AkramNadwi

শিরোনাম : প্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিবাহ ৬/৩/২০২৬ প্র

শিরোনাম : প্রাপ্তবয়স্ক কন্যার বিবাহ
৬/৩/২০২৬

প্রশ্ন:
একজন নারী তালাকের পর নিজের কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে থাকেন। কন্যাটি প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর তিনি তার বিয়ে দেন, কিন্তু সেখানে পিতার অনুপস্থিতিতে নানা (মাতামহ) কে অভিভাবক (ওলি) করা হয় এবং প্রাক্তন স্বামীকে এ বিষয়ে কিছুই জানানো হয় না। প্রশ্ন হলো, ওলির অনুমতি ছাড়া কি এই বিয়ে বৈধ? হানাফি মাযহাবের মতে ওলি ছাড়াও বিয়ে বৈধ, অন্যদিকে অন্যান্য ইমামদের মতে তা অবৈধ। কুরআন-হাদিসের আলোকে কোন মতটি অধিক গ্রহণযোগ্য?

উত্তর:
ইসলামী ফিকহে বিবাহের নীতিমালা ও শর্ত নির্ধারণ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, বিশেষত প্রাপ্তবয়স্ক নারীর স্বাধীনতা এবং ওলির অনুমতির প্রসঙ্গে। এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। তবে মূলনীতি হচ্ছে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী স্বাধীন, সচেতন এবং নিজ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সক্ষম একটি সত্তা; তার নিজের সম্মতিই বিবাহের বৈধতার জন্য মৌলিক ও যথেষ্ট।

কুরআনে “তানকিহু” ও “ইয়ানকিহনা” শব্দগুলোর ব্যবহারে নারীকেই ক্রিয়ার কর্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়, বিবাহের ক্ষেত্রে নারীকে সক্রিয় ভূমিকা দেওয়া হয়েছে এবং তার সম্মতিকে কেন্দ্রস্থলে রাখা হয়েছে। অতএব, প্রাপ্তবয়স্ক নারীর সম্মতি ছাড়া তার বিয়ে সম্পন্ন করা কুরআন-সুন্নাহর চেতনার পরিপন্থী।

হানাফি মাযহাবের দৃষ্টিতে, প্রাপ্তবয়স্ক কন্যা ওলির অনুমতি ছাড়াও নিজ বিবাহ সম্পন্ন করতে পারে। কারণ, সে নিজের বিবেচনা-বুদ্ধি দ্বারা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্ণ যোগ্যতা রাখে। যদি বিবাহের অন্যান্য শর্ত—যেমন ঈমান, সদিচ্ছা এবং শরয়ি বিধানসমূহ পূর্ণ থাকে, তবে কন্যার সম্মতিই যথেষ্ট; ওলির উপস্থিতি অপরিহার্য নয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি মানুষের স্বাধীনতা ও শরিয়তের অন্তর্নিহিত চেতনার সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ। এটি প্রাপ্তবয়স্ক নারীর বোধ, বিচারশক্তি ও আত্মনিয়ন্ত্রণকে স্বীকৃতি দেয় এবং তাকে নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে দায়িত্বশীল করে তোলে।

অন্যদিকে, শাফেয়ি, হাম্বলি ও মালিকি মাযহাবের মতে ওলির অনুমতি অপরিহার্য শর্ত। তাদের দলিল সেই হাদিস “ওলি ছাড়া কোনো বিবাহ নেই” যা থেকে তারা ওলির উপস্থিতিকে আবশ্যিক বলে গণ্য করেন।

তবে প্রাপ্তবয়স্ক নারীর প্রসঙ্গে হানাফি মতটি অধিক যুক্তিসংগত ও মানবিক বলে প্রতীয়মান হয়। কারণ, একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী নিজের কল্যাণ-অকল্যাণ বুঝতে এবং সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম; তার সম্মতিই বিবাহের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত।

কুরআন ও সুন্নাহর সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গিও এই মতের পক্ষে অধিক শক্তিশালী। কুরআনে বিবাহের মৌলিক উপাদান (ঈমান, পারস্পরিক সম্মতি ও সদিচ্ছা) স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে (সূরা নিসা ৪:২১)। একইভাবে হাদিসেও প্রাপ্তবয়স্ক নারীর সম্মতির গুরুত্ব সুস্পষ্ট। বিবাহের প্রকৃত লক্ষ্য হলো, দুই পক্ষের আন্তরিক সম্মতি ও কল্যাণকামী মনোভাব নিয়ে একটি পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া। যদি সেই সম্মতি বিদ্যমান থাকে, তবে ওলির অনুপস্থিতি এই লক্ষ্যকে ব্যাহত করে না; বরং তা নারীর স্বাধীন চেতনা ও পরিপক্বতারই স্বীকৃতি বহন করে।

এই আলোকে বলা যায়, যদি প্রাপ্তবয়স্ক কন্যা নিজের সম্মতিতে বিবাহ সম্পন্ন করে এবং ওলি হিসেবে নানাকে মনোনীত করে, তবে হানাফি মত অনুযায়ী এ বিবাহ শরয়ি ও আইনগতভাবে বৈধ, শর্ত এই যে, তার সম্মতি সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান থাকা লাগবে।

এই মত শুধু কুরআন-সুন্নাহর দৃষ্টিকোণ থেকেই শক্তিশালী নয়; বরং এটি মানবিক স্বাধীনতা, সচেতনতা ও দায়িত্ববোধেরও পূর্ণ স্বীকৃতি দেয়।

———-

ক্যাটাগরি : ফিকাহ, ফাতাওয়া, শিক্ষা, উপদেশ।
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8791

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *