শিরোনাম : নবীজির (সা.) মানবীয় রূপ।
———–
নবীর ব্যক্তিত্ব বিশ্বাসীদের ধর্মীয় চেতনায় এক বিশেষ মর্যাদার আসন দখল করে আছে। রাজা, দার্শনিক বা কবিরা যেমন তাঁদের কীর্তি, বংশগৌরব বা বুদ্ধিবৃত্তিক অবদানের কারণে মহৎ হিসেবে বিবেচিত হন, নবীর মাহাত্ম্য তারচেয়ে ভিন্ন। নবী সর্বাগ্রে আল্লাহর মনোনয়নের মাধ্যমেই পরিচিত। ইসলামী ঐতিহ্য স্পষ্টভাবে জানায়—আল্লাহ নিজে নবীকে মনোনীত করেছেন, আর এই নিয়োগকে কেবল মানবিক যুক্তি বা নৈতিক তুলনায় ব্যাখ্যা করা যায় না। কোরআনের নবী কোনো মানবসৃষ্ট কল্পনা নয়, বরং তিনি আল্লাহর ইচ্ছায় প্রতিষ্ঠিত এক সত্য।
নবুয়তের মূল নীতি হলো—এটি সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। বিশ্বাসীরা জানে, নবীকে এজন্য বাছাই করা হয়নি যে তিনি মানুষের ভিড়ে অস্বাভাবিকভাবে সৎ বা নৈতিক ছিলেন। বরং আল্লাহ তাঁর পূর্ণ জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দিয়ে তাঁকে মনোনীত করেছেন। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিহাস জুড়ে অনেক মানুষকে নেকি, ধার্মিকতা বা নেতৃত্বের জন্য সম্মানিত করা হয়েছে। কিন্তু নবুয়ত কোনো অর্জন বা যোগ্যতার ভিত্তিতে পাওয়া যায় না। নবী নিজেও কখনো দাবি করেননি যে তিনি আল্লাহর অনুগ্রহ পাওয়ার যোগ্য ছিলেন। বরং তিনি তাঁর জাতিকে বারবার বলেছেন—তিনি কেবল আল্লাহর প্রেরিত এক রাসূল, নিজের কৃতিত্বে উচ্চে ওঠা কোনো অতিমানব নন।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—ইতিহাস আর কাহিনির পার্থক্য। ইতিহাস হলো ঘটনাপুঞ্জির রেকর্ড, যার মাধ্যমে আমরা নবীর জীবনকে বুঝি একজন মানুষ হিসেবে—যিনি বেঁচেছিলেন, কষ্ট সহ্য করেছিলেন, আর তাঁর দায়িত্বের পরীক্ষাগুলো মোকাবিলা করেছিলেন। কাহিনি বা কিংবদন্তি এর বিপরীতে মানুষের তৈরি, যেখানে নায়ককে এত উঁচুতে তোলা হয় যে তিনি মানবিক সীমার বাইরে চলে যান। নবীর ক্ষেত্রে এমন কাহিনি প্রকৃত সত্যকে আড়াল করে দিতে পারে। সত্য হলো—তিনি আল্লাহর নির্বাচিত বান্দা, যার কারণ মানুষের বোধগম্যের বাইরে; পরবর্তী গল্পকারদের বানানো গুণাবলির জন্য নয়। কিংবদন্তি কল্পনাকে উজ্জীবিত করতে পারে, কিন্তু তা মূল ধর্মতাত্ত্বিক বার্তাকে বিকৃত করে—নবীর মাহাত্ম্য কোনো অলৌকিক কীর্তিতে নয়, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে অহি গ্রহণকারী এক বিনয়ী বান্দা হওয়ার মধ্যেই নিহিত।
মানুষ সবচেয়ে বড় যে ভুল করে তা হলো আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে মানবিক মাপকাঠিতে বিচার করা। বিশেষ করে পাশ্চাত্য দার্শনিক ঐতিহ্যে প্রায়ই আল্লাহকে এমনভাবে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে যেন তিনি মানুষের আকার, গুণ বা সীমাবদ্ধতার অধীন। অথচ ইসলামী শিক্ষা দৃঢ়ভাবে বলে—আল্লাহ মানুষের কল্পনার ঊর্ধ্বে। নবুয়তের রহস্যকে মানবিক যুক্তির পাল্লায় ওজন করতে চাওয়া আল্লাহ ও নবুয়ত দুটোকেই ভুলভাবে বোঝা। নবীর মানবিকতা অবশ্যই সত্য—তিনি খেতেন, পান করতেন, দুঃখ পেতেন, আনন্দিত হতেন মানুষের মতোই। কিন্তু তাঁর নবুয়ত কেবল মানবিক যুক্তি দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। এটি এক আল্লাহর অর্পিত আমানত, যার উদ্দেশ্য মানুষের জ্ঞানগম্যতার বাইরে।
সবশেষে, নবীর জীবন ও বার্তা আমাদের তাঁর মূল মানবিকতার কথাই মনে করিয়ে দেয়। তিনি কখনোই দুনিয়াবি শ্রেষ্ঠত্বের দাবি করেননি, নিজেকে পূজিত হবার আহ্বান জানাননি। তাঁর কাজ ছিল কেবল মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান করা, তাঁর উপর অর্পিত ওহীর প্রতিফলন ঘটানো, আর তাঁর উম্মতকে আল্লাহর হিদায়াতের বাস্তবতার কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়া। এতে তিনি আল্লাহর একজন খাঁটি বান্দার মডেল হয়ে ওঠেন—যার শ্রেষ্ঠত্ব কোনো কল্পিত গৌরবে নয়, বরং বিনয় ও আনুগত্যে।
কোরআন নিজেই ঘোষণা করে—
“বলুন, আমি তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ, আমার প্রতি ওহী করা হয়েছে যে, তোমাদের উপাস্য কেবল এক আল্লাহ।”
(সূরা কাহফ, আয়াত ১১০)
————-
ক্যাটাগরি : সিরাত, ইসলামি চিন্তাধারা।
—
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7117