AkramNadwi

শিরোনাম : ধর্ম, পরিবার ও ভবিষ্যৎ: দৃঢ় সংকল্পে বিশৃঙ্খলা থেকে উত্তরণ।

শিরোনাম : ধর্ম, পরিবার ও ভবিষ্যৎ: দৃঢ় সংকল্পে বিশৃঙ্খলা থেকে উত্তরণ।
——————–

ইসলাম কোনো নিছক স্থবির আচার বা উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া কিছু প্রথার নাম নয়; বরং এটি একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনপদ্ধতি, যা মানুষকে প্রস্তুত করে এক মহান দিনের জন্য—সেটি হলো হিসাবের দিন। ইসলাম মানুষকে আহ্বান জানায়, যেন সে নিজেকে হিসাবের চোখে পরীক্ষা করে—কী কর্ম করেছে, তার রব সম্পর্কে কী ধারণা পোষণ করেছে, এবং মানুষদের মাঝে কেমন জীবনযাপন করেছে।

ইবাদতে এই অন্তর ও বহিরঙ্গের ভারসাম্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মুসলমান যখন নামাজে দাঁড়ায়, তখন তাকে চোখ বন্ধ করতে বলা হয়নি; বরং তাকে সজাগ, সচেতন থাকতে বলা হয়েছে। সে নামাজ পড়তে পারে যে কোনো সময়, যে কোনো স্থানে, এমনকি চলার পথে। কেননা আভ্যন্তরীণ জীবন বাইরের জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন নয়। বরং বাহ্যিক আচরণ হওয়া উচিত অন্তরের স্বচ্ছ প্রতিফলন। তাই মুমিনের উচিত তার প্রতিটি কথা, কাজ ও আচার-আচরণে সচেতন থাকা, দায়িত্বশীল থাকা, এবং সর্বদা আল্লাহর তত্ত্বাবধান অনুভব করা।

আল্লাহর অনুগ্রহ এই যে, তিনি বান্দাদের এই দায়িত্বকে কোনো ভারী বোঝা বানাননি; বরং এটিকে করেছেন দায়িত্ব ও নিয়ামতের এক সুষম মিলন। আমলগুলো একদিকে নিয়ামতের আস্বাদন, অন্যদিকে তার শোকর আদায়। যেমন—খাবার দেহকে শক্তি জোগায় এবং মনকে আনন্দ দেয়। আবার যৌন আকাঙ্ক্ষার স্বাদও অনুমোদিত হয়েছে শুধু তার স্বাভাবিক কাঠামোর মধ্যে—যা হলো বিবাহ, যার দ্বারা পরিবার প্রতিষ্ঠিত হয়। পরিবারই হলো সেই দৃঢ় বন্ধন, যা অতীতকে ভবিষ্যতের সাথে যুক্ত করে। পরিবারেই পরীক্ষা হয় ঈমানের সততা, ফুটে ওঠে আদর্শের প্রভাব, যেন মানুষ কিয়ামতের দিন হাজির হয় দায়িত্ব আদায়ের সাক্ষ্য নিয়ে। আর যে ব্যক্তি নিজের খেয়াল-খুশির দাস হয়ে যায়—যেন আল্লাহ তাকে দেখছেন না, যেন তাঁর আদেশ আকাশ ও জমিনে প্রবাহিত নয়—সে হলো সীমালঙ্ঘনকারী, যাদেরকে আল্লাহ নিন্দা করেছেন।

আমাদের যুগে মানবসভ্যতা গভীর পরিবর্তনের মুখোমুখি, যা নড়িয়ে দিয়েছে মানবিক সম্পর্কের ভিত, বিশেষ করে পরিবারকে। প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি, নারী-পুরুষের ভূমিকার পরিবর্তন, নৈতিক মানদণ্ডের বিপর্যয়—এসব মিলেই এই দৃঢ় ভিত্তিকে দুর্বল করে তুলেছে। অথচ পরিবার আসলে হলো নিরাপত্তার বেষ্টনী, ভালোবাসার দুর্গ—যেখানে মিলিত হয় আত্মীয়তা, দায়িত্ববোধ ও অভিন্ন নিয়তি। এটি একটি জীবন্ত সত্তা, যেখানে অনুভূতি একে অপরকে জড়িয়ে ধরে, কর্মসমূহ একে অপরকে সমর্থন দেয়। এর ভিত্তি দৃঢ় থাকলে সমাজে স্থিতি আসে, আর যদি তা ভেঙে পড়ে তবে কেঁপে ওঠে গোটা সমাজ।

পরিবারের ভাঙন কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং তা সমাজব্যাপী এক ব্যাধি। সাধারণত এর সূচনা হয় তখনই, যখন মা-বাবা—যৌথভাবে বা এককভাবে—নিজেদের স্বাভাবিক ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়। তখন প্রজন্মের বন্ধন দুর্বল হয়, ভালোবাসা শিথিল হয়, আর শেষপর্যন্ত ভেঙে যায় ঘর। এর অন্যতম প্রধান কারণ হলো আজকের যুগে যৌন সম্পর্ককে সন্তান ও দায়িত্ব থেকে বিচ্ছিন্ন করা। গর্ভনিরোধক পদ্ধতির ব্যাপক প্রসার, গর্ভপাতের সহজলভ্যতা—এসবই পুরুষ-নারীর মেলামেশাকে তার আসল লক্ষ্য থেকে বিচ্ছিন্ন করেছে। একসময় এই সম্পর্ক ছিল ভবিষ্যৎ গঠনের অঙ্গীকার; আজ তা পরিণত হয়েছে ক্ষণস্থায়ী ভোগে।

সমস্যা আরও বেড়েছে, যখন কিছু মতবাদ এই বিশৃঙ্খলাকে স্বাধীনতা বলে প্রচার করেছে, বিশেষত নারীর জন্য। অথচ বাস্তবে তা নারীর মর্যাদা রক্ষা করতে পারেনি; বরং তাকে পণ্য বানিয়েছে, মায়ের ও শিক্ষিকার মহান ভূমিকা থেকে বঞ্চিত করেছে, প্রজন্মের নৈতিক স্তম্ভ হিসেবে তার অবস্থানকে উপেক্ষা করেছে। নারীকে অনেক সময় জোর করেই বিশ্বাস করানো হয়েছে যে স্বাধীনতা মানে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়া। ফলে ক্ষতি হয়েছে, কষ্ট বেড়েছে, নারী শোষিত হয়েছে—সম্মানিত হওয়ার বদলে।

বিশেষত বিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে নারীদের প্রবলভাবে ঠেলে দেওয়া হলো গৃহস্থালির ভূমিকা ছেড়ে আর্থিক স্বাধীনতার নামে কর্মক্ষেত্রে। যদিও এতে কিছু আর্থিক সুফল এসেছে, কিন্তু মা হওয়া ও সন্তান পালনের মর্যাদা কমে গেছে। সন্তানধারণ হয়ে উঠেছে এক বোঝা, সন্তান জন্মানো হয়েছে অনিচ্ছিত, এমনকি তিরস্কৃত। যেসব নারী পরিবারকেই প্রাধান্য দিতে চেয়েছিলেন, তাদেরকেও সমাজের চাপের মুখে পড়তে হয়েছে প্রচলিত অর্থনৈতিক ধাঁচে যুক্ত হওয়ার জন্য। ফলে এলোমেলো হয়ে গেছে পারিবারিক জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ। শিশুদের শৈশব কাটছে ডে-কেয়ার সেন্টারে, তারা বঞ্চিত হচ্ছে মায়ের স্নেহময় স্পর্শ থেকে, যা তাদের মানসগঠনের জন্য অপরিহার্য। এভাবে বেড়ে উঠেছে প্রজন্ম, যারা পর্দার জগতে ডুবে গেছে, কিন্তু পিতামাতার দিকনির্দেশনা থেকে দূরে। মা-বাবার ব্যস্ততায় সন্তানদের সঙ্গ কমে গেছে, জায়গা নিয়েছে গেমস আর টিভি প্রোগ্রাম। ফলে দেখা দিয়েছে আবেগের শূন্যতা, আচরণের অস্থিরতা, এবং দুর্বল হয়ে গেছে সম্পর্কবোধ।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *