|২৮|০১|২০২৬|
❖ প্রশ্ন
আসসালামু আলাইকুম শায়খ, আশা করি আপনি ভালো আছেন। আমার পরিচিত একজন এই প্রশ্নটি করেছেন। এ বিষয়ে পরামর্শ চাই ?
“আমার এক বোন আছে, সে একেবারেই ছোট, পুরো নয় বছরও পূর্ণ হয়নি। তার মাসিক শুরু হয়েছে, অথচ সে কিছুই জানে না। আমরা সব সময় তাকে এমনভাবে লালন করেছি, যেন সে এখনো নয় মাসের শিশুই। সে ভীষণ ভয় পেয়েছে, দায়িত্ব বহন করার মানসিকতা তার নেই। রোজা রাখা বা পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার মতো বিষয় তার জন্য খুবই কঠিন। এ বিষয়ে শরিয়তের হুকুম কী, দয়া করে জানাবেন।”
❖ উত্তর
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ। আল্লাহ তাআলা যেন এই সংবেদনশীল বিষয়ে সহজতা ও প্রজ্ঞা দান করেন। আপনি যে পরিস্থিতির কথা বলেছেন, তা নিঃসন্দেহে আবেগগত ও বাস্তব, উভয় দিক থেকেই কঠিন। এ ক্ষেত্রে শরিয়তের বিধান স্পষ্টভাবে বোঝা যেমন জরুরি, তেমনি প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোমলতা ও সহমর্মিতা অপরিহার্য।
এ বিষয়ে মূলনীতি হলো, ইসলামি শরিয়ত দায়িত্ব আরোপ করে বুলূঘ বা বয়ঃসন্ধির ওপর; বয়স, আবেগগত পরিপক্বতা বা মানসিক বিকাশের ওপর নয়। দায়িত্ব যেন অস্পষ্ট বা ব্যক্তিনির্ভর না থাকে, সে জন্য শরিয়ত বুলূঘ নির্ধারণের জন্য স্পষ্ট ও বস্তুগত লক্ষণ নির্ধারণ করেছে। কন্যার ক্ষেত্রে বুলূঘের প্রথম ও সুস্পষ্ট লক্ষণ হলো ঋতুস্রাব শুরু হওয়া। অতএব, কোনো মেয়ের মাসিক শুরু হলে, (সে নয় বা দশ বছরের হলেও) শরিয়তের দৃষ্টিতে সে বালিগাহ ও মুকাল্লাফাহ হিসেবে গণ্য হয়। আর যদি মাসিক না হয়, তবে পনেরো চন্দ্রবছর পূর্ণ হওয়াকে বুলূঘের চূড়ান্ত সীমা ধরা হয়।
এই বিধান কোনো একক মাযহাবের মত নয়; বরং চার সুন্নি মাযহাবের সকল ফকিহের ঐকমত্যে প্রতিষ্ঠিত। হানাফি মাযহাবে ইমাম কাসানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, নারীদের ক্ষেত্রে বুলূঘের লক্ষণ হলো ঋতুস্রাব ও গর্ভধারণ; আর ঋতুস্রাবের সর্বনিম্ন বয়স নয় বছর। অতএব, কোনো মেয়ে নয় বছর পূর্ণ হওয়ার পর ঋতুস্রাব শুরু করলে সে বালিগা হিসেবে গণ্য হবে। শাফেয়ি মাযহাবে ইমাম নববী রাহিমাহুল্লাহ লিখেছেন, কোনো কন্যা নয়টি চন্দ্রবছর পূর্ণ হওয়ার পর ঋতুস্রাব শুরু করলে সে বালিগা হয়ে যায় এবং শরিয়তের বিধান পালনে বাধ্য হয়। মালেকি মাযহাবে ইমাম দাসূকী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, নারীর বুলূঘের লক্ষণ হলো নয় বছর পূর্ণ হওয়ার পর ঋতুস্রাব, অথবা গর্ভধারণ, অথবা পনেরো চন্দ্রবছর পূর্ণ হওয়া। আর হাম্বলি মাযহাবে ইমাম ইবনে কুদামাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, নারী ঋতুস্রাব, গর্ভধারণ, লোম উদ্গম কিংবা পনেরো বছর পূর্ণ হওয়ার মাধ্যমে বালিগা হয়; আর ঋতুস্রাবের সর্বনিম্ন বয়স নয় বছর।
এই সুস্পষ্ট উদ্ধৃতিগুলোর আলোকে নির্ধারিত হয় যে, চার মাযহাবের মতে নয় চন্দ্রবছর পূর্ণ হওয়ার পর কোনো কন্যার ঋতুস্রাব শুরু হলে সে শরিয়তের দৃষ্টিতে বুলূঘে উপনীত হয় এবং তার ওপর শরিয়তের বিধান কার্যকর হয়। ফলে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ হয়, রমজানের রোজা ফরজ হয়, পর্দা ও শালীনতার বিধান প্রযোজ্য হয়, এবং অন্যান্য ধর্মীয় দায়িত্বও তার ওপর বর্তায়, যেমনটি একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারীর ক্ষেত্রে হয়।
তবে একই সঙ্গে এ কথাও স্মরণ রাখতে হবে যে, শরিয়ত রহমতের ওপর প্রতিষ্ঠিত এবং প্রকৃত কষ্টকে উপেক্ষা করে না। এত অল্প বয়সে রোজা রাখলে যদি তীব্র দুর্বলতা দেখা দেয়, অথবা স্বাস্থ্যের ক্ষতির বাস্তব আশঙ্কা থাকে, তবে শরিয়ত সাময়িকভাবে রোজা না রাখার অনুমতি দেয়। সে ক্ষেত্রে রোজার ফরজিয়ত বাতিল হয় না; বরং সক্ষম হলে পরে তা আদায় করার সুযোগ দেওয়া হয়।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যদিও তাকলিফ বুলূঘের সঙ্গে সম্পর্কিত, বুদ্ধিবৃত্তিক বা আবেগগত পরিপক্বতার সঙ্গে নয়, তবু এর অর্থ এই নয় যে শিশুর সঙ্গে কঠোরতা করা হবে বা হঠাৎ করে সব বিধানের বোঝা তার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হবে। শিশুর দায়িত্বের পাশাপাশি পিতা-মাতা ও অভিভাবকদের ওপরও একটি গুরুদায়িত্ব বর্তায়। তাদের কর্তব্য হলো প্রজ্ঞা, স্নেহ ও ধৈর্যের সঙ্গে সন্তানকে ধর্মীয় দায়িত্বের জন্য ধাপে ধাপে প্রস্তুত করা, সম্ভব হলে বুলূঘের আগেই। লক্ষ্য হওয়া উচিত, সন্তান যেন ধর্মকে ভয় বা চাপের উৎস হিসেবে না দেখে; বরং আল্লাহর নৈকট্য, প্রশান্তি ও মর্যাদার পথ হিসেবে গ্রহণ করে।
একটি অল্পবয়সী কন্যাশিশুর কাছ থেকে হঠাৎ করে, কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই, সব ধর্মীয় দায়িত্ব পূর্ণমাত্রায় বহন করার প্রত্যাশা করা উচিত নয়। নবী সা. যেমন শিশুদের ধীরে ধীরে নামাজের অভ্যাস গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়েছেন, তেমনি লজ্জাশীলতা, পোশাকবিধি ও ধর্মীয় সচেতনতাও ধাপে ধাপে, তার বয়স ও মানসিক অবস্থার উপযোগী করে শেখানো প্রয়োজন। প্রাথমিক পর্যায়ে সহজ-সরল পোশাক, সামগ্রিক শালীনতা এবং হায়ার অনুভূতির ওপর গুরুত্ব দেওয়া যেতে পারে; হিজাবের পূর্ণ ধারণা ও তার বিধান সময়ের সঙ্গে কোমলভাবে বোঝানো উচিত।
শিশুটি যদি ভুল করে, ভয় পায় বা নিয়মিতভাবে মানিয়ে নিতে কষ্ট বোধ করে, তবে কঠোরতা বা ভর্ৎসনা এড়িয়ে চলা জরুরি। কারণ কঠোরতা প্রায়ই উল্টো ফল দেয় এবং ধর্মের প্রতি অনীহা সৃষ্টি করতে পারে। এর পরিবর্তে স্নেহভরা ব্যাখ্যা, আশ্বাস, উৎসাহ এবং আন্তরিক দুআর আশ্রয় নেওয়াই সঠিক পথ। এ ক্ষেত্রে মা, বড় বোন ও নিকটবর্তী নারী আত্মীয়দের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা যদি নিজেরাই মর্যাদা ও ভারসাম্যের সঙ্গে নামাজ, শালীনতা ও হিজাব পালন করেন, তবে সেই জীবন্ত দৃষ্টান্তই হয়ে ওঠে সবচেয়ে শক্তিশালী শিক্ষা, কারণ শিশুরা শোনার চেয়ে দেখেই বেশি শেখে।
মেয়েটি যখন কোনো ভালো কাজ করে, নামাজ আদায় করে বা শালীনতা রক্ষা করে, তখন তাকে প্রশংসা করা উচিত এবং তার মূল্যবোধ জাগ্রত করা দরকার। তার বয়সের উপযোগী ভাষায়, কোমল ভঙ্গিতে তাকে স্মরণ করিয়ে দেওয়া যেতে পারে যে আল্লাহ তার চেষ্টা ভালোবাসেন এবং তার আন্তরিকতাকে পুরস্কৃত করেন। যদি সে প্রতিরোধ দেখায় বা অতিভার অনুভব করে, তবে তা ধৈর্য ও বোঝাপড়ার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে; কারণ এই সংবেদনশীলতা তার বিকাশপর্বেরই অংশ, আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্ব ও স্থিরতা আপনাতেই আসবে।
এছাড়া তাকে বুঝতে সাহায্য করতে হবে যে হিজাব ও ধর্মচর্চা কেবল কিছু বিধিনিষেধ নয়; বরং তা সম্মান, সুরক্ষা ও পরিচয়ের প্রতীক, যার উদ্দেশ্য তার মর্যাদা সংরক্ষণ করা এবং আল্লাহর সঙ্গে তার সম্পর্ককে দৃঢ় করা, তার আনন্দ বা শৈশব কেড়ে নেওয়া নয়।
—————-
ক্যাটাগরি : ফাতাওয়া, ফিকাহ, উসরাহ, উপদেশ
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8295