শিরোনাম : দৃশ্যপটে আমার লগাম।
|২২| ডিসেম্বর| ২০২৫|
بسم الله الرحمن الرحيم.
গত কয়েক দিন ধরে আমি নিরবচ্ছিন্ন সফর ও নানা ধরনের ব্যস্ততায় এমনভাবে আবদ্ধ ছিলাম যে অবসর কিংবা প্রশান্তির একটি মুহূর্তও জোটেনি। ঠিক এই সময়েই দিল্লিতে ‘স্রষ্টার অস্তিত্ব’ শিরোনামে একটি বিতর্ক অনুষ্ঠিত হয়, যা ধর্মীয় পরিমণ্ডলে অস্বাভাবিক গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচিত হয়েছে। এই বিতর্কে বাহ্যত ইতিবাচক পক্ষেরই প্রাধান্য দেখা যায়, আর তাদের সাফল্যে চারদিকে আনন্দ ও উল্লাসের চিত্র ফুটে ওঠে, যেন উৎসবের আমেজ।
কিন্তু এই বিতর্কের প্রতিক্রিয়ায় বেশ কিছু প্রশ্ন জন্ম নিয়েছে। সেগুলো আমাকে পাঠানো হয়েছে এবং কয়েকজন আন্তরিকভাবে অনুরোধও করেছেন যেন আমি লিখিতভাবে তার উত্তর দিই। ব্যস্ততার কারণে সময়মতো সে অনুরোধ পূরণ করা সম্ভব হয়নি। তবু কিছু প্রশ্ন এমন রয়েছে, যেগুলোর জবাব দেওয়া অত্যাবশ্যক। কারণ এগুলো উপেক্ষিত থাকলে ইসলাম ও সত্য সম্পর্কে জনমনে এমন সব ভ্রান্ত ধারণা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে, যা বাস্তবতা ও দীনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং চিন্তাকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
সেই প্রশ্নগুলোরই সংক্ষিপ্ত রূপ নিচে তুলে ধরা হচ্ছে এবং পর্যায়ক্রমে তাদের উত্তরও উপস্থাপন করা হবে।
|| প্রথম প্রশ্ন :
কিছু মানুষ দাবি করছেন, সাম্প্রতিক এই বিতর্কের সাফল্য প্রমাণ করে দিয়েছে যে আমাদের প্রাচীন শিক্ষানীতি সম্পূর্ণ সঠিক, কার্যকর ও পরিপূর্ণ। অতএব এ পাঠক্রমের বিরুদ্ধে যত সমালোচনা আছে, সবই ভিত্তিহীন এবং একে আবার পূর্ণ শক্তিতে পুনর্বহাল করা উচিত। এই যুক্তি কি জ্ঞান ও যুক্তির মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য।
|| দ্বিতীয় প্রশ্ন :
যদি ধরে নেওয়া হয় যে ইতিবাচক পক্ষের জয় আসলে ইসলামেরই বিজয়, তবে কি অনিবার্যভাবে এ কথাও মানতে হবে যে ভবিষ্যতে যদি কোনো বিতর্কে স্রষ্টা অস্বীকারকারীরা জয়ী হয়, তবে সেটাকে ইসলামের অসত্যতার প্রমাণ বলে মেনে নিতে হবে। এই ধারণা কি গ্রহণযোগ্য।
|| তৃতীয় প্রশ্ন :
আপনার বক্তব্য হলো, কোনো বিতর্কে জয়লাভ করলেই তা সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রমাণ হয় না। সেক্ষেত্রে অনুগ্রহ করে স্পষ্ট করুন, এই বিশেষ বিতর্কে ইতিবাচক পক্ষের সাফল্যের প্রকৃত কারণ ও উপাদান কী ছিল।
|| চতুর্থ প্রশ্ন :
আপনি আগে বলেছেন, বিতর্ক নিজেই বহু দিক থেকে ফলহীন, কখনো কখনো অকল্যাণকর ও ক্ষতিকরও হয়ে ওঠে। আপনি কি এখনো সেই মতেই অটল আছেন, নাকি সাম্প্রতিক এই বিতর্ক আপনার অবস্থানে কোনো পরিবর্তন এনেছে।
💠 প্রথম প্রশ্নের উত্তর :
এটা বিস্ময়কর ও দুঃখজনক যে কেউ সাম্প্রতিক একটি বিতর্কের সাফল্যকে ভিত্তি করে এই দাবি তুলছে যে প্রাচীন শিক্ষানীতি সম্পূর্ণ সঠিক। বাস্তবে এই যুক্তি শুধু দুর্বলই নয়, বরং যুক্তি ও জ্ঞানের বিচারে একেবারেই ভুল বোঝাবুঝির ওপর দাঁড়ানো।
ভাষা ও ইতিহাসের প্রসিদ্ধ ইমাম আবু উবাইদার বর্ণিত একটি ঘটনা এই সত্যটিকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে স্পষ্ট করে। একবার ঘোড়দৌড়ের প্রতিযোগিতা হলো। একটি ঘোড়া সবগুলোকে পেছনে ফেলে এগিয়ে গেল। দৃশ্যটি দেখে দর্শকদের মধ্য থেকে একজন উচ্ছ্বাসে অজস্র করতালি দিতে লাগল, আনন্দে আত্মহারা হয়ে লাফালাফি শুরু করল। তখন কেউ তাকে জিজ্ঞেস করল, এই ঘোড়াটি কি তোমার। সে বলল, না, ঘোড়াটি আমার নয়, তবে লাগামটা আমার।
এই উপমাই সেই বুদ্ধিবৃত্তিক বিভ্রান্তিকে উন্মোচিত করে, যাতে কিছু মানুষ পড়ে গেছেন। প্রাচীন শিক্ষানীতির দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে বারবার প্রামাণ্য আলোচনা হয়েছে, এবং এ বিষয়ে শিক্ষাবিদদের প্রায় সর্বসম্মত মতও রয়েছে। তা সত্ত্বেও একটি মাত্র বিতর্কের সাফল্যকে পাঠক্রমের যথার্থতার প্রমাণ বানানো ঠিক তেমনই, যেমন ঘোড়ার জয়কে লাগামের কৃতিত্ব বলে ধরা।
এই বিতর্কে একটি মাদরাসা আনন্দিত, কারণ ঘোড়াটি তাদের ছিল। আরেকটি মাদরাসা আনন্দিত, কারণ লাগামটি তাদের ছিল। আর বাকি সব মুসলমান আনন্দিত, কারণ ঘোড়াটির নাম ছিল মারজবান, আর মারজবান শব্দের প্রথম অক্ষর ম এবং মুসলমান শব্দের প্রথম অক্ষরও ম।
💠 দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর :
যদি কেউ এই যুক্তি দাঁড় করায় যে ইতিবাচক পক্ষের জয় মানেই ইসলামের জয়, তবে অনিবার্যভাবে এই প্রশ্নও সামনে আসে, আগামীকাল যদি কোনো বিতর্কে স্রষ্টা অস্বীকারকারীরা জয়ী হয়ে যায়, তবে কি বলতে হবে যে ইসলাম মিথ্যা প্রমাণিত হয়ে গেল।
এই প্রশ্নের উত্তর একেবারেই স্পষ্ট। কোনো বিতর্কে কোনো পক্ষের জয় কখনোই তার সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রমাণ হতে পারে না, যেমন পরাজয় কখনোই বাতিলতার দলিল নয়। বিতর্ক একটি শিল্প। এতে জয়লাভ নির্ভর করে বক্তার ভাষাশক্তি, উপস্থাপনার ভঙ্গি, তৎক্ষণাৎ জবাব দেওয়ার দক্ষতা, মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব সৃষ্টি এবং শ্রোতাদের ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার ওপর। এর সঙ্গে সত্য-মিথ্যার মৌলিক মানদণ্ডের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই।
যে আজ জেতে, সে কাল হারতেও পারে; আর যে আজ হারে, সে কাল জয়ীও হতে পারে। এই বাস্তবতা বিতর্কের ক্ষণস্থায়ী ও অস্থির প্রকৃতির কথাই তুলে ধরে।