|২৩ |ডিসেম্বর| ২০২৫|
|| প্রশ্ন:
শ্রদ্ধেয় ও সম্মানিত ড. মুহাম্মদ আকরম নদভী সাহেব,
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আশা করি আপনি সুস্থ ও কল্যাণে আছেন। আমি দারুল উলূম নদওয়াতুল উলামা, ‘আলিয়া উলা’ শ্রেণির একজন শিক্ষার্থী। আপনার বিস্ময়কর লেখনীকর্ম আমাকে গভীর আনন্দ ও বিস্ময়ে অভিভূত করে। বিশেষত ‘আল-ওয়াফা বিআসমা আন-নিসা’ এবং আপনার আসন্ন মহাকর্ম ‘সহিহ মুসলিম’ এর ব্যাখ্যা ও কুরআনের তাফসির, এই অসাধারণ প্রচেষ্টাগুলো দেখে নিঃসন্দেহে বলা যায়, আপনি মহান পূর্বসূরিদের জীবন্ত উত্তরাধিকার। আল্লাহ তাআলা আপনাকে এসব খেদমতের পূর্ণ প্রতিদান দিন, আপনার সময় ও স্বাস্থ্যে প্রভূত বরকত দান করুন।
আমার একটি প্রশ্ন আছে। বর্তমান সময়ে দেশীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ে আমরা কোন কোন গুরুতর সমস্যা ও ফিতনার মুখোমুখি হচ্ছি, অথবা ভবিষ্যতে যেসব সমস্যার উদ্ভবের আশঙ্কা রয়েছে, যেগুলোর ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্ব তৈরি হয়, সে বিষয়ে আমাদের কীভাবে প্রস্তুতি নেওয়া উচিত? কীভাবে নিজেকে গড়ে তুললে আমরা দ্বীনের কোনো না কোনো কাজে অংশগ্রহণের যোগ্য হতে পারি এবং আখিরাতে সওয়াবের অধিকারী হতে পারি?
এ বিষয়ে অনুগ্রহ করে দিকনির্দেশনা দিলে অনেক উপকৃত হবো।
ওয়াকার আহমদ।
২১ ডিসেম্বর ২০২৫
|| উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার পত্রটি হৃদয় স্পর্শ করেছে। এটি কেবল কয়েকটি বাক্য নয়; বরং সময়ের কোলাহলের মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা এক সচেতন শিক্ষার্থীর অন্তরের আর্তি, যে জানতে চায়, দ্বীনের খেদমতের সঠিক পথ কোনটি এবং সেই পথে চলার জন্য নিজেকে কীভাবে প্রস্তুত করবে। এমন প্রশ্নই প্রমাণ করে যে আল্লাহ তাআলা আপনার হৃদয়ে কল্যাণ, দরদ ও দায়িত্ববোধ স্থাপন করেছেন। আপনি যেহেতু আন্তরিকতার সঙ্গে পথনির্দেশ চেয়েছেন, তাই আমার কর্তব্য হলো, যে কথা আমি আমার সন্তানদের ও ঘনিষ্ঠ ছাত্রদের বলি, আপনাকেও তাই বলা।
প্রথমেই ভালোভাবে বুঝে নিন, আপনি যে জ্ঞান অর্জনে নিয়োজিত, তা কোনো সাধারণ জ্ঞান নয়; এটি নবীদের উত্তরাধিকার। এটি কিতাব ও সুন্নাহর জ্ঞান। নবীগণ উম্মতকে ধন-সম্পদ দিয়ে যাননি; তাঁরা রেখে গেছেন জ্ঞান। আর যে এই জ্ঞান লাভ করে, সে সর্বাধিক মূল্যবান সম্পদ অর্জন করে। এই জ্ঞানই হিদায়াতের উৎস; এর ধারকরাই উম্মতের পথপ্রদর্শক ও নেতৃত্বের উপযুক্ত হন।
এই পথে প্রথম ও সবচেয়ে ভয়াবহ ফিতনা হলো, নিয়তের ফিতনা। যদি শিক্ষার্থীর মনে এই ভাবনা ঢুকে পড়ে যে তাকে খ্যাতি অর্জন করতে হবে, মানুষের কাছে জনপ্রিয় হতে হবে, কিংবা এমন কিছু করতে হবে যা জনতাকে মুগ্ধ করবে, তবে বুঝে নেবেন, জ্ঞানের আত্মা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। খ্যাতি ও জৌলুসের আকাঙ্ক্ষা বিষের মতো; এটি দ্বীনকে ভেতর থেকে ফাঁপা করে দেয়, জ্ঞানের গাম্ভীর্য নষ্ট করে এবং মানুষকে সত্যের অনুসন্ধান থেকে সরিয়ে মানুষের রুচির দাসে পরিণত করে। তাই সর্বক্ষণ নিজের নিয়ত পাহারা দিন এবং জ্ঞান কেবল আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই অর্জন করুন।
দ্বিতীয় কথা, এই মহান জ্ঞান একাগ্রতা, ত্যাগ এবং অবিরাম পরিশ্রম দাবি করে। আপনি দেশীয় ও বৈশ্বিক সমস্যা ও ফিতনার কথা জানতে চেয়েছেন; কিন্তু এই পর্যায়ে আমার আন্তরিক পরামর্শ হলো, কিছু সময়ের জন্য এসব থেকে নিজেকে দূরে রাখুন। এটি তর্ক, কোলাহল ও প্রতিক্রিয়ার যুগ; অথচ জ্ঞান বিকশিত হয় নীরবতা, প্রশান্তি ও গভীর চিন্তায়। তাই কয়েক বছর পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে জ্ঞানের ভিত্তি মজবুত করুন এবং রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক হাঙ্গামাগুলো সাময়িকভাবে উপেক্ষা করুন।
তৃতীয় কথা, ভাষার দৃঢ়তা। আরবিকে এতটা পোক্ত করুন যেন কুরআন ও হাদিস সরাসরি বুঝতে পারেন। ভাষা কেবল প্রকাশের মাধ্যম নয়; এটি চিন্তার দর্পণ। সাহিত্যরুচি গঠনের জন্য আরবি ও উর্দু সাহিত্যের গভীর অধ্যয়ন করুন। যে ব্যক্তি ভাষার সূক্ষ্মতা জানে না, সে অর্থের গভীরতায় পৌঁছাতে পারে না।
চিন্তার প্রশস্ততা ও মানসিক ভারসাম্যের জন্য চিন্তাশীল আলেমদের রচনা অত্যন্ত উপকারী। বিশেষত আল্লামা শিবলী নুমানি, আল্লামা সাইয়্যিদ সুলাইমান নদভী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা আবুল আ‘লা মওদূদী, মাওলানা সাইয়্যিদ আবুল হাসান আলী নদভী, শাইখ আলী তানতাওয়ী, শাইখ মুহাম্মদ গাজালী এবং আল্লামা ইউসুফ আল-কারযাওয়ীর লেখালেখি অধ্যয়ন করুন। এঁরা প্রশ্ন করার শিষ্টাচার, গবেষণার গভীরতা এবং উম্মতের দুঃখবোধে প্রোথিত এক পরিণত দৃষ্টিভঙ্গি দান করেন।
তবে সবকিছুর ঊর্ধ্বে মূল মনোযোগ নিবদ্ধ থাকবে কুরআন ও হাদিসের প্রতি। কুরআন আল্লাহ তাআলার কিতাব, আর হাদিস রাসুলুল্লাহ সা. এর বাণী ও কর্মের সংরক্ষিত ভাণ্ডার। হিদায়াত এই দুই উৎসেই সীমাবদ্ধ; এর বাইরে আছে কেবল অনুমান, কিয়াস এবং অন্ধকার।
কুরআন ও সুন্নাহ অধ্যয়নে একটি মৌলিক নীতি হলো, গবেষণার সূচনা করতে হবে প্রশ্ন ও অনুসন্ধান দিয়ে।
এখানে ‘সন্দেহ’ বলতে অস্বীকার বোঝানো হচ্ছে না; বরং চিন্তা, গভীর মনন ও অনুসন্ধানের দরজা খুলে দেওয়া বোঝানো হচ্ছে। এটাই ছিল সকল নবী আলাইহিমুস সালামের পথ। সত্য যে, দার্শনিকরাও সন্দেহকে গ্রহণ করেন; তবে পার্থক্য এই, নবীগণ সন্দেহকে জ্ঞান ও নিশ্চিত বিশ্বাসে পৌঁছানোর সেতু বানান, আর বহু দার্শনিক সন্দেহকেই শেষ গন্তব্য ভেবে বসেন।
আপনি যখন কুরআন মাজিদের কোনো আয়াত পড়বেন, তখন যেন শুধু চোখ বুলিয়ে এগিয়ে না যান। থামুন, ভাবুন, আয়াতটির অর্থ নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, এই আয়াতের অর্থ কি কেবল এটুকুই, না এর পরিসরে আরও অর্থের সম্ভাবনা রয়েছে? যদি একাধিক অর্থের অবকাশ থাকে, তবে যাচাই করুন—কোন অর্থটি প্রমাণের দিক থেকে অধিক শক্তিশালী, প্রসঙ্গ ও প্রেক্ষাপটের সঙ্গে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং কুরআনের সামগ্রিক মেজাজের সঙ্গে অধিক সঙ্গতিপূর্ণ। আর কেন একটি অর্থ অন্যটির তুলনায় অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য, এই প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজুন।
যতক্ষণ না হৃদয় ও বুদ্ধি উভয়ই সন্তুষ্ট হয়ে কোনো একটি সিদ্ধান্তে উপনীত হয়, ততক্ষণ গবেষণা ও অনুসন্ধানের পথ ছাড়বেন না। এই উদ্দেশ্যে তাফসির ও কুরআন অনুধাবনের নীতিমালা বিষয়ে আল্লামা ইবন তাইমিয়া রহিমাহুল্লাহর রচনাগুলোর গভীর ও মনোযোগী অধ্যয়ন করুন। তাঁর লেখাগুলো আপনাকে নসের ব্যাখ্যায় ভারসাম্য, যুক্তি ও সংযমের শিক্ষা দেবে। একইভাবে মাওলানা হামিদুদ্দীন ফারাহি রহিমাহুল্লাহর গ্রন্থগুলো বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে পড়ুন। কুরআনের নাজম, আয়াতগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও ভেতরের ঐক্য বোঝার ক্ষেত্রে তিনি অসাধারণ অন্তর্দৃষ্টি দান করেন। এই দুই মনীষীর চিন্তাধারা আপনাকে এমন যোগ্যতা দেবে, যাতে আপনি কুরআন শুধু পাঠই করবেন না, বরং তার অর্থের গভীরে পৌঁছাতে পারবেন এবং তার বার্তাকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করতে পারবেন।
ঠিক তেমনিভাবে হাদিস অধ্যয়নের সময় কেবল পাঠ্যাংশেই সীমাবদ্ধ থাকবেন না। বরং মুহাদ্দিসগণ হাদিসের সহিহ হওয়ার জন্য যে মৌলিক শর্তগুলো নির্ধারণ করেছেন, সেগুলোর অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা অনুধাবনের চেষ্টা করুন। নিজেকে প্রশ্ন করুন, এই শর্তগুলো কেন স্থির করা হলো? এগুলোর মধ্যে কোনো ঘাটতি বা সংযোজনের অবকাশ আছে কি না? ইমাম বুখারি ও ইমাম মুসলিম রহিমাহুমাল্লাহ এই শর্তগুলোর অনুসরণে কতটা পরিশ্রম ও সাফল্য প্রদর্শন করেছেন? সনদের অধ্যয়ন করুন, রাবিদের জীবন ও চরিত্র জানুন, আর ইলালুল হাদিস নিয়ে চিন্তা করুন, কারণ হাদিসের বিশুদ্ধতার মূল নির্ভরতা এসব শাস্ত্রের ওপরই।
এরপর হাদিসের মূল বক্তব্যের ওপর গভীর চিন্তা করুন। একে নিছক কিছু শব্দের সমষ্টি হিসেবে নয়, বরং একটি জীবন্ত ও বাস্তব নির্দেশনা হিসেবে বোঝার চেষ্টা করুন। প্রতিটি হাদিস সম্পর্কে মনে রাখুন, নবী করিম সা. এটি কোন পরিস্থিতিতে বলেছেন, কোন প্রেক্ষাপটে এই নির্দেশ বা বাণী উচ্চারিত হয়েছে, এবং এর মূল মুখাতব কে ছিলেন। বহু হুকুম ও নির্দেশের প্রকৃত অর্থ তখনই স্পষ্ট হয়, যখন তার সময়কালীন, সামাজিক ও ব্যবহারিক প্রেক্ষাপট সামনে রাখা হয়।
হাদিসের এই পটভূমি ও প্রাসঙ্গিকতা বোঝা সঠিক হাদিস-অনুধাবনের জন্য অত্যন্ত জরুরি। এর মাধ্যমেই পরিষ্কার হয়, কোন হাদিস সাধারণ, কোনটি বিশেষ; কোনটি স্থায়ী, আর কোনটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিনির্ভর। এই উদ্দেশ্যে মুহাদ্দিসদের নির্ভরযোগ্য শারহ ও গ্রন্থসমূহ নিয়মিত অধ্যয়নের সঙ্গী বানান। বিশেষভাবে ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহর শরহে সহিহ মুসলিম, হাফিজ ইবন হাজার রহিমাহুল্লাহর ফাতহুল বারি, ইমাম ইবন হাযম রহিমাহুল্লাহর আল-মুহাল্লা এবং আল্লামা শাওকানী রহিমাহুল্লাহর নাইলুল আওতার—এসব গ্রন্থকে আপনার স্থায়ী অধ্যয়নসম্পদে পরিণত করুন। এগুলো আপনাকে হাদিসের শব্দ, তার গভীর অর্থ, ফিকহি ফলাফল এবং আলেমদের মতভেদের ভিত্তি বুঝতে সহায়তা করবে। ফলে আপনি হাদিসে নববী সা?-কে আরও গভীরতা, ভারসাম্য ও প্রজ্ঞার সঙ্গে উপলব্ধি করতে সক্ষম হবেন।
যখন আপনি কুরআন ও সুন্নাহর এই নীতিগুলোতে দৃঢ়তা অর্জন করবেন, তখন সেগুলোকে নিজের বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করুন। এরপর পরিস্থিতির দিকে দৃষ্টি দিন এবং বিবেচনা করুন, এই বাস্তবতায় কুরআন ও সুন্নাহর জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া ও দ্বীনের খেদমত করার কোন পথটি সম্ভব। যখন সেই সময় আসবে, ইন শা আল্লাহ, আল্লাহ তাআলাই আপনাকে পথ দেখাবেন এবং আপনার কাছ থেকে সেই কাজই নেবেন, যার জন্য তিনি আপনাকে প্রস্তুত করেছেন।
আল্লাহ তাআলা আপনাকে উপকারী জ্ঞান, সৎ আমল, সঠিক চিন্তাধারা ও পরিপূর্ণ ইখলাস দান করুন, এবং আপনাকে দ্বীনের সত্যিকারের খাদিমদের অন্তর্ভুক্ত করুন।
——————–
| ক্যাটাগরি : পরামর্শ, তালিম , তাজকিয়াহ।
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍️ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7984