শিরোনাম : …….প্রাণের দৌড় মসজিদের পথে।
————-
بسم الله الرحمن الرحيم.
মনে বিষণ্নতা, হৃদয় নিস্তেজ ও নির্জীব। বুক ভরে আছে ব্যথাভরা দীর্ঘশ্বাসে, চারপাশে শুধু শোকের দৃশ্য। খাবার-দাবার থেকে ক্লান্তি, খেলা-ধুলা থেকে বিতৃষ্ণা, শহর ও বাজারের কোলাহলে কোনো টান নেই, অপরিচিতদের আড্ডায়ও কোনো সাযুজ্য নেই। এসব আসরে মন শুধু গুমরে ওঠে।
কিন্তু উচ্চাভিলাষ নেই, দূরদৃষ্টি নেই, চিন্তায় কোনো আলোড়ন নেই, নদীতে কোনো তরঙ্গ নেই। জ্ঞানী ও শিল্পীদের সঙ্গেও আকর্ষণ নেই, কারণ তাদের মন-চোখ কলুষিত। তারা প্রত্যেকে বুদ্ধির জালে প্রতারিত, যুক্তির কৌশলে চতুর, আর বইয়ের জ্ঞান নিয়ে নির্ভীক। তাদের কাছে আত্মার রহস্য উন্মোচন অপেক্ষা নির্জীব তত্ত্বের প্রদর্শনই বেশি মূল্যবান। তাদের দৃষ্টি প্রজ্ঞার আলোশূন্য, গোলাপ আর কাঁটার ভেদাভেদ তারা চেনে না।
হায়! যে দুঃখ চেনে না সে আমাকে চিনবে কিভাবে? যে বেদনার সাথী নয় সে-ই বা আমার সাথী কোথায়?
এই দুনিয়ায় নেই কোনো প্রশান্তি, নেই আত্মার শান্তি, নেই নিরাপত্তা। নেই মমতার ছাপ, নেই বিশ্বস্ততার চরিত্র। এখানে জীবন মানে কেবল দিন-রাতের অবিরাম আবর্তন। জীবন মানে অচেতনতা, মত্ততা আর ঘুম। জীবন মানে পথহীন যাত্রা, আর ব্যর্থ দৌড়ঝাঁপ।
এই পরিবেশে নেই ধৈর্যের শক্তি, নেই বিবাহিত জীবনের কষ্ট বহনের সামর্থ্য। সবার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলাম, দুঃখভরা মনকে করলাম সঙ্গী। ব্যথাভরা সুরকে বানালাম আমার মূল্যবান সম্বল, আর রওনা হলাম মসজিদের পথে।
সেখানে আছে অলৌকিক সুধার পানশালা—যেখানে ইয়ারের সাক্ষাৎপিয়াসীরা মত্ত। সেখানে আছে এমন স্বচ্ছ পানীয়, যা প্রিয়তমার রূপ থেকেও অধিক সুস্বাদু ও মিষ্টি। সেখানে হৃদয় জীবন্ত, দীপ্ত, বেদনাভরা অথচ আনন্দময়। সেখানে আছে এমন আর্তনাদ যা পাহাড়ভেদী। সেখানে শেখানো হয় ঈগলের মতো সাহস আর উড্ডয়ন।
সেখানে নেই সময়-স্থান-পরিস্থিতির একঘেয়েমি। নেই নিরসতা, নেই স্থবিরতা। প্রতিটি মুহূর্ত নতুন অভিজ্ঞতা, প্রতিটি ক্ষণ নতুন এক ভ্রমণ। বাইরের দুনিয়ায় স্থিরতা, অথচ এখানে সকাল, দুপুর, সন্ধ্যা—সবসময়ই নিয়তি পরিবর্তিত হয়। বাইরে নীরবতা, এখানে নেই ভূমিকম্প থেকে অবকাশ।
মসজিদে রয়েছে সেই অদ্বিতীয় কাঙ্ক্ষিত সত্তা, অতুলনীয় প্রিয়তম—যাঁর সন্ধানে মগ্ন মন দুনিয়ার সবকিছু ভুলে যায়। এখানে আছে প্রেয়সীর প্রতিফলন, রবের তাজাল্লি। এখানে মাটিতে কপাল রাখলে কপাল ও দৃষ্টি হয় দীপ্ত ও পবিত্র, আর ফেরেশতারা ঢেলে দেয় নিজেদের পরশ।
যখন কপাল জমিনে পড়ে, সেই এক সিজদার সামনে গোটা দুনিয়া তুচ্ছ মনে হয়। এখানে আছে শাসকদের দানও, রাজাদের মহিমাও, অথচ ধূলার ভেতরও আছে প্রিয়জনের ভালোবাসার ঘ্রাণ। এখানে দুঃখ নয়, আছে প্রিয়তমের বার্তা। এখানে প্রশান্ত বাতাস, আত্মাকে সান্ত্বনা দেয়া সুবাসিত হাওয়া।
মসজিদের বাইরে বাতি নিভে গেছে, অথচ মসজিদের ভেতর জ্বলছে উজ্জ্বল সূর্য, যার উৎস হলো হৃদয়ের আগুন ও আত্মার শিখা। এখানে জ্বলে অনন্ত সৌন্দর্য ও চিরন্তন ভালোবাসার প্রদীপ। এখানে জীবন নির্ভর করে না ইস্রাফিলের শিঙায়, এখানে আছে আন্তরিকতা ও পবিত্রতা—নেই প্রতারণার ফাঁদ।
এখানে শান্তি এমন, যা বন্ধুদের অনুকম্পা কিংবা শত্রুদের সহনশীলতার ওপর নির্ভরশীল নয়। এখানে সাহসী পুরুষরা শেখে নৈকট্য থেকে আরও নৈকট্যের পাঠ। এখানে হৃদয় দীপ্ত, প্রাণ উত্তপ্ত, চোখ অশ্রুভরা, আর দীর্ঘশ্বাস জ্বালাময়।
মসজিদে এমন ব্যথা আছে, যা লুকানো ব্যথাকেও প্রকাশ করে। এখানে চিকিৎসার নিয়ম ভিন্ন। এখানে এমন পানীয় দেয়া হয় যা আরও জ্বালায়, আরও ব্যথা বাড়ায়। এখানে মেলে এমন আগুন, যা হৃদয়কে আজীবন জ্বালাতে থাকে, যার উষ্ণতা কখনও ফুরায় না।
এখানে মেলে প্রেমের সেই উপহার, যা হৃদয়কে কান্নায় ভরিয়ে দেয়। এখানে জীবন মানে নিজের আগুনে পুড়ে যাওয়া। এখানে আছে ভোরের হাহাকার, যেখানে সকালের পাখিরা ব্যাকুল হয়ে ওঠে। এখানে হৃদয়বিদারক সুর, এখানে ব্যথার প্রতিষেধক, এখানে এমন সঙ্গীত যা অন্য কোনো বাগানে নেই। এখানকার গান এই বাগানেরই নিজস্ব সৃষ্টি, যা হৃদয়কে বিদ্ধ করে।
এখানে অতিথি হয় শোকার্তরা, দুঃখভারাক্রান্তরা। এখানকার বিলাপ সময়ের যাদুতে থামে না। এখানকার সুরে আছে জগতের বেদনার চিকিৎসা, মলিন হৃদয়ের আরোগ্য।
মসজিদে আছে ফেরেশতাদের সঙ্গ, পবিত্র আত্মাদের সাহচর্য। এখানেই জন্ম নেয় সিদ্দীক ও ফারুক, সেই শাহিনেরা যাদের জীবন সত্য ও মমতায় পূর্ণ, যাদের চরিত্র দার্শনিক, যাদের জৌলুস সম্রাজ্ঞীর মতো। তারা আত্মমর্যাদাসম্পন্ন, উদার, কোমল হৃদয়, প্রখর বুদ্ধি, সতেজ মস্তিষ্ক। তাদের কথা হৃদয়কাড়া, দৃষ্টি তীক্ষ্ণ, নিঃশ্বাস উজ্জ্বল, সিজদা মধুময়, আর তারা হয়ে ওঠে চিরন্তন প্রেমের শহীদ।
মসজিদের দরজা সবসময় খোলা। সবসময় ধ্বনিত হয় অভ্যর্থনার ডাক: “স্বাগতম! এসো এসো!” গৃহস্বামী পূর্ণ করেন প্রতিটি আকাঙ্ক্ষা, মঞ্জুর করেন সব মনোবাঞ্ছা।