খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ ও আবু তালিবের মৃত্যুর পরবর্তী বছরগুলো নবী মুহাম্মাদ সা. এর জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আত্মিকভাবে গভীর সময়গুলোর একটি। হিজরতের প্রায় তিন বছর আগে সংঘটিত এই ঘটনাগুলো এমন এক ধারাবাহিক পরীক্ষা ও ঐশী অনুগ্রহের সূচনা করে, যার মাধ্যমে নবীর (সা.) আল্লাহর প্রতি পূর্ণ আস্থা ও তাওয়াক্কুল শুধু উদ্ভাসিতই হয়নি, বরং পরিপূর্ণতা লাভ করেছে।
প্রথম যুগের মুসলিম ইতিহাসবিদরা এই বছরকে এমন একটি সময় বলে বর্ণনা করেন, যখন বিপদ একের পর এক তাঁর ওপর নেমে আসে। তাঁর সবচেয়ে বিশ্বস্ত সঙ্গী ও ইসলামের প্রথম সমর্থক খাদিজা রা. এর মৃত্যু, আর তার কিছু পরেই আবু তালিবের ইন্তেকাল, যিনি দশ বছরেরও বেশি সময় তাঁর প্রকাশ্য দাওয়াতের পুরো সময় তাঁকে রক্ষা ও সমর্থন করে এসেছিলেন।
তাদের বিদায়ে নবী সা. ঘরের অভ্যন্তরের সান্ত্বনা যেমন হারালেন, তেমনি হারালেন গোত্রীয় নিরাপত্তার বাহ্যিক ভরসাও। মানবিক দৃষ্টিতে তিনি হয়ে গেলেন পৃথিবীর সব ধরনের সমর্থনহীন।
ইসলামের একেবারে প্রারম্ভিক যুগে খাদিজা রা. এর ভূমিকা ছিল ভিত্তির মতো। তিনিই প্রথম ঈমান আনেন, প্রথম সান্ত্বনা দেন, এবং প্রথম উপলব্ধি করেন অবতীর্ণ হওয়া ওহির গুরুত্ব। বিপদের মুহূর্তে তিনি দিতেন পরিষ্কার বোঝাপড়া, ভয়ের মুহূর্তে আশ্বাস, আর চ্যালেঞ্জের সময় অটল সাহস। তাঁর ঘর ছিল নবীর জন্য এক আশ্রয়কেন্দ্র , শান্তির জায়গা, আবেগের আশ্রয়, এবং নিঃশর্ত সমর্থনের নিবিড় পরিমণ্ডল। তাঁর মৃত্যু নবী সা. এর জীবন থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ সঙ্গীর বিদায় ঘটায়, ওহি যুগের সূচনালগ্ন থেকে যিনি তাঁর ছায়াসঙ্গী ছিলেন।
এর কিছু পরেই আবু তালিবের ইন্তেকাল হলো, যা এক ভিন্ন ধরনের হলেও সমান গুরুত্বপূর্ণ সমর্থনকে ছিন্ন করে দিল। যদিও তিনি ইসলাম গ্রহণ করেননি, তবু নবীকে (সা.) রক্ষায় ছিলেন অত্যন্ত দৃঢ় ও অবিচল। কুরাইশের সম্মানিত প্রবীণ হিসেবে তিনি গোত্রের আক্রোশকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন; তাঁর উপস্থিতিতে কেউ নবীর (সা.) প্রতি হাত তুলতে সাহস পেত না, কারণ এতে লঙ্ঘিত হতো গোত্রীয় মর্যাদা। তাঁর মৃত্যুর পর সেই নিয়ন্ত্রণ আর রইল না। নবী সা. প্রকাশ্য শত্রুতার সম্মুখীন হলেন। নির্যাতন তীব্রতর হলো। যেসব গালি ও হুমকি আগে গোত্রীয় রীতির কারণে সংযত ছিল, সেগুলো এখন আরও প্রকাশ্যে ও নির্মমভাবে আসতে লাগল। আবু তালিবের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে কুরাইশের অনিয়ন্ত্রিত শত্রুতা থেকে তাঁকে রক্ষা করার শেষ প্রাচীরটিও ভেঙে গেল।
এই পটভূমিতেই সংঘটিত হয় তাঈফের যাত্রা—যা নবী সা. এর আল্লাহর ওপর নির্ভরতার গভীরতাকে সবচেয়ে উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ করে। তিনি তাঈফ গিয়েছিলেন তাঁর দাওয়াতের জন্য বিকল্প সমর্থন খুঁজতে, আশা করেছিলেন সেখানকার নেতারা হয়তো তাঁর কথায় মনোযোগ দেবেন বা অন্তত প্রতিকূল হবেন না। কিন্তু তাঈফে তাঁর প্রতি আচরণ হয়েছিল মক্কায় পাওয়া সব প্রত্যাখ্যানের তুলনায় আরও কঠোর। নেতারা তাঁকে বিদ্রূপে প্রত্যাখ্যান করে, লোকজনকে উপহাসে উসকে দেয়, আর শহরের ছেলেদের তাঁর পেছনে লেলিয়ে দেয়। তারা তাঁকে শহর থেকে তাড়িয়ে দেয় পাথর ছুড়ে ছুড়ে, যতক্ষণ না তাঁর পা রক্তে ভিজে যায়।
পরবর্তীতে যখন তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, “ওহুদের দিনের থেকেও কঠিন কোনো দিন কি তাঁর জীবনে এসেছে?” তিনি তাঈফের এই ঘটনার কথাই উল্লেখ করেন এবং বলেন, এটি ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে কঠিন দিনগুলোর একটি। সেই দিনের কথা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, গভীর দুঃখে তিনি হাঁটছিলেন, নিজের পথও ঠিক বুঝতে পারছিলেন না, অবশেষে তিনি নিজেকে দূরবর্তী এক উপত্যকায় আবিষ্কার করেন।
সেই উপত্যকায়, প্রত্যাখ্যানে ঘেরা, পার্থিব সমর্থনহীন, আল্লাহ তাঁর কাছে পাঠালেন জিবরাইলকে। জিবরাইল জানালেন, তাঁর প্রতিপালক তাঁর প্রতি ঘটে যাওয়া প্রতিটি কথা ও আচরণ অবলোকন করেছেন। এমনকি পাহাড়সমূহের ফেরেশতাকেও পাঠানো হলো, যাতে তিনি চাইলে তাঈফের মানুষদের ওপর তাদের শহর চাপা দিতে পারেন। কিন্তু নবী সা. তা প্রত্যাখ্যান করলেন। বরং তিনি প্রকাশ করলেন এমন এক দয়া ও আশার বাণী, যা তাঁর দৃঢ় তাওয়াক্কুলের সবচেয়ে সুন্দর প্রকাশ। তিনি বললেন, হয়তো এদের বংশধরদের মধ্য থেকেই আল্লাহ এমন মানুষ বের করবেন, যারা তাঁর একত্বে ঈমান আনবে এবং কেবল তাঁকেই ইবাদত করবে।
সে মুহূর্তে তিনি প্রতিশোধ চাননি, মনোবল হারাননি, বরং সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর দিকে ফিরলেন, ধৈর্য, দয়া ও নির্ভরতার সঙ্গে। এভাবেই তিনি তাওয়াক্কুলের সবচেয়ে নির্মল রূপকে ধারণ করলেন।
পার্থিব অপচয়ের এই সময়ের পরই আসে এক মহান ঐশী উপহার, বিরাট অলৌকিক কান্ড ইসরা ও মিরাজ, অর্থাৎ রাতের সফর ও ঊর্ধ্বারোহণ। প্রাচীন মুসলিম আলেমরা এই অলৌকিক সময়কে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করেন। যখন দুনিয়ার চোখে নবী সা. পুরোপুরি একা ও নির্ভরহীন হয়ে পড়েছিলেন, ঠিক তখনই আল্লাহ তাঁর জন্য অদৃশ্য জগতের দুয়ার উন্মুক্ত করলেন। রাতে তাঁকে মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসে নেওয়া হয়, সেখান থেকে তিনি আসমানসমূহ অতিক্রম করেন , সাক্ষাৎ করেন পূর্ববর্তী নবীদের সঙ্গে এবং প্রত্যক্ষ করেন আল্লাহর নিদর্শনসমূহ। এই ঊর্ধ্বারোহণ ছিল একই সঙ্গে সান্ত্বনা ও নিশ্চয়তা যে, পৃথিবীর মানুষ তাঁকে প্রত্যাখ্যান করলেও আসমানে তিনি সমাদৃত; যে পার্থিব রক্ষকরা একে একে মৃত্যুবরণ করেছেন, তবু ঐশী সমর্থন অবিচ্ছিন্ন; এবং তাঁর মিশন আগের সকল নবীর মিশনেরই ধারাবাহিকতা। এই ঊর্ধ্বারোহণেই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ ফরজ করা হয়, এমন এক আজীবন স্মারক, যা ঈমানদারদের জানিয়ে দেয় যে আল্লাহর দিকে ফিরে যাওয়ার মাধ্যমে তাদেরও রূহানি উচ্চতা দান করা হয়।
এরপর ধীরে ধীরে দুনিয়ার ক্ষেত্রেও ঐশী দুয়ার খুলতে শুরু করল। হজের মৌসুমগুলোতে ইয়াছরিব থেকে আগত কিছু লোক নবী সা. এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ইসলাম গ্রহণ করল। তাদের গ্রহণ ছিল আন্তরিক, এবং মক্কার সমাজের বৈরিতাহীন। এই প্রথম দলটি নৈতিক প্রতিশ্রুতির ওপর অঙ্গীকার করে এবং নিজেদের জনগণের মাঝে ইসলামের দাওয়াত ছড়িয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। পরের বছর তারা আরও বড় একটি দল নিয়ে ফিরে আসে, যারা শুধু ঈমানে নয়, বরং সুরক্ষাতেও অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। যা নানা দিক থেকে আবু তালিবের দেওয়া রাজনৈতিক ও শারীরিক সুরক্ষার ধারাবাহিকতাই ছিল। এই ঘটনাই ‘দ্বিতীয় আকাবা বাইআত’ নামে পরিচিত, যা গড়ে তোলে নতুন এক সামাজিক ব্যবস্থার ভিত্তি এবং ভবিষ্যৎ মুসলিম সমাজের প্রথম ভ্রূণ।
এরপর সংঘটিত হিজরত ছিল বহু বছরের ধৈর্য, নির্ভরতা ও ঐশী প্রস্তুতির পরিণতি। কুরাইশ যখন নবী সা. কে হত্যা করার ষড়যন্ত্র করল, তখন তিনি ও আবু বকর রওনা হলেন সাওরের গুহার দিকে। আবু বকর রা. আশঙ্কা প্রকাশ করলেন যে, শত্রুরা হয়তো তাদের খুঁজে পাবে, নবী সা. তাঁকে শান্ত করলেন সেই অমর বাণীতে: “দুঃখ করো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ আমাদের সঙ্গেই আছেন।” এই সান্ত্বনার বাক্যই মক্কা থেকে মদিনা যাত্রার মূল সুর।এটি শুধুই একটি শারীরিক স্থানান্তর ছিল না, বরং এক আত্মিক ঘোষণা যে, বান্দা যখন পুরোপুরি আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, তখন কোনো দুনিয়াবি শক্তিই ঐশী সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পারে না।
এই সময়টির দিকে ফিরে তাকালে আমরা এক গভীর রূহানি বিধান দেখতে পাই। আল্লাহ নবী সা. এর কাছ থেকে সব মানবিক সমর্থন সরিয়ে নিলেন, প্রথমে খাদিজাকে, তারপর আবু তালিবকে, যাতে তাঁর হৃদয় কেবলমাত্র আল্লাহর সঙ্গেই সম্পর্কযুক্ত হয়। তিনি তাঁকে তাঈফে প্রত্যাখ্যানের তিক্ততা আস্বাদন করালেন, যাতে তাঁর আস্থা মানুষের গ্রহণ বা বর্জনের ঊর্ধ্বে উঠে যায়। এরপর এই পরিপূর্ণ নির্ভরতার প্রতিদানে আল্লাহ তাঁকে দান করলেন রূহানি উচ্চতা, ইসরা ও মিরাজ; এবং দুনিয়াবি সমর্থন মদিনার আনসারদের অঙ্গীকারের মাধ্যমে। এসব ঘটনা যেন একটি রূহানি ধারা :- বিয়োগ, আত্মসমর্পণ, ঐশী সান্নিধ্য, এবং পরিশেষে বিজয়।
এভাবে খাদিজা রা. ও আবু তালিবের মৃত্যুর পর থেকে হিজরত পর্যন্ত সময়টি শুধু নবীর (সা.) জীবনের একটি ঐতিহাসিক অধ্যায় নয়, বরং ঈমানের প্রকৃতি বোঝার এক সর্বজনীন পাঠ। এটি শেখায় যে সত্যিকারের তাওয়াক্কুল তখনই বিকশিত হয়, যখন আমরা যেসব পার্থিব ভরসার ওপর নির্ভর করি, সেগুলো আমাদের হাত থেকে সরে যায়; এবং সবচেয়ে বড় ঐশী দুয়ার অনেক সময় খুলে যায় মানুষের সবচেয়ে দুর্বল মুহূর্তেই। এই সময়গুলোতে নবী সা. পুরো উম্মতের জন্য একটি মডেল স্থাপন করেছেন, অটল আস্থার পথ, যা ইসলামি সভ্যতার বীজরূপে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
——————–
ক্যাটাগরি : সিরাত, ইসলামি ইতিহাস, তাজকিয়াহ, ইসলামি চিন্তাধারা।
—
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7654