শিরোনাম : দুআ বিষয়ে কিছু প্রশ্ন।
————-
দুয়ার বিষয়ে আমার একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার পর এক নিষ্ঠাবান শিক্ষিকা ও দাঈ কিছু প্রশ্ন পাঠিয়েছেন। সেগুলোর উত্তর এখানে তুলে ধরা হলো।
আসসালামু আলাইকুম,
আপনার চ্যানেলে দুয়ার বিষয়ে পোস্টটি পড়েছি। যেহেতু এই বিষয়টি আমার খুব প্রিয়, তাই কিছু সংশয় সামনে এসেছে। যদিও পোস্টটি অত্যন্ত চমৎকার এবং বহু বিষয় স্পষ্ট হয়ে গেছে। তবে যদি এই সংশয়গুলোর জবাব পেয়ে যাই, তাহলে সবার উপকার হবে। যখনই আপনার সময় হবে, অনুগ্রহ করে উত্তর দিয়ে দেবেন। جزاكم الله خيرا
|| প্রশ্ন ১:
দুয়ায় পুনরাবৃত্তি নেই; বরং নবীগণ একবারই দুয়া করেছেন। এই বক্তব্য কিছুটা অস্বস্তিকর মনে হচ্ছে। কুরআনে বিভিন্ন ঘটনায় দুয়া একবারই উল্লেখ করা হয়েছে, কিন্তু এর মানে কি এ-ই দাঁড়ায় যে তাঁরা কেবল একবারই দুয়া করেছেন?
|| উত্তর:
এটা মনে রাখা উচিত যে আমরা আল্লাহর কাছে যা চাই, তা সাধারণত দুই ধরনের হয়।
একটি হলো রুবুবিয়্যাতের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়—যেমন দুনিয়ার রিজিক, বিবাহ ও পারিবারিক প্রয়োজন, কিংবা দুনিয়াবি কোনো সমস্যার সমাধান ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে একবার দুয়া করাই যথেষ্ট। এ দুয়া করার ভঙ্গি হওয়া উচিত এমন, যা আল্লাহর রুবুবিয়্যাতের প্রতি পূর্ণ আস্থার প্রতিফলন ঘটায়। বান্দা একবার আন্তরিকভাবে চাইলে তা কবুল হয়ে যায়। তবে সেই কবুল হওয়ার প্রকাশ ভিন্ন ভিন্ন সময়ে হতে পারে। এ বিষয়ে আমি আমার আরেকটি প্রবন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
একটি উদাহরণ দিয়ে বোঝা যাক: যদি কারও দুই ছেলে থাকে, উভয়েই বাবার কাছে কিছু চায়, আর বাবা তাদেরকে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়—তখন একজন ছেলে নিশ্চিন্ত হয়ে যায়, কিন্তু অন্যজন বারবার তাগাদা দিতে থাকে এবং অস্থিরতা দেখায়। নিশ্চয়ই বাবার কাছে প্রথম ছেলের ভরসাপূর্ণ আচরণই বেশি প্রিয় হবে। অনুরূপভাবে আল্লাহও তাদের ভালোবাসেন যারা তাঁর ওয়াদার উপর নির্ভর করে নিশ্চিন্ত থাকে, আর যারা অধৈর্য ও অস্থির হয়, তাঁদেরকে তিনি পছন্দ করেন না।
দ্বিতীয়টি হলো উলুহিয়্যাতের সঙ্গে সম্পর্কিত বিষয়—যেমন গুনাহ মাফ চাওয়া, জান্নাত প্রার্থনা, আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা ইত্যাদি। এসব ক্ষেত্রে বারবার দুয়া করা উচিত। কারণ, আমাদের জীবনে প্রতিনিয়ত গুনাহ ঘটে, যা এমন দুয়ার মাধ্যমে ধুয়ে যায়। একই সঙ্গে আমাদের মর্যাদাও ক্রমশ উন্নত হয়। জান্নাতের তো অসংখ্য স্তর রয়েছে—আর বারবার দুয়া করার মাধ্যমে বান্দা ক্রমাগত উচ্চস্তরে উন্নীত হতে থাকে। এ পথেই নবীগণ ও আল্লাহর প্রিয় বান্দাগণ চলেছেন।
কুরআনে নবীদের দুয়া যে ভঙ্গিতে উল্লেখ করা হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে তাঁরা দুয়া করেছেন, আল্লাহর উপর ভরসা করেছেন এবং আল্লাহ তাঁদের দুয়া কবুল করেছেন। তাই তাঁদেরকে বারবার আকুল প্রার্থনা করতে হয়নি। এটাই আসলে আল্লাহর বাণীর মর্ম: “আমি প্রার্থনাকারীর দুয়া কবুল করি, যখন সে আমাকে ডাকে” এবং এ জাতীয় অন্যান্য আয়াতের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য।
|| প্রশ্ন ২:
দুয়ায় বিনয় ও কান্নাকাটি প্রিয়তম। আর এ ধরনের আকুল প্রার্থনায় তো একাধিকবার দুয়া করতে হয়। মানব-মনও চায় যে সে প্রার্থনা করতে থাকুক যতক্ষণ না সে তার অভীষ্ট পায়। তাহলে কি একবার দুয়া করার পর আর পুনরায় তা করা যাবে না?
|| উত্তর:
যেসব দুয়া উলুহিয়্যাতের অন্তর্গত—অর্থাৎ আখিরাত-সংক্রান্ত উদ্দেশ্য এবং আত্মিক নৈকট্য অর্জনের প্রার্থনা—এগুলো অবশ্যই বারবার করতে হবে। এগুলোতে আন্তরিক আকুতি, কান্নাকাটি ও বারবারের আহ্বানই সবচেয়ে প্রিয় ও প্রশংসনীয়। এর মাধ্যমে বান্দা কেবল নিজের বিনয় ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করে না, বরং অন্তরের গভীরতা থেকে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়, তাঁর ক্ষমতা ও দয়ার উপর পূর্ণ ভরসা স্থাপন করে।
অন্যদিকে, দুনিয়াবি প্রয়োজনের দুয়ার পদ্ধতি আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এসব প্রয়োজনের জন্য একবার পূর্ণ মনোযোগ, বিনয় ও আন্তরিকতার সঙ্গে দুয়া করাই যথেষ্ট। তখন বান্দার দৃঢ় বিশ্বাস রাখা উচিত যে আল্লাহর কাছে তার দুয়া কবুল হয়ে গেছে এবং আল্লাহ তাঁর ওয়াদার ভিত্তিতে তা দান করবেন।
আসলে দুয়া কবুল হওয়ার মূল রহস্য হলো বান্দার আল্লাহর প্রতি আস্থা এবং তাঁর ওয়াদার উপর ভরসা। যে ব্যক্তি আন্তরিকভাবে, হৃদয় ও জিহ্বার মিলিত প্রকাশে দুয়া করে, তার এই অবস্থা আল্লাহর কাছে কবুল হওয়ার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। দুয়া কেবল শব্দে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রাণ হলো বান্দার অন্তরের অবস্থা।
উলুহিয়্যাতের দুয়া মানুষের মর্যাদা উন্নত করে, গুনাহ মাফ করায় এবং আল্লাহর সান্নিধ্যের পথ খুলে দেয়। আর বারবার প্রার্থনা করার মাধ্যমে বান্দার হৃদয়ে বিনয়, আল্লাহর প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসা ক্রমেই বৃদ্ধি পায়। এ পথই নবী-রাসূলগণ ও আল্লাহর ওলীদের স্বীকৃত পথ।
|| প্রশ্ন ৩:
কুরআন ও সুন্নাহর দুয়া মুখস্থ করে সেগুলোর মাধ্যমে প্রার্থনা করার কী অসুবিধা আছে? অথবা কোনো নেক ও সৎ ব্যক্তির দুয়া মুখস্থ করে তা পড়া—যেমন সলফে সালেহীন এবং পরবর্তী যুগগুলোতেও বহু সুন্দর সুন্দর দুয়া পাওয়া যায়, যা আমরা পড়ি ও শুনি। অনেক সময় প্রত্যেক মানুষ এতটা ব্যাপক শব্দ বেছে নিতে পারে না, যা অন্য কেউ ব্যবহার করেছে।