাকলিদ” শব্দে অচেতনা ও অজ্ঞতার দিক বিদ্যমান।

আল্লাহ তা‘আলা আমাদের জ্ঞান, ঈমান ও আমলে বৃদ্ধি দান করুন, এবং আমাদের ইবাদত ও আনুগত্যে প্রাণশক্তি ও জীবন্ততা প্রদান করুন। আমীন।

——————–
ক্যাটাগরি : ইসলামি চিন্তাধারা, ফিকাহ, শিক্ষা।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ

🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7080

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *